
বাংলাদেশের মানচিত্রে আলীকদম একটি বিস্তৃত ভূখণ্ড—আয়তনের বিচারে দেশের দশম বৃহৎ উপজেলা। অথচ এই বিশালতার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নীরব বৈপরীত্য। রয়েছে দুর্গমের বাসিন্দাদের শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস। একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ ঐশ্বর্য, অন্যদিকে মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত বহু পাহাড়ি জনপদ। মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে, পাহাড়ভাঙ্গা মুরুং পাড়ার মতো অঞ্চলগুলো যুগের পর যুগ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় অন্ধকারেই রয়ে গেছে। এমন এক রূঢ় বাস্তবতায় যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেটি কেবল একটি অবকাঠামো থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি রুদ্ধ সভ্যতার দরজা উন্মুক্ত হওয়ার অমর প্রতীক। এবার সেই রূদ্ধ সভ্যতার বন্ধ দরজার কড়া নেড়েছে সেনা বাহিনী। পাশে রয়েছে উপজেলা প্রশাসনও। পাহাড়ভাঙ্গা পাড়া থেকে মাতামুহুরীর উৎসমুখ দোছরী-পাত্তারা খুব বেশি দূরে নয়। নদী যেমন একটি ভূখণ্ডের প্রাণপ্রবাহ, শিক্ষা তেমনি একটি জাতির মানসিক ও সামাজিক বিকাশের চালিকাশক্তি।
১. স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এক নতুন ভোর:
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর বান্দরবান রিজিয়নের আওতাধীন আলীকদম জোনের (৩১ বীর) উদ্যোগে মায়ানমার সীমান্তবর্তী দুর্গম মুরুং পাড়ায় ‘পাহাড় ভাঙ্গা সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এই প্রথম শিক্ষার আলো পৌঁছাল মায়ানমার সীমান্ত থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত এই বিচ্ছিন্ন জনপদে। জোন কমান্ডার লেঃ কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমানের হাতে যখন স্কুলের উদ্বোধন হচ্ছিল, তখন পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক নতুন প্রতিধ্বনি বেজে উঠেছিল—যা কেবল উৎসবের নয়, বরং একটি প্রজন্মের ভাগ্য বদলের। এই স্কুলের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মনজুর আলম।
সপ্তদশ শতাব্দী থেকে যে ম্রো বা মুরুং জাতিগোষ্ঠী এই দুর্গম মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টে বসবাস করছে, তারা ছিল কয়েক যুগ আগেও আধুনিক পৃথিবীর স্পর্শ থেকে যোজন যোজন দূরে। তবে এখনো এই রিজার্ভের কিছু সংখ্যক মুরুং জনগোষ্ঠী আধুনিক জীবনমান থেকে পিছিয়ে আছে। তারমধ্যে অন্যতম পাহাড় ভাঙ্গার এলাকার মুরুং জনগোষ্ঠী। আলীকদম সদর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি সেবা পৌঁছানো যেখানে এক সময় দুঃসাধ্য ছিল, সেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছানো ছিল এক রূপকথার মতো। ইতোপূর্বে পর্যটক হিসেবে মাতামুহুরীর উৎসমুখ অনুসন্ধানে গিয়ে আমরা দেখেছি পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ার সেই শিশুদের তৃষ্ণার্ত চোখ, যারা শিক্ষার অভাবে অন্ধকারে বেড়ে উঠছিল। আজ সেই শিশুরা আর অবহেলার পাত্র নয়; তারা হবে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার কারিগর।
২. মনীষীর দর্শন ও শিক্ষার শক্তি:
শিক্ষা কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়; শিক্ষা মানুষের আত্মমর্যাদা, চিন্তার স্বাধীনতা ও সামাজিক ক্ষমতায়নের মূল চাবিকাঠি। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “Education is the most powerful weapon which you can use to change the world”—শিক্ষাই পৃথিবী বদলে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। পাহাড়ি জনপদের বাস্তবতায় এই উক্তির গভীরতা আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়। যেখানে একটি বই মানে নতুন দিগন্ত, একটি স্কুল মানে একটি অন্ধকার গহ্বর থেকে মুক্তির সূচনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “শিক্ষা মানুষকে মুক্ত করে, আর মুক্ত মানুষই পারে সমাজকে আলোকিত করতে।” ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, “একটি স্কুল খোলা মানে একটি জেলখানা বন্ধ করা।” পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ায় এই বিদ্যালয়টি খোলার মাধ্যমে মূলত এই জনপদের কয়েক প্রজন্মের বঞ্চনা ও অজ্ঞতার শিকল ছিঁড়ে ফেলা হলো। পাহাড়ের এই প্রান্তিক জনপদে আজ সেই মুক্তির আলোই প্রজ্জ্বলিত হয়েছে।
৩. দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার অপরিহার্যতা:
পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি শিশুকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসে—অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, ভয় থেকে আত্মবিশ্বাস এবং নির্ভরতা থেকে স্বনির্ভরতায়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা সামাজিক বৈষম্য কমায়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যখন শিক্ষার সুযোগ পায়, তখন তারা রাষ্ট্রের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, শিক্ষা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে তোলে। একটি শিক্ষিত সমাজ বিভ্রান্তির শিকার কম হয়, সহিংসতার পথ পরিহার করে এবং যুক্তি ও মানবিকতার চর্চা করে।
৪. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উন্নয়নের দর্শন:
উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখি—পাহাড়ি বা দুর্গম অঞ্চলের উন্নয়নে শিক্ষা ছিল প্রথম এবং প্রধান হাতিয়ার। নরওয়ের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে ছোট ছোট ‘কমিউনিটি স্কুল’ স্থাপন করে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। জাপানের প্রত্যন্ত দ্বীপাঞ্চলেও সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন মিলিতভাবে প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। কানাডার উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল প্রাথমিক শিক্ষা। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে—ভৌগোলিক দুর্গমতা উন্নয়নের অন্তরায় নয়, যদি সঠিক সময়ে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া যায়। আজ পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ার এই বিদ্যালয়টি সেই বৈশ্বিক মানদণ্ডেই এক অনন্য সংযোজন।
৫. মানবিক সেনাবাহিনী ও আস্থার সেতুবন্ধন:
নিরাপত্তা বাহিনীর উদ্যোগে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে এক মানবিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। নিরাপত্তা কেবল অস্ত্রের শক্তিতে নয়, মানুষের হৃদয়ে আস্থা সৃষ্টির মধ্য দিয়েও প্রতিষ্ঠিত হয়। যখন কোনো বাহিনী শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসে, তখন তারা কেবল নিরাপত্তা রক্ষক নয়—সমাজগঠনের সহযাত্রী হয়ে ওঠে। লেঃ কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমানের কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়— “শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর”, তখন তা পাহাড়ের মুরুং জনগোষ্ঠীর মনে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস ও সম্প্রীতির এক মজবুত সেতুবন্ধন তৈরি করে।
৬. আগামীর সম্ভাবনা ও রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি:
পাহাড়ের শিশুর হাতে যখন বই ওঠে, তখন তার চোখে জন্ম নেয় ভবিষ্যতের ছবি। আজ যে শিশু পাহাড়ের ঢালে বসে বর্ণমালা শিখছে, আগামীকাল সে হতে পারে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসক কিংবা গবেষক। পাহাড়ভাঙ্গা পাড়া থেকে মাতামুহুরীর উৎসমুখ দোছরী-ফাত্তারা খুব বেশি দূরে নয়। প্রকৃতির সেই উৎসমুখ যেমন নদীকে বাঁচিয়ে রাখে, এই বিদ্যালয়টিও তেমনি একটি জনপদের প্রাণশক্তি হয়ে থাকবে।
দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো পৌঁছানো মানে কেবল উন্নয়ন নয়—এটি একটি ‘ন্যায়বিচার’। এটি রাষ্ট্রের সেই অলিখিত প্রতিশ্রুতি যে, তার প্রতিটি নাগরিক, যত দূরেই থাকুক না কেন, সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। পাহাড়ের প্রতিটি শিশুর চোখে যখন স্বপ্ন জ্বলে ওঠে, তখনই একটি জাতির অগ্রযাত্রা সত্যিকার অর্থে শুরু হয়। তাই এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মানে কেবল ক্লাসরুম নয় তৈরী নয়—এটি একটি সামাজিক কেন্দ্র, একটি আশ্রয়স্থল, একটি স্বপ্নের কারখানা। এই বিদ্যালয়ের একজন শিশু অনাগত দিনে কেবল নিজের জীবন নয়, তার পরিবার, সমাজ এবং গোটা জনপদের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
উপসংহার:
এডমন্ড বার্ক বলেছিলেন, “শিক্ষাই মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ আর আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তোলে।” মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা এই পাহাড়ের শিশুদের হাতে যখন আজ কলম উঠেছে, তখন তারা আর কেবল জুমচাষী বাবা-মায়ের নিরক্ষর সন্তান নয়; তারা এখন বিশ্বনাগরিক হওয়ার পথে এক নির্ভীক অভিযাত্রী।
পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ার এই আলোর পাঠশালা একদিন মহীরুহ হবে। মাতামুহুরীর জলধারা যেমন এই জনপদকে তৃষ্ণা মেটায়, তেমনি এই বিদ্যালয়টি মেটাবে জ্ঞানের তৃষ্ণা। পাহাড়ের ঢালে বছরের পর বছর ধরে টিকে থাকা মুরুংদের লড়াকু জীবন এখন যুক্ত হবে আধুনিক সভ্যতার মূলস্রোতে। অন্ধকারের অবসান ঘটে আলোর এই শুভ সূচনা যেন কখনো স্তিমিত না হয়।
খরস্রোতা মাতামুহুরী পাড়ের ‘পাহাড় ভাঙ্গা সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ হয়ে উঠুক নতুন ভোরের সূর্য। এই স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে যে প্রতিধ্বনি তুলবে তাতে প্রতিধ্বনীত হোক আগামীর এক উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আহ্বান। অন্ধকারের অবসান ঘটে শিক্ষার যে শুভ সূচনা আজ হলো, তা আলীকদমের প্রতিটি পাহাড়ি জনপদে ছড়িয়ে পড়ুক—এই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ০৪.০২.২০২৬ খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :