নজরুলের “কোরবানি দে তোরা কোরবানি দে” গান: কোরবানির আধ্যাত্মিক ও মানবিক তাৎপর্য


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ৬, ২০২৫, ১২:৪১ অপরাহ্ন /
নজরুলের “কোরবানি দে তোরা কোরবানি দে” গান: কোরবানির আধ্যাত্মিক ও মানবিক তাৎপর্য
মমতাজ উদ্দিন আহমদ

গানের মূল ভাব:

গানটির মূলভাব হলো প্রকৃত কোরবানি। এটি শুধু পশু জবাই করা নয়। কোরবানি মানে আল্লাহর প্রতি চরম আত্মত্যাগ। এটি ভালোবাসা এবং মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার নাম। মনের সব পাশবিক প্রবৃত্তি ত্যাগ করতে হবে। নিজেকে শুদ্ধ করাই প্রকৃত কোরবানি। নজরুল তাঁর কবিতায় এই তাকওয়াকেই ‘মনের পশু’ কোরবানির কথা বলেছেন। তাঁর এই গান যুগ যুগ ধরে কোরবানির ঈদের প্রকৃত শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি মানুষকে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে।

গানটির মধ্যে প্রতিফলিত ইসলামী অনুশাসন ও ভাবান্তর:

গানটিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী অনুশাসন প্রতিফলিত হয়েছে। এতে গভীর ভাবান্তরও রয়েছে। এটি শুধু একটি উৎসবের গান নয়। এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও আধ্যাত্মিকতার এক গভীর বার্তা।

  • ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও চাঁদ দেখা, তাকবীর ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা:

“নতুন চাঁদের তক্‌বির শোন্ কয় ডেকে ঐ মুয়াজ্জিন — আসমানে ফের ঈদুজ্জোহার চাঁদ উঠেছে মুসলেমিন॥” এই পংক্তিগুলোতে নজরুল ঈদের আগমন বার্তা তুলে ধরেছেন। তাকবীরের গুরুত্বও বলেছেন। ইসলামী শরিয়তে চাঁদ দেখা নতুন মাসের সূচনা করে। এটি ঈদ উৎসবের অপরিহার্য অংশ। তাকবীর ধ্বনি, অর্থাৎ “আল্লাহু আকবার” বলা, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে। এটি মুসলিমদের সম্মিলিতভাবে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের প্রতীক।

নজরুল তাঁর অন্যান্য রচনার মতো এখানেও ইসলামী রীতিনীতিকে কাব্যিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর বিখ্যাত রমজানের গান “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”। এখানে তিনি ঈদের আগমনী বার্তা ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার কথা বলেছেন। এটি ঈদুল আজহার আনন্দকেও নির্দেশ করে। এছাড়া, নজরুলের বিভিন্ন হামদ ও নাতে তাকবীরের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি আল্লাহর মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব বারবার ঘোষণা করেছেন। তাঁর “আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি ভয়” গানে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস প্রকাশ পায়। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিও দৃঢ় আস্থা প্রকাশ পায়।

  • কোরবানির মূল দর্শন – আত্মত্যাগ:

“তোরা ভোগের পাত্র ফেল্‌রে ছুঁড়ে ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ। কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে।। কি হবে ঐ বনের পশু খোদারে দিয়ে, তোর কাম-ক্রোধাদি মনের পশু জবেহ্ কর্ নিয়ে।” এই অংশে নজরুল কোরবানির প্রকৃত দর্শন তুলে ধরেছেন। এটি শুধু পশুর কোরবানি নয়। এটি ভেতরের কুপ্রবৃত্তি, যেমন কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য ইত্যাদির কোরবানি। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি। ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।

কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: “আল্লাহর কাছে তাদের গোশত ও রক্ত পৌঁছে না; বরং তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি) তাঁর কাছে পৌঁছে।” (সূরা আল-হাজ, ২২:৩৭)

এই আয়াত কোরবানির মূল উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট করে। আল্লাহর কাছে বাহ্যিক রক্ত বা গোশত নয়, মনের ভেতরের তাকওয়া ও আত্মত্যাগই গুরুত্বপূর্ণ। নজরুল তাঁর কবিতায় এই তাকওয়াকেই ‘মনের পশু’ কোরবানির কথা বলেছেন। তাঁর “মহরম” কবিতায় তিনি শাহাদাতের মাধ্যমে আত্মত্যাগের মহিমা তুলে ধরেছেন:

“কোরবানি, কোরবানি!

