‘আল্লাতে যাঁর পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’: এক জাগরণী সুর


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ৫, ২০২৫, ৬:৪৫ পূর্বাহ্ন /
‘আল্লাতে যাঁর পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’: এক জাগরণী সুর
মমতাজ উদ্দিন আহমদ

কাজী নজরুল ইসলামের “আল্লাতে যাঁর পূর্ণ ঈমান” গানটি কেবল এক আক্ষেপের সুর নয়। এটি মুসলিম উম্মাহর প্রতি এক মর্মস্পর্শী আহ্বান। এতে ফুটে উঠেছে মুসলিম সমাজের হারানো গৌরব, ঈমানের শক্তি এবং বিশ্বমানবতার প্রতি তাদের দায়িত্বের কথা। কুরআন-হাদীস ও নজরুলের অন্যান্য লেখার আলোকে এর গভীরতা আলোচনা করা যায়।

গানটির ভাব ও প্রেক্ষাপট:

এই গানে নজরুল মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থার প্রতি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মূল জিজ্ঞাসা হলো, প্রকৃত ঈমানদার মুসলমান আজ কোথায়? কবির মতে, আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসই ইসলামের ভিত্তি। এই বিশ্বাসে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করাই হলো ‘পূর্ণ ঈমান’। কিন্তু তিনি দেখেন, মুসলিম সমাজে এমন আরিফ (জ্ঞানী) নেই, যাঁর কাছে জীবন-মৃত্যু একই অর্থ বহন করে, অর্থাৎ যিনি আল্লাহর পথে হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।

নজরুল স্মরণ করিয়ে দেন ইসলামের সোনালি যুগের কথা। তখন সাহাবী ও প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের মুখে তাওহিদের (এক আল্লাহর একত্ববাদ) বাণী শুনে মৃত্যুও ভীত হতো। তাঁদের দীন (ধর্ম, বিচার ও রীতিনীতি)-এর আদর্শিক প্রভাবে মানুষ, জ্বিন-পরী সকলেই প্রভাবিত ও কম্পিত হতো। তাঁরাই ছিলেন প্রকৃত ঈমানদার।

কিন্তু আজ সেই অবস্থার ঘোর পরিবর্তন হয়েছে। একসময় যারা নির্ভীক চিত্তে ধর্মরক্ষায় স্ত্রী-পুত্র কোরবানি করতেন, তারাই এখন প্রাণের জন্য ভিক্ষা করছেন। যারা আল্লাহ ছাড়া ত্রিভুবনে কাউকে ভয় পেত না এবং কুরআনের বাণী দিয়ে মানুষকে অজ্ঞানতা ও ধর্মহীনতার অন্ধকার থেকে আজাদ (মুক্ত) করতে এসেছিল, তাদের আজ কোনো চিহ্ন নেই। এই গভীর আক্ষেপ ও হতাশার মধ্য দিয়েই গানটি শেষ হয়েছে।

বিশ্বমানবতার কল্যাণে কুরআনের ভূমিকা:

নজরুল তাঁর গানে বলেছেন, “আজাদ করিতে এসেছিল যারা সাথে লয়ে কোর্‌আন্”। কুরআন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েত ও মুক্তির দিশা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “এই কিতাব আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি যেন তুমি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারো।” (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ১)। কুরআনের শিক্ষা বিশ্বজুড়ে শান্তি, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য। এটি মানুষকে অন্ধকার ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে। নজরুল তাঁর “আমার কৈফিয়ত” কবিতায় বলেছেন: “কোরআনের বাণী যদি হয় তোর তলোয়ার, তবে কাঁপবে না তোর দিল আর।”

ঈমানের গভীরতা ও দৃঢ়তা:

