এক অবিনশ্বর স্বপ্নের কারিগর


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৩০, ২০২৬, ৬:১২ অপরাহ্ন /
এক অবিনশ্বর স্বপ্নের কারিগর

অসথু ত্রিপুরা: আলো দিয়ে ইতিহাস গড়ার এক নীরব মহাকাব্য

।। জয়নব আরা বেগম ।।

যেখানে অন্ধকার ঘনীভূত হয়, সভ্যতা সেখানে কাউকে না কাউকে প্রদীপ বানিয়ে পাঠায়। ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম অনেক সময় বড় অক্ষরে লেখা থাকে না, কিন্তু তাদের আলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম পথ দেখায়। পার্বত্য আলীকদমের আমতলী পাড়ায় তেমনই এক আলোকবর্তিকার নাম—অসথু ত্রিপুরা

তিনি কোনো রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আসেননি, আসেননি কোনো দানের জৌলুস নিয়ে। তিনি এসেছিলেন মাটির গভীর থেকে—ঘামের গন্ধ মাখা হাতে, স্বপ্নে ভরা চোখে। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত সংগ্রামের মহাকাব্য, এক জ্বলন্ত স্বপ্নের নাম, যিনি বুঝেছিলেন—অন্ধকার ভাঙতে হলে আগে আলো জ্বালাতে হয়; আর সেই আলো জ্বলে শিক্ষার প্রদীপে।

জমির চেয়ে বড় হৃদয়:

মানুষ যেখানে এক চিলতে জমির জন্য আজীবন সংগ্রাম করে, সেখানে অসথু ত্রিপুরা প্রমাণ করেছেন—হৃদয়ের বিশালতা স্থাবর সম্পত্তির চেয়েও অনেক বড়। নিজের জীবিকার সম্ভাব্য উৎস, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা—সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে তিনি নিজের জমি দান করেছিলেন শিক্ষার জন্য। সেই জমিতে কোনো দালান ওঠেনি শুধু; সেখানে রোপিত হয়েছে অগণিত স্বপ্নের বীজ।

১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় অসথু ত্রিপুরা পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাহাড়ের দুর্গম জনপদে, যেখানে শিক্ষার আলো ছিল যোজন যোজন দূরে—সেখানেই তিনি নির্মাণ করলেন মুক্তির প্রথম সোপান। তিনি জানতেন, শিক্ষা মানে শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়; শিক্ষা মানে আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যতের অধিকার।

ঘামে লেখা ইতিহাস:

এই বিদ্যালয় কোনো প্রকল্পের ফল নয়, কোনো অনুদানের ফসল নয়—এটি ঘামে লেখা ইতিহাস। গভীর বন থেকে নিজ কাঁধে কাঠ কেটে আনা, নিজের কষ্টার্জিত অর্থে টিন কেনা, রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিকের কাজ নিজ হাতে করা—সবই করেছিলেন তিনি একাই। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত—তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিদ্যার এক ছোট্ট ঘর, যা আজ শত শত শিশুর স্বপ্নের ঠিকানা।

প্রতিটি হাতুড়ির আঘাতে, প্রতিটি পেরেকের গাঁথুনিতে মিশে ছিল তাঁর অবিচল নিষ্ঠা। তাঁর কাঁধের প্রতিটি ক্ষত ছিল সভ্যতার অগ্রযাত্রার এক একটি পদক। শরীর যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চেয়েছে, তখন শিক্ষার আলো ছড়ানোর স্বপ্নে তাঁর চোখ হয়েছে আরও উজ্জ্বল।

তিনি কোনো দাতার অপেক্ষায় বসে থাকেননি। কায়িক শ্রমের প্রতিটি আঘাত দিয়ে তিনি গেঁথেছেন এক একটি ভবিষ্যৎ।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ছিল আগেই:

২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হয়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায় তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু সত্য হলো—রাষ্ট্রের কাগজে নাম ওঠার অনেক আগেই এই বিদ্যালয় মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল। কারণ এটি ছিল একজন মানুষের জীবনের নির্যাস—রক্ত, ঘাম আর ভালোবাসার সমষ্টি।

অসথু ত্রিপুরা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জনপদের আত্মপরিচয়ের অংশ। এটি প্রমাণ করে—একজন সাধারণ মানুষও চাইলে অসাধারণ ইতিহাস রচনা করতে পারেন।

শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন:

অসথু ত্রিপুরা কেবল মস্তিষ্কের শিক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন না; তিনি বিশ্বাস করতেন আত্মার শান্তিতেও। মানুষের সুস্থতা তাঁর কাছে ছিল দ্বিমাত্রিক—জ্ঞান ও নৈতিকতা। তাই শিক্ষার পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাধু পিতর গীর্জা—যা আজ আমতলী পাড়ার মানুষের প্রার্থনা, বিশ্বাস ও আত্মিক প্রশান্তির অন্যতম কেন্দ্র।

একদিকে শিক্ষার মশাল, অন্যদিকে আধ্যাত্মিকতার শান্তি—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি কল্পনা করেছিলেন একটি মানবিক, সুশৃঙ্খল ও সহনশীল সমাজ। এটি ছিল ধর্ম নয়, মানবতার শিক্ষা।

এক নক্ষত্রপতনের দিন:

৩০ জানুয়ারি ২০১৮—আমতলী পাড়াবাসীর হৃদয়ে চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে থাকা একটি দিন। পাহাড় হারিয়েছিল এক নির্লোভ, নিরহংকার, শিক্ষানুরাগী ত্যাগীপুরুষকে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক বিশাল শূন্যতা—আর তার চেয়েও বড় একটি দায়িত্ব।

ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য এটি এক গভীর আক্ষেপের জায়গা। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে আমি যখন এই বিদ্যালয়ে যোগদান করি, তার কয়েক মাস আগেই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এই মহান মানুষটির সঙ্গে সরাসরি কথা বলার, তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিটি পদচিহ্নে আমি তাঁর মহত্ত্ব খুঁজে পাই।

উত্তরাধিকার ও আমাদের দায়:

অসথু ত্রিপুরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন—সম্পদ কেবল ভোগের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য বদলানোর হাতিয়ার। সমাজ বদলাতে অঢেল অর্থের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন অটল ইচ্ছাশক্তি, নিঃস্বার্থতা ও সাহস।

আজ আমতলী পাড়ার প্রতিটি ধূলিকণা তাঁর ত্যাগের সাক্ষ্য দেয়। তাঁর জীবন আমাদের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—আমরা আমাদের সময়, সামর্থ্য ও সম্পদ দিয়ে সমাজের জন্য কী করছি?

তিনি চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বেঁচে আছে—শিশুদের হাসিতে, খাতার পাতায়, শ্রেণিকক্ষের কোলাহলে। সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন আমাদের দায়িত্ব।

শ্রদ্ধাঞ্জলি:

আজ তাঁর স্মরণে আমরা মাথা নত করি গভীর কৃতজ্ঞতায়। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও শিক্ষার জন্য কাজ করাই হোক তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা। তাঁর স্বপ্ন বৃথা না যাক; বরং তাঁর আদর্শকে পাথেয় করে আমরা গড়ে তুলি নতুন দিনের সোনার মানুষ।

অসথু ত্রিপুরা অমর হয়ে থাকুন—পাহাড়ের আলোতে, মানুষের হৃদয়ে, আর আগামীর পথে।


লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, প্রধান শিক্ষক, অসথু ত্রিপুরা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলীকদম, বান্দরবান।