
সূরা আল-মুলকের ১৮ থেকে ২৭ পর্যন্ত আয়াতসমূহ একটি ধারাবাহিক আহ্বান — মানুষের দৃষ্টি, শ্রবণ, চিন্তা ও পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আল্লাহর নিদর্শন খুঁজে নেওয়ার আহ্বান। এই আয়াতগুলোতে চারটি মূল থিম স্পষ্ট:
১. প্রকৃতির মাধ্যমে আল্লাহর নিদর্শন — পাখির উড়ান, জলচক্র, রিজিক ও নিরাপত্তা
২. ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির উৎস — সৃষ্টির অনুধাবন ও জবাবদিহি
৩. কুফর-অবজ্ঞার পরিণতি — যারা সত্যে অন্ধ, তাদের অবস্থা
৪. ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা — আল্লাহর প্রতি নম্র হওয়ার আহ্বান
এই নিবন্ধে আমরা প্রতিটি থিম কুরআন, হাদিস ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করবো।
“أَوَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ فَوْقَهُمْ صَافَّاتٍ وَيَقْبِضْنَ ۚ مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا الرَّحْمَٰنُ ۚ إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ بَصِيرٌ”
“তারা কি লক্ষ্য করে না তাদের উপরে উড়ন্ত পাখিদেরকে, যারা ডানা মেলে ও তা গুটিয়ে ধরে? দয়াময় আল্লাহই কেবল তাদেরকে স্থিত রাখেন। নিশ্চয় তিনি সবকিছুই দেখেন।”
— সূরা আল-মুলক: ১৯
তাফসিরে ইবনে কাসীর ও তাফসির আল-জালালাইনে বলা হয়েছে: এই আয়াত মানুষের চিন্তাশীল দৃষ্টিকে জাগ্রত করে। যেসব ঘটনা আমরা স্বাভাবিক মনে করি (যেমন পাখির উড়ান), সেগুলোর পেছনেও আল্লাহর অপার কুদরত ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
তাফসিরে মা’আরেফুল কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে: পাখিরা কীভাবে ভারী শরীর নিয়ে আকাশে থাকে, কীভাবে ডানা মেলে ও গুটিয়ে নিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে — এসবই আল্লাহর পরিকল্পনার নিদর্শন। এটি মানুষকে গভীর চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে।
এ্যারোডায়নামিক্স (Aerodynamics) অনুযায়ী, পাখির উড়ান চারটি মূল বলের সমন্বয়ে ঘটে:
পাখির পাখনার গঠন, হালকা হাড়, বিশেষায়িত পেশীতন্ত্র — সবকিছু মিলিয়ে এক জটিল ও নিখুঁত ব্যবস্থা। বিজ্ঞান এই ‘কীভাবে’ ব্যাখ্যা করে, কিন্তু কুরআন প্রশ্ন তুলে ‘কেন’ — কে এই ব্যবস্থা সৃষ্টি করলো? উত্তর: আল্লাহ, আর-রহমান।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“تَفَكَّرُوا فِي خَلْقِ اللَّهِ وَلَا تَفَكَّرُوا فِي اللَّهِ”
“আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করো, কিন্তু আল্লাহর সত্তা নিয়ে গভীর চিন্তায় যেও না।”
— আবু নু’আইম, হিলয়াতুল আউলিয়া
এই হাদিস স্পষ্ট করে যে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও তার নিয়ম উদঘাটন ইবাদতের অংশ।
“أَفَرَأَيْتُمُ الْمَاءَ الَّذِي تَشْرَبُونَ • أَأَنتُمْ أَنزَلْتُمُوهُ مِنَ الْمُزْنِ أَمْ نَحْنُ الْمُنزِلُونَ”
“বল, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, যদি তোমাদের পানি মাটির গভীরে চলে যায়, তাহলে কে তোমাদেরকে প্রবাহমান পানি এনে দেবে?'”
— সূরা আল-মুলক: ৩০ (সম্পর্কিত আয়াত)
আরও বলা হয়েছে:
“وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً بِقَدَرٍ فَأَسْكَنَّاهُ فِي الْأَرْضِ ۖ وَإِنَّا عَلَىٰ ذَهَابٍ بِهِ لَقَادِرُونَ”
“আমি আকাশ থেকে পরিমিত পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তা মাটিতে স্থাপন করি, এবং নিশ্চয়ই তা অপসারণ করতেও সক্ষম।”
— সূরা আল-মুমিনুন: ১৮
তাফসিরবিদগণ বলেন: এখানে পানিচক্রের দিকে সাংকেতিক ইঙ্গিত রয়েছে — বাষ্পীভবন, মেঘ, বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ প্রবাহ — সবই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের নিদর্শন। যদি আল্লাহ এই চক্র বন্ধ করে দেন, কোনো মানুষই তা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
বৈজ্ঞানিক পানিচক্রের ধাপগুলো:
১. বাষ্পীভবন (Evaporation): সমুদ্র, নদী থেকে পানি বাষ্প হয়ে ওঠে।
২. ঘনীভবন (Condensation): বাষ্প মেঘে পরিণত হয়।
৩. বৃষ্টিপাত (Precipitation): মেঘ থেকে বৃষ্টি, তুষার আকারে পানি ফিরে আসে।
৪. ভূপৃষ্ঠীয় প্রবাহ (Surface Runoff): পানি নদীতে প্রবাহিত হয়।
৫. ভূগর্ভস্থ পানি (Groundwater): মাটিতে শোষিত পানি সঞ্চিত থাকে।
কুরআনের বর্ণনা এই চক্রের ‘আশ্চর্য্যতা’ তুলে ধরে — যে প্রক্রিয়াগুলো আপাতদৃষ্টিতে স্বয়ংক্রিয়, বাস্তবে সেগুলো আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلِّ رُمْحِي”
“আমার রিজিক আমার বর্শার ছায়ার নিচে রাখা হয়েছে (অর্থাৎ জিহাদে)। আর যে ব্যক্তি আমার আদেশের বিরোধিতা করবে, তার জন্য লাঞ্ছনা।”
— সহীহ বুখারী
তবে পানি সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন:
“خَيْرُ الْمَاءِ مَاءُ زَمْزَمَ”
“সর্বোত্তম পানি হলো যমযমের পানি।”
— ইবনে মাজাহ
“أَمَّنْ هَٰذَا الَّذِي يَرْزُقُكُمْ إِنْ أَمْسَكَ رِزْقَهُ ۚ بَل لَّجُّوا فِي عُتُوٍّ وَنُفُورٍ”
“আল্লাহ ছাড়া এমন কে আছে, যে তোমাদের রিজিক দেবে, যদি তিনি তাঁর রিজিক বন্ধ করে দেন? বরং তারা অহংকার ও সত্যবিমুখতায় লিপ্ত।”
— সূরা আল-মুলক: ২১
রিজিক বলতে শুধু খাদ্য নয়, বরং জীবনধারণের সকল উপকরণ — নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সামর্থ্য। তাফসিরবিদগণ বলেন: মানুষ প্রায়ই নিজের চেষ্টাকেই রিজিকের উৎস মনে করে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ভুলে যায় — এটিই অহংকার।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَوْ أَنَّكُمْ تَوَكَّلْتُمْ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا يُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا”
“যদি তোমরা আল্লাহর উপর প্রকৃত তাওয়াক্কুল করতে, তাহলে তিনি তোমাদের রিজিক দিতেন যেমন পাখিদের দেন — সকালে ক্ষুধার্ত বের হয়, সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে।”
— সুনানে তিরমিযী: ২৩৪৪
এই হাদিস স্পষ্ট করে: রিজিকের জন্য চেষ্টা করা ইবাদত, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর হাতে।
আধুনিক অর্থনীতি উৎপাদন, বাজার, অবকাঠামোর উপর জোর দেয়। ইসলাম এসবকে উৎসাহিত করে, কিন্তু সাথে যোগ করে:
“قُلْ هُوَ الَّذِي أَنشَأَكُمْ وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ ۖ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ”
“বলুন, ‘তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে শ্রবণ, দর্শন ও হৃদয় দিয়েছেন। কিন্তু তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।'”
— সূরা আল-মুলক: ২৩
আরও বলা হয়েছে:
“وَاللَّهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ ۙ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ”
“আল্লাহ তোমাদেরকে মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন, তোমরা কিছুই জানতে না। আর তিনি তোমাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় দান করেছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।”
— সূরা আন-নাহল: ৭৮
তিনটি নেয়ামত বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
১. শ্রবণশক্তি (السَّمْعَ): জ্ঞান আহরণ, কুরআন শোনা ও সত্য গ্রহণের মাধ্যম।
২. দর্শনশক্তি (الْأَبْصَارَ): আল্লাহর নিদর্শন দেখে তাঁকে চিনতে পারার উপায়।
৩. হৃদয় (الْأَفْئِدَةَ): চিন্তা, উপলব্ধি, বিশ্বাস ও ভালোবাসার কেন্দ্র।
আধুনিক নিউরোসায়েন্স প্রমাণ করে:
কুরআন এই ইন্দ্রিয়গুলোকে শুধুই শারীরিক অঙ্গ নয়, বরং আল্লাহর পথে চলার হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا”
“নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয় — এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
— সূরা আল-ইসরা: ৩৬ (কুরআন); হাদিসেও উল্লেখিত
“قُلْ هُوَ الَّذِي ذَرَأَكُمْ فِي الْأَرْضِ وَإِلَيْهِ تُحْشَرُونَ”
“বলুন, ‘তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে বিস্তার করেছেন এবং তাঁর কাছেই তোমরা সমবেত হবে।'”
— সূরা আল-মুলক: ২৪
এই আয়াত মানবজাতির ভূমিতে বিস্তার (গোত্র, জাতি, ভাষার বৈচিত্র্য) এবং চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন (হাশর) — উভয়ই আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ। দুনিয়ার জীবন অস্থায়ী; চূড়ান্ত গন্তব্য আখিরাত।
“وَيَقُولُونَ مَتَىٰ هَٰذَا الْوَعْدُ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ”
“তারা বলে, ‘এই প্রতিশ্রুতি কবে পূর্ণ হবে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও?'”
— সূরা আল-মুলক: ২৫
“قُلْ إِنَّمَا الْعِلْمُ عِندَ اللَّهِ وَإِنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُّبِينٌ”
“বলুন, ‘এ জ্ঞান তো কেবল আল্লাহর কাছে, আর আমি শুধু সুস্পষ্ট সতর্ককারী।'”
— সূরা আল-মুলক: ২৬
কিয়ামতের সময় কেউ জানে না — এটি আল্লাহর একান্ত গোপন। নবী (সা.)-এর দায়িত্ব কেবল সতর্ক করা, জোর-জবরদস্তি নয়।
“فَلَمَّا رَأَوْهُ زُلْفَةً سِيئَتْ وُجُوهُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَقِيلَ هَٰذَا الَّذِي كُنتُم بِهِ تَدَّعُونَ”
“যখন তারা শাস্তিকে নিকটবর্তী দেখবে, তখন কাফিরদের চেহারা বিকৃত হয়ে যাবে এবং বলা হবে: ‘এটিই সেই সত্য, যা তোমরা অস্বীকার করতে।'”
— সূরা আল-মুলক: ২৭
আখিরাতের শাস্তি কোনো কল্পনা নয় — এটি কঠিন বাস্তবতা। কাফিররা তখন নিজেরাই স্বীকার করবে, কিন্তু সেই স্বীকৃতির কোনো মূল্য থাকবে না।
সূরা আল-মুলকের এই আয়াতগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক কাঠামো উপস্থাপন করে:
কুরআন বৈজ্ঞানিক বিশদ বর্ণনা দেয় না; বরং মানুষকে চিন্তা করতে, দেখতে, প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রকৃতির নিদর্শন মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিক্রিয়ার জন্য উপস্থাপিত।
আধুনিক বিজ্ঞান সেই নিদর্শনগুলোর ‘কীভাবে’ ব্যাখ্যা করে — এ্যারোডায়নামিক্স, হাইড্রোলজি, নিউরোসায়েন্স। এটি কুরআনের আহ্বানকে শক্তিশালী করে, কিন্তু প্রতিস্থাপন করে না।
কুরআনকে “বৈজ্ঞানিক প্রমাণ” হিসেবে উপস্থাপন বা অতিমাত্রায় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আরোপ (Over-inference) করা উচিত নয়। বরং:
এই আয়াতগুলোর মূল আহ্বান:
১. চিন্তা করো (তাফাক্কুর) — প্রকৃতির নিদর্শনে আল্লাহকে চিনো
২. কৃতজ্ঞ হও (শুকর) — নেয়ামতের স্বীকৃতি দাও
৩. দায়িত্বশীল হও — ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি সৎপথে ব্যবহার করো
৪. প্রস্তুত থাকো — আখিরাতের জবাবদিহির জন্য
সূরা আল-মুলকের ১৮-২৭ নং আয়াত আমাদেরকে তিনটি স্তরে আহ্বান জানায়:
১. বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর: প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করো, বিজ্ঞান অধ্যয়ন করো
২. আধ্যাত্মিক স্তর: আল্লাহর নিদর্শনে তাঁকে চিনো, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও
৩. নৈতিক স্তর: ন্যায়, বিনয় ও দায়িত্বশীলতার সাথে জীবনযাপন করো
আল্লাহ আমাদের সকলকে এই আয়াতসমূহের গভীর শিক্ষা অনুধাবন করার এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
প্রধান উৎসসমূহ:
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
আপনার মতামত লিখুন :