
তিন লাইনের একটি গান। ‘নট-মল্লার’ রাগ এবং ত্রিতালে গানটি কাজী নজরুল ইসলামের প্রেম ও বিরহের অসংখ্য গানের মধ্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই গানে প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে এক বিরহী মনের আকুতি ও অপ্রাপ্তির বেদনা মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং নজরুলের গভীর প্রেমভাবনা এবং বিরহকে ধারণ করার এক কাব্যিক দলিল।
গানের তথ্য:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। তবে, ১৯৪১ সালের জানুয়ারি (বাংলা পৌষ-মাঘ ১৩৪৭) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বছর ৭ মাস।
পঙক্তিভিত্তিক ব্যাখ্যা:
“ফিরে নাহি এলে প্রিয় ফিরে এলো বরষা।”
এই পঙক্তিতে গানের মূল বিরহী সুরটি বাঁধা হয়েছে। এখানে প্রকৃতির একটি অনিবার্য পরিবর্তন—বর্ষার আগমন—এবং প্রিয়জনের অনুপস্থিতি, এই দুটি বিপরীত বিষয়কে এক করে দেখানো হয়েছে। বর্ষা যেমন প্রতি বছর ফিরে আসে, তেমনি বিরহী মন আশা করে প্রিয়জনের ফিরে আসা। কিন্তু বর্ষা এলেও প্রিয়জন আসেনি, যা এক গভীর বিষাদকে তুলে ধরে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির বিরহ নয়, বরং প্রকৃতির বিশালতার মাঝে মানব মনের ক্ষুদ্র কিন্তু তীব্র বেদনার প্রকাশ।
“মুঞ্জরিল বনে বিরহিণী লতিকা – আমারি আশালতা হ’লো না গো সরসা॥”
এই পঙক্তিগুলিতে নজরুলের কাব্যিক দক্ষতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। “মুঞ্জরিল বনে বিরহিণী লতিকা” – অর্থাৎ বনে লতারা নতুন করে ফুলে-ফলে সুশোভিত হচ্ছে, প্রকৃতির সর্বত্র প্রাণের সঞ্চার, নতুন করে জেগে ওঠা। অথচ এই সজীবতার মাঝেও কবির মন “বিরহিণী লতিকা” হয়ে আছে, যা প্রিয়জনের বিরহে ম্লান। “আমারি আশালতা হ’লো না গো সরসা” – এখানে ‘আশালতা’ বলতে প্রিয়জনের ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়েছে। বনের লতা যখন রসাল ও সজীব হয়ে উঠছে, তখন বিরহী মনের আশার লতা রসশূন্য, শুষ্ক ও নিষ্প্রাণ হয়ে আছে। এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিপরীতে মানব মনের হতাশা ও অপ্রাপ্তির তীব্র বেদনাকে তুলে ধরে। আশা জীবিত না হওয়ায় মন সরস বা সজীব হতে পারছে না, বরং তা বিরহের আগুনে আরও বেশি দগ্ধ হচ্ছে।
নজরুলের প্রেমভাবনার প্রতিফলন:
নজরুলের গানে প্রেম প্রায়শই বিরহের আবরণে ঢাকা থাকে, যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির বেদনা বেশি তীব্র। “ফিরে নাহি এলে প্রিয় ফিরে এলো বরষা” গানে বর্ষার আগমন প্রিয়জনের অনুপস্থিতিকে আরও প্রকট করে তোলে, যা তাঁর অসংখ্য গানে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
নজরুল তাঁর গানে প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গকে প্রেমের অনুভূতির সঙ্গে মিশিয়ে দেন। এই গানে বর্ষার সজীবতার মধ্যেও বিরহের ছায়া দেখা যায়, যা যেন কবির ভেতরের বিষাদেরই প্রতিচ্ছবি।
এই গানটি নজরুলের প্রেম ও বিরহ বিষয়ক গানগুলির মধ্যে অন্যতম, যেখানে প্রকৃতি এবং মানব মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি দারুণভাবে মিশে গেছে। এটি শুধু এক প্রেমিকার ব্যক্তিগত বিরহ নয়, বরং ভালোবাসার চিরন্তন অপূর্ণতার এক কাব্যিক প্রতিচ্ছবি।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ১৬ জুন ২০২৫ খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :