মানহীন অনলাইন পোর্টালের বিস্তার ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অপরিহার্যতা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ২, ২০২৬, ১:৫৭ অপরাহ্ন /
মানহীন অনলাইন পোর্টালের বিস্তার ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অপরিহার্যতা

মমতাজ উদ্দিন আহমদ

ডিজিটাল বিপ্লব গণমাধ্যমকে যেমন সহজলভ্য করেছে, তেমনি উন্মুক্ত করে দিয়েছে এক বিপজ্জনক দুয়ারও—মানহীন অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিস্তার। আজ যে কেউ একটি ওয়েবসাইট খুলে নিজেকে “সাংবাদিক” পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে; কিন্তু সংবাদমাধ্যমের যে মৌলিক শর্ত—তথ্য যাচাই, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও পেশাগত দক্ষতা—তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ফলে গণমাধ্যমের পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি তার বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়েছে।

মানহীন পোর্টালে তথ্যের ভিড়ে বিভ্রান্তির জন্ম:

অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিস্তার স্বভাবতই গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক হওয়ার কথা ছিল। কারণ এতে বহুমাত্রিক মত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্য জনস্বার্থ নয়, বরং ক্লিক, ভিউ ও তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা—তখন সংবাদ হয়ে ওঠে পণ্য। শিরোনাম হয় উত্তেজক, তথ্য হয় অসম্পূর্ণ, আর ভাষা হয় দায়িত্বহীন। এই প্রবণতা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের “দ্রুত খ্যাতি পাওয়ার সাংবাদিকতা” তৈরি করছে, যেখানে অনুসন্ধানের চেয়ে অনুকরণ বেশি, যাচাইয়ের চেয়ে ভাইরাল হওয়াই মুখ্য।

ফলে সৃষ্টি হচ্ছে দুই ধরনের সংকট—
১. মানহীন সাংবাদিক তৈরির প্রবণতা, যারা পেশাগত নৈতিকতা বা গবেষণাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই মাঠে নামছে।
২. জনআস্থার অবক্ষয়, যেখানে পাঠক ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যমের প্রতি সন্দিহান হয়ে উঠছে।

জাতিররাষ্ট্র ও গণমাধ্যম: তাত্ত্বিক গুরুত্ব

আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে স্বাধীন গণমাধ্যম কেবল তথ্য সরবরাহকারী নয়; এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই গণমাধ্যমের এই অপরিহার্য ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন।

আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল তাঁর গণতন্ত্র বিষয়ক বিশ্লেষণে “Enlightened Understanding” ধারণার কথা বলেন। তাঁর মতে, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে নাগরিকদের কাছে নির্ভরযোগ্য, বহুমাত্রিক ও যাচাইকৃত তথ্য পৌঁছানো অপরিহার্য। অর্থাৎ গণমাধ্যম যদি সত্য ও তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে গণতন্ত্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াই বিকৃত হয়ে পড়ে।

একইভাবে যোগাযোগ তত্ত্ববিদ নোয়াম চমস্কি সতর্ক করে বলেন, “মিডিয়া যখন করপোরেট বা রাজনৈতিক স্বার্থের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন তা জনগণের চোখ না হয়ে ক্ষমতার মাইকে পরিণত হয়।” এই বক্তব্য আজকের ডিজিটাল বাস্তবতায় আরও প্রাসঙ্গিক—যেখানে অনেক অনলাইন পোর্টাল নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের বদলে বিশেষ গোষ্ঠীর প্রচারণা যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে।

বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট ক্ষমতার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, প্রকৃত ক্ষমতার উৎস জনগণের সম্মতি। কিন্তু জনগণের সম্মতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তারা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর সেই তথ্যের প্রধান উৎস যদি অবিশ্বস্ত হয়, তবে জনগণের সম্মতিও হয়ে ওঠে ভঙ্গুর।

গণমাধ্যমের অবক্ষয় ও রাষ্ট্রের ঝুঁকি:

মানহীন অনলাইন পোর্টালের আধিক্য কেবল সাংবাদিকতার সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। কারণ—

  • গুজব ও অপপ্রচার দ্রুত ছড়ায়, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
  • বিভাজনমূলক ভাষা ও উত্তেজনা রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায়।
  • নীতিনির্ধারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, কারণ জনমত গঠিত হয় অর্ধসত্যের ওপর।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুর্গেন হাবারমাস “Public Sphere” বা গণপরিসরের ধারণায় দেখিয়েছেন, সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য এমন একটি মুক্ত পরিসর প্রয়োজন যেখানে নাগরিকরা তথ্যভিত্তিক আলোচনায় অংশ নিতে পারে। কিন্তু যদি সেই পরিসর ভুয়া খবর, গুজব ও দলীয় প্রচারণায় ভরে যায়, তবে গণপরিসর আর মুক্ত থাকে না—তা হয়ে ওঠে কৃত্রিম ও নিয়ন্ত্রিত।

উত্তরণের পথ:

এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব, তবে তার জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত ও নৈতিক উভয় পরিবর্তন।

১. নিবন্ধন ও নীতিমালা কঠোর করা
অনলাইন পোর্টাল পরিচালনায় ন্যূনতম পেশাগত মানদণ্ড ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

২. সাংবাদিকতার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা
পেশাগত নৈতিকতা, তথ্য যাচাই ও অনুসন্ধানী দক্ষতা ছাড়া সাংবাদিকতা পূর্ণতা পায় না।

৩. স্বাধীন সম্পাদকীয় কাঠামো গড়ে তোলা
রাজনৈতিক বা করপোরেট প্রভাবমুক্ত সম্পাদকীয় স্বাধীনতা গণমাধ্যমের প্রাণ।

৪. মিডিয়া সাক্ষরতা বৃদ্ধি
পাঠক–দর্শক যদি সচেতন হয়, তবে মানহীন সংবাদ টিকতে পারে না।

উপসংহার:

স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া আধুনিক জাতিরাষ্ট্র কেবল কাঠামোতে টিকে থাকতে পারে, আত্মায় নয়। অনলাইন পোর্টালের বিস্তার সময়ের দাবি, কিন্তু সেই বিস্তার যদি মান ও নৈতিকতা ছাড়া ঘটে, তবে তা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভাষায়, গণমাধ্যমই জনগণের জ্ঞানের জানালা—সেই জানালা যদি কুয়াশাচ্ছন্ন হয়, তবে রাষ্ট্রের দিগন্তও অন্ধকারে ঢেকে যায়।

অতএব প্রয়োজন সংখ্যার নয়, মানের গণমাধ্যম; আনুগত্যের নয়, স্বাধীনতার সাংবাদিকতা; আর উত্তেজনার নয়, দায়িত্ববোধের ভাষা। কারণ জাতিরাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সেনাবাহিনীতে নয়, তার সচেতন নাগরিক ও সত্যভিত্তিক গণমাধ্যমে।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ০২.০২.২০২৬ খ্রি.।