গানের প্রথম চরণেই নজরুলের মূল জিজ্ঞাসা: “আল্লাতে যাঁর পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান”। কবি এমন গভীর ঈমানের কথা বলছেন যা মুখে উচ্চারিত হয় না, বরং অন্তরের গভীরে প্রোথিত। প্রকৃত ঈমান মানুষকে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। নজরুল তাঁর বিভিন্ন রচনায় এই দৃঢ় ঈমানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এমন ঈমান থাকলে জীবন ও মৃত্যুর ভেদ থাকে না, আল্লাহর পথে জীবন দিতেও কুণ্ঠা আসে না।

নজরুল তাঁর অন্য একটি ইসলামী গানে বলেছেন, ‘আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়।’ এই লাইনগুলো ঈমানের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। যে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখে, তার কোনো ভয় থাকতে পারে না, কারণ সে জানে স্বয়ং আল্লাহ তার সাথে আছেন। তাঁর এসব গান ও কবিতার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর প্রতি গভীর ঈমান রাখতে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাঁর কাছে ঈমান শুধু বিশ্বাস ছিল না, বরং এটি ছিল মানুষকে মুক্তি ও সাহসিকতার পথে পরিচালিত করার এক সক্রিয় শক্তি।

নির্ভীকতা ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা:

“স্ত্রী পুত্রে আল্লারে সঁপি জেহাদে যে নির্ভীক। হেসে কোরবানি দিত প্রাণ হায় আজ তারা মাগে ভিখ্।” এই অংশে কবি আল্লাহর পথে আত্মত্যাগের কথা বলেছেন। ইসলামে জিহাদ কেবল যুদ্ধ নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। শাহাদাত বা শাহাদতবরণ আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করাকে বোঝায়, যা সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করে। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে রিজিকপ্রাপ্ত হয়।” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৪)। নজরুলের “শহীদী ঈদ” কবিতায় তিনি বলেছেন:

শহীদের ঈদ আসে ওই আজ শোকের মাঝে ঈদ!

খুন-রাঙা বেশ, খুন-ঝরা চোখে, খুন-রাঙা দিল-খুন ঈদ!

এখানে শহীদের রক্তের বিনিময়ে দ্বীনের বিজয় ও ঈদের আগমনকে তুলে ধরা হয়েছে, যা গভীর ঈমান ছাড়া সম্ভব নয়।

তাওহিদের মহিমা:

“যাঁর মুখে শুনি তৌহিদের কালাম — ভয়ে মৃত্যুও করিত সালাম।” তাওহিদ হলো ইসলামের মূল ভিত্তি – এক আল্লাহতে বিশ্বাস। এই বিশ্বাস মানুষকে সকল ভয়, শিরক ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি দেয়। যখন একজন মানুষ উপলব্ধি করে যে, একমাত্র আল্লাহই তার সবকিছুর মালিক, তখন তার মন থেকে সৃষ্টির ভয় দূর হয়ে যায়। এই তাওহিদের মহিমা মানুষকে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করে। নজরুলের অনেক হামদ ও নাত-এ তাওহিদের এই মহিমা প্রতিফলিত হয়েছে, যেমন তাঁর “আল্লাহ আমার প্রভু” গানটি। এই গানে নজরুল বোঝাতে চেয়েছেন যে, একজন মুমিনের জীবনে আল্লাহই একমাত্র ভরসা, ভয় দূর করার উৎস এবং অবিচল সাহচর্যের প্রতীক। এই দৃঢ় বিশ্বাসই মুমিনকে নির্ভীক ও শক্তিশালী করে তোলে।

এছাড়াও, গানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, নির্ভীকতা, আল্লাহর সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ও আল্লাহর রহমতের কথা বলা হয়েছে। যখন কারো আল্লাহতে পূর্ণ ঈমান থাকে, তখন সে সকল প্রকার জড়তা, ভীরুতা এবং হতাশা থেকে মুক্ত হয়।

ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব:

“কোথা সে শিক্ষা আল্লাহ্ ছাড়া, ত্রিভুবনে ভয় করিত না যাঁরা।” এই পংক্তিটি ইসলামী শিক্ষার অভাব নির্দেশ করে। ইসলামী শিক্ষা শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নয়, এটি নৈতিকতা, মানবিকতা, বিজ্ঞান ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা। এই শিক্ষা মানুষকে আত্মমর্যাদাশীল ও সাহসী করে তোলে। কোরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। নজরুল নিজে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী জ্ঞানেও সমৃদ্ধ ছিলেন, যা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে।

মুসলমানদের অতীত গৌরব ও বর্তমান অধঃপতন:

গানের মূল সুর হলো মুসলিম উম্মাহর অতীত সোনালী দিনের স্মৃতিচারণ এবং বর্তমানের অধঃপতন নিয়ে আক্ষেপ। একসময় মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বীরত্বে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। অথচ আজ তারা দ্বিধাগ্রস্ত ও শক্তিহীন। নজরুল এই অধঃপতনের কারণ হিসেবে ঈমানী দুর্বলতা, আত্মবিস্মৃতি এবং ইসলামী শিক্ষার অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি বারবার মুসলিমদেরকে ঘুম থেকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত গান “আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ছাত্রদল” – এখানেও তিনি মুসলিম যুবকদের মধ্যে হারানো তেজ ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

নজরুল তাঁর সাহিত্যকর্মে মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব, আত্মবিশ্বাস ও তেজ ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন বারবার ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি চেয়েছিলেন মুসলমানরা যেন নিষ্ক্রিয় না থাকে, বরং ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় করে নেয় এবং বিশ্ব সমাজে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।

তাঁর এই স্বপ্ন ও তেজ ফিরিয়ে আনার আকুতি নিম্নলিখিত গানেও প্রতিফলিত হয়েছে:

‘বাজল কি রে ভোরের সানাই নিদ মহলার আঁধারপুরে,

শুনছি আজান গগন তলে অতীত রাতের মিনার চূড়ে’

এই চিত্রকল্পগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, মুসলিমদের দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা ও অজ্ঞতার অন্ধকার কেটে গিয়ে নতুন আলোর দিন আসছে। ফজরের আজান যে “নিদ্রা অপেক্ষা প্রার্থনা শ্রেয়” বলে, তার মধ্যে জাগরণের এক প্রবল আহ্বান রয়েছে। নজরুল তাঁর এসব রচনার মাধ্যমে মুসলিমদেরকে আত্মমর্যাদা নিয়ে নিজেদের অধিকার আদায় করতে এবং বিশ্বসভায় যথার্থ স্থান করে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এই ছিল তাঁর মুসলিমদের হারানো তেজ ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন।

গানটির তথ্যসূত্র:

এই নিবন্ধে ব্যবহৃত গানটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

  • রচনাকাল: গানটির রচনাকাল সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে, ১৯৪১ সালের জুন মাসে (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৮) টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে এর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। তখন নজরুলের বয়স ছিল ৪২ বছর ১ মাস।
  • রেকর্ড: টুইন। জুন ১৯৪১ (জৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৮)। এফটি ১৩৫৯৬। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ
  • রেকর্ডে রচয়িতার নাম: পীর-কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: নীলিমা দাস। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, একত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন, ১৩৯৭ বঙ্গাব্দ/ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ] চতুর্থ গান। আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে।
  • পর্যায়: ধর্মসঙ্গীত (ইসলাম, ধর্মাঙ্গ, ইমান)।
  • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য।
  • তাল: দাদরা।
  • আলোচ্য গানের গ্রহস্বর: না।

নজরুলের এই গানটি শুধু একটি কবিতা নয়, এটি একটি আদর্শিক জাগরণী বাণী। এটি মুসলিম উম্মাহকে তাদের স্বকীয়তা, শক্তি ও হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য আহ্বান জানায়, যা বিশ্বমানবতার কল্যাণে তাদের দায়িত্ব পালনে অপরিহার্য।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ৪ জুন ২০২৫ খ্রি.