কিশলয় আজ কঙ্কালসার, ছিন্ন-শিরের শিরস্ত্রাণি!

কোরবানির অর্থ বুঝি আত্মত্যাগ!”

  • আল্লাহর পথে প্রিয় বস্তুর উৎসর্গ:

“প্রাণের যা তোর প্রিয়তম আজকে সে সব আন্, খোদারই রাহে আজ তাহাদের কর রে কোরবান্।” এই পংক্তি হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি নিজ পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে কোরবানি করতে চেয়েছিলেন। এটি ত্যাগের এক চরম দৃষ্টান্ত। এখানে আল্লাহর নির্দেশের কাছে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকেও উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকা হয়।

এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআনের সূরা সাফফাত-এর ১০২-১০৭ আয়াতে পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন:

“যখন সে (ইসমাইল) তার (ইব্রাহিমের) সাথে চলাফেরার বয়সে পৌঁছল, তখন ইব্রাহিম বলল, ‘হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার কী অভিমত দেখ।’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।'” (সূরা সাফফাত, ৩৭:১০২)

নজরুল ইসলামের অনেক ইসলামী রচনার মতো, এই গানেও তিনি ইব্রাহিমী ত্যাগের আদর্শ তুলে ধরেছেন। তাঁর “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা” গানের মধ্যেও আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের মাধ্যমে নতুন জীবন গড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি শুধু ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করেননি। এর ভেতরের চিরন্তন শিক্ষাকে বর্তমান সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন।

  • মানবতাবাদ ও ভ্রাতৃত্ববোধ:

“বিলিয়ে দেওয়ার খুশির শিরনি তশতরিতে আন, পর্ রে তোরা সবাই ত্যাগের রঙিন পিরহান্। মোদের যা কিছু প্রিয় বিলাব সবে নবীর উম্মত তবে সকলে কবে।।” এই অংশে নজরুল ঈদকে শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের উৎসব রাখেননি। এটিকে সাম্য, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের উৎসবে পরিণত করেছেন। কোরবানির গোশত দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়। তেমনি এটি সামাজিক সংহতি ও সহমর্মিতার প্রতীক।

কুরআন ও হাদীসে দরিদ্রদের অধিকার ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা’আলা বলেন:

“আর যারা ইয়াতীম, মিসকীন ও বন্দীকে খাদ্য দান করে – কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।” (সূরা আদ-দাহর, ৭৬:৮)

নজরুল তাঁর কবিতায় বারবার মানবতাবাদের কথা বলেছেন। এটি ইসলামী সমাজের মূল ভিত্তি। তাঁর “মানুষ” কবিতায় তিনি ঘোষণা করেছেন:

“গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

এই কবিতার মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানবজাতিকে একতার বন্ধনে আবদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি ঈদুল আজহার ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত ভ্রাতৃত্ববোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর “হিন্দু-মুসলিম” গানেও তিনি ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন:

“মোরা এক বৃন্তে দুটি ফুল, হিন্দু মুসলমান।

মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”

  • নৈতিক শুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধি:

“তোর কাম-ক্রোধাদি মনের পশু জবেহ্ কর্ নিয়ে। কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে।।” এই পংক্তিগুলো নৈতিক শুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির প্রতি নজরুলের জোর নির্দেশ করে। ইসলামী জীবনদর্শনে আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নফস) একটি মৌলিক ধারণা। এখানে কুপ্রবৃত্তি দমন করে আত্মিক উন্নতি অর্জন করা হয়। কোরবানি এই আত্মিক পরিশুদ্ধির প্রতীকী প্রক্রিয়া।

নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: “সবচেয়ে বড় জিহাদ হলো নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ।” (হাদীস)

এই হাদীস অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরে। নজরুল তাঁর রচনার মাধ্যমে এই অভ্যন্তরীণ জিহাদের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর “খেয়াপারের তরণী” কবিতায় তিনি মুমিনদের আত্মিক যাত্রার কথা বলেছেন। সেখানে নৈতিক শুদ্ধি অপরিহার্য বিষয়। এই যাত্রায় তাদের নৈতিক শুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায় পঙক্তিমালায়:

“পুণ্য-পথের এ যে যাত্রীরা নিষ্পাপ, ধর্মেরি বর্মে সু-রক্ষিত দিল্ সাফ!”

এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তাদের হৃদয় পাপমুক্ত। ধর্মের বর্মে সুরক্ষিত। মুখে থাকে ‘লা-শরিক আল্লাহ’র’ জিকির। এটি তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা।

“দাঁড়ি-মুখে সারি-গান –লা-শরিক আল্লাহ!” – এই জিকির তাদের আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে।

এই আত্মিক যাত্রার সফল পরিণতি হলো জান্নাতের সুসংবাদ। এখানে সৎকর্মশীল মুমিনদের জন্য অনন্ত সুখ ও শান্তি অপেক্ষা করে।

“জান্নাত্ হতে ফেলে হুরি রাশ্ রাশ্ ফুল। শিরে নত স্নেহ-আঁখি মঙ্গল দাত্রী, গাও জোরে সারি-গান ও-পারের যাত্রী। বৃথা ত্রাসে প্রলয়ের সিন্ধু ও দেয়া-ভার, ঐ হলো পুণ্যের যাত্রীরা খেয়া পার।”

নজরুল এসব কবিতা-গানের মাধ্যমে মুমিনদের জন্য গভীর আধ্যাত্মিক পথনির্দেশনা দিয়েছেন। এটি জীবনের সব বাধা পেরিয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হতে উৎসাহিত করে। ব্যক্তিজীবনের নৈতিক উন্নতির মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তন আনার কথা বলে। নজরুলের “পথিক” কবিতাটিও আধ্যাত্মিক যাত্রায় আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরে। তাঁর লেখায় প্রায়শই ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধি ও আল্লাহমুখী হওয়ার আহ্বান থাকে। এটি “কোরবানি দে তোরা কোরবানি দে” গানের কেন্দ্রীয় বার্তা। অর্থাৎ ভেতরের পশুত্বকে কোরবানি দিয়ে নৈতিকভাবে উন্নত হওয়ার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

নজরুল এইভাবে তাঁর প্রতিটি রচনার মাধ্যমে শুধু বাহ্যিক অনুষ্ঠান পালনের কথা বলেননি। তিনি এর ভেতরের গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষাকে বারবার তুলে ধরেছেন। এটি কুরআন-হাদীস এবং ইসলামী সভ্যতার মূল বার্তা।

রচনাকাল ও প্রকাশনা তথ্য:

“কোরবানি দে তোরা কোরবানি দে” গানটির প্রথম পঙক্তি হলো “নতুন চাঁদের তক্‌বির শোন্ কয় ডেকে ঐ মুয়াজ্জিন — আসমানে ফের ঈদুজ্জোহার চাঁদ উঠেছে মুসলেমিন॥”

এই গানটির সুনির্দিষ্ট রচনাকাল জানা যায় না। তবে এটি ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর (১ আশ্বিন ১৩৪২ বঙ্গাব্দ) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুলের চুক্তিপত্রে উল্লেখিত ছিল। তখন নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বছর ৪ মাস।

গ্রন্থসূত্রে, গানটি নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, ফেব্রুয়ারি ২০১২) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এটি ৫৭২ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৭৫।

রেকর্ডসূত্র থেকে জানা যায়, গানটি জানুয়ারি ১৯৩৬ (পৌষ-মাঘ ১৩৪২) মাসে প্রকাশিত হয়। এটি এন ৭৪৭৮ রেকর্ডে ছিল। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন শিল্পী রওশন আরা বেগম। তার সহশিল্পী ছিলেন ধীরেন দাস।

স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি হিসেবে সুধীন দাশ ও সেলিনা হোসেন এই গানটির স্বরলিপি করেছেন। এটি নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (৩৭শ খণ্ড)-এর দ্বিতীয় মুদ্রণে (নজরুল ইন্সটিটিউট, পৌষ, ১৪২১ বঙ্গাব্দ/ জানুয়ারি, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশিত হয়েছে। এটি ১০ম গান।

পর্যায়ক্রমে, গানটি ভক্তি বিষয়ক ইসলামী গান হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ। এর সুর স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর। এটি কাহারবা তালে নিবদ্ধ।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ০৬ জুন ২০২৫ খ্রি.