দীপ্ত অতীতের প্রতিধ্বনি: ইসলামের সোনালী অধ্যায়


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ২৯, ২০২৫, ৩:৫৪ পূর্বাহ্ন /
দীপ্ত অতীতের প্রতিধ্বনি: ইসলামের সোনালী অধ্যায়

।।মমতাজ উদ্দিন আহমদ।।

মানব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে ইসলামের সেই গৌরবময় অধ্যায়, যখন এই জীবনদর্শন শুধু আধ্যাত্মিক মুক্তিই নয়, বরং একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও শক্তিশালী সমাজ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছিল। সেই সময়ে, বিশ্বাসীরা কেবল নামায, রোজা, হজ্জ আর যাকাতের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তারা একটি বৃহত্তর লক্ষ্যের পানে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন – আল্লাহর দ্বীনকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠা করা।

তাদের সেই সংগ্রামে অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত – সবকিছুই উজাড় করে দিয়েছিলে। জিহাদ ছিল তাঁদের কাছে শ্রেষ্ঠ ইবাদতের মতো, যেখানে সত্য ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা এবং একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে ধ্বনিত হতো। নবীর (সাঃ) সাহাবীদের জীবন ছিল সেই আদর্শের প্রতিচ্ছবি। তাঁরা শুধু ইবাদতে নয়, ঈমানের দৃঢ়তায় এবং আল্লাহর পথে আত্মত্যাগেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

মানব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠত্বের সেই সোনালী অধ্যায় রচিত হয়েছিল মহানবী (সাঃ)-এর হাতে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র সময়ের স্রোতে শুধু টিকে থাকেনি, বরং বিশ্বের বুকে এক শক্তিশালী সভ্যতা হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। মুসলিমরা পরিণত হয়েছিল এক প্রভাবশালী বিশ্বশক্তিতে, যারা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছিল দিগদিগন্ত। তাঁরা বিশাল ভূখণ্ড জয় করেছিলেন, কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের মতো শোষণ চালাননি। বরং স্থানীয়দের সাথে মিশে গিয়ে এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিলেন।

তবে সময়ের সাথে সাথে সেই ঐক্যে ফাটল ধরেছে। যখন মুসলিমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম ছেড়ে নিষ্ক্রিয় জীবন বেছে নিল অথবা শাসকদের খেয়াল খুশি মতো যুদ্ধে অংশ নিল, তখন থেকেই তাদের পতন শুরু হলো। নিষ্ক্রিয়তা মুসলিম চরিত্রের এক গভীর ক্ষত হয়ে দাঁড়ালো।

আজকের মুসলিম বিশ্বে বহু সংঘাত আর রক্তপাত দেখা যায়, কিন্তু কয়টি যুদ্ধ আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে? ভাষা, গোত্র আর ভৌগোলিক সীমারেখার বেড়াজালে বন্দি হয়ে মুসলিমরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে। অথচ ঈমানদারের পরিচয় তো ছিল আল্লাহর পথে নিজের জান ও মাল উৎসর্গ করা।

কুরআন সেই সোনালী যুগের মুমিনদের চিত্র এঁকেছে – যারা আল্লাহর সাথে জীবন ও সম্পদ বিক্রয়ের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন, যার প্রতিদান ছিল জান্নাত। সেই চুক্তির অনিবার্য দাবী ছিল আল্লাহর পথে জিহাদ। কিন্তু আজ ক’জন মুসলিম সেই দায়বদ্ধতা অনুভব করে?

ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, উইঘুর কিংবা রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ হয়তো আমাদের কানে পৌঁছায়, কিন্তু সেই অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো ঐক্যবদ্ধ শক্তি আজ কোথায়? জিহাদের মতো শ্রেষ্ঠ ইবাদত আজ অনেক মুসলিম দেশে সন্ত্রাসবাদের সমতুল্য।

তবে পরিবর্তনের শুরুটা হতে পারে জ্ঞানের আলোয়। কুরআনের জ্ঞানার্জন প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ। এই জ্ঞানই আমাদের সঠিক পথ দেখাতে পারে এবং অতীতের সেই গৌরবময় ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। প্রয়োজন সেই সাহাবীদের মতো ঈমান আর আল্লাহর পথে সর্বাত্মক ত্যাগের মানসিকতা।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ: ইসলামের স্বর্ণযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা এবং স্থাপত্যের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল। ইসলাম জ্ঞানার্জনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়, এবং সেই সময়ে মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, রসায়ন ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদান রেখেছিলেন। তাঁরা এমন অনেক যন্ত্র ও কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন যা পরবর্তীকালে আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে। বীজগণিতের জনক আল-খোয়ারিজমি, চিকিৎসাশাস্ত্রের পথিকৃৎ ইবনে সিনা, এবং উন্নত জ্যোতির্বিদ্যা সরঞ্জাম সেই সময়ের প্রযুক্তির উৎকর্ষের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

প্রযুক্তির ব্যবহার ও নৈতিক দিক: বর্তমানে প্রযুক্তি জ্ঞান আহরণের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইসলামের নীতি অনুযায়ী, প্রযুক্তির ব্যবহার সাধারণভাবে ইতিবাচক যদি তা মানবজাতির কল্যাণে ও ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা প্রযুক্তি, এবং জ্ঞান বিতরণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিক দিকটি অপরিহার্য। এমন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত নয় যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর, অনৈতিক বা ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী।

নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ: ইসলাম একটি শক্তিশালী নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। ন্যায়বিচার, সততা, দানশীলতা, অতিথিপরায়ণতা এবং দুর্বল ও অভাবীদের প্রতি সহানুভূতি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মুসলিম সমাজে এই মূল্যবোধগুলির চর্চা এক উন্নত ও সহানুভূতিশীল সমাজ গঠনে সহায়তা করেছিল।

সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি: ইসলামী সংস্কৃতি বিভিন্ন জাতি ও অঞ্চলের সংস্কৃতিকে ধারণ করে একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ লাভ করেছিল। মসজিদ, প্রাসাদ, গ্রন্থাগার এবং শিল্পকলার বিভিন্ন নিদর্শন সেই সময়ের উন্নত রুচি ও সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে।

আইন ও শাসনের নীতি: ইসলামী শাসনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে প্রণীত আইন সমাজে শৃঙ্খলা ও সুবিচার নিশ্চিত করত। শাসকদের জবাবদিহিতা এবং জনগণের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামী শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিম রাষ্ট্রগুলি অন্যান্য সভ্যতার সাথে জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান করত। বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

লেখক: মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব

01556560126/01645950296

তারিখ: 28/09/2025