‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু’: নজরুলের গানে আধ্যাত্মিক, দার্শনিক ও মহাজাগতিক উপলব্ধি


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ৩, ২০২৫, ৩:২২ অপরাহ্ন /
‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু’: নজরুলের গানে আধ্যাত্মিক, দার্শনিক ও মহাজাগতিক উপলব্ধি

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


কাজী নজরুল ইসলাম, বাংলা সাহিত্যের এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ, তাঁর লেখনীর মাধ্যমে কেবল বিদ্রোহের আগুনই জ্বালাননি, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসাও তুলে ধরেছেন। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘হারানো সুর’ তেমনই এক কালজয়ী গান, যা দাদরা তালে রচিত। ১৯৩৫ সালের আগস্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪২) মাসে মৃণাল কান্তি ঘোষ এইচএমভি এন-৭৩৯৩ মূলে এই গানটি প্রথম রেকর্ড করেন। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৬ বছর ২ মাস। আহসান মুর্শেদ কর্তৃক সংকলিত ‘নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি’র সাতাশ খণ্ডে এটি ১৮ সংখ্যক গান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। পর্যায়ক্রমে এটি ধর্মসঙ্গীত (মরমী) ও ভজন সুরাঙ্গের অন্তর্গত।

গানের ভাবার্থ: একেশ্বরবাদের ভাবনা

গানটির মূল ভাবার্থ সনাতন হিন্দু ধর্মের বিশ্বের প্রতিপালক দেবতা নারায়ণ তথা বিষ্ণুর বন্দনা হলেও, এর অন্তর্নিহিত সুর পরম-ব্রহ্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আক্ষরিক অর্থে গানটি বৈষ্ণব-সঙ্গীত হলেও, ভাবার্থের বিচারে তা একেশ্বরবাদের ভাবনায় সম্পৃক্ত। উপনিষদের একেশ্বরবাদী ভাবনায় পরম-ব্রহ্মই পরমার্থিক সত্তা।

কবি তাঁর জীবন-দর্শনের মধ্য দিয়ে অনুভব করেছেন—মহান স্রষ্টার কল্যাণে এই মহাবিশ্বে যা কিছুর উদ্ভব হয়, তার কোনো কিছুই হারিয়ে যায় না। আমরা অবোধ মানুষ, তা বুঝতে না পেরে পার্থিব মায়াময় প্রপঞ্চে হারিয়ে যাওয়ার বেদনায় অন্ধ আবেগে বিলাপ করি। পরম স্রষ্টার মতোই তাঁর ভুবন অসীম এবং চিরন্তন। তিনি সম্পূর্ণ বলেই জগৎ চির পূর্ণ হয়ে বিরাজ করে। তাই স্রষ্টার ভুবনে যা কিছু হারায় বলে মনে হয়, তার সবই স্রষ্টার অসীম ভুবনের অংশ হয়ে রয়ে যায়।

কবি মনে করেন যা হারিয়ে যায়, তা নবতর রূপে ফিরে আসে। মায়াময় পৃথিবীতে যে ফল ধূলায় পড়ে বিনষ্ট হয়, সেই ফল থেকেই জন্ম নেয় তরুণ তরু। সত্তার এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই হারিয়ে যাওয়া সবকিছুই নব নব রূপে ফিরে আসে। প্রিয়জনের হারানোর বেদনায় অবোধ মানুষ বিলাপ করেন। মূলত পার্থিব জগৎ থেকে তারা হারিয়ে যান বটে, কিন্তু তাঁরা মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে স্রষ্টার কাছে আশ্রয় নেন বলেই—এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুই হারায় না। কবির সার্বিক জীবন-দর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি যে উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছেন, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই গানে। তাই এই গানটি হয়ে উঠেছে ধর্মসঙ্গীত-ভিত্তিক মরমী গান।

আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক সুরের বিশ্লেষণ

'তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু' গানটির প্রতিটি পঙ্ক্তিতে আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক গভীরতা স্পষ্ট। যেমন:
  • আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরতা: গানে “প্রভু” বা “নারায়ণ” সম্বোধন আল্লাহর প্রতি কবির গভীর বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণের ভাব প্রকাশ করে। কবি মনে করেন, যা কিছু হারায়, তা আল্লাহর কাছেই থাকে। এই বিশ্বাস শোককে প্রশমিত করে এবং এক ধরনের সান্ত্বনা এনে দেয়।
  • অবিনশ্বরতার ধারণা: “তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু” – এই পঙ্ক্তিটি আধ্যাত্মিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। জাগতিক দৃষ্টিতে যা বিলীন হয়ে যায়, বৃহত্তর আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপটে তার বিনাশ নেই। সবকিছুই ঈশ্বরের বিশাল সৃষ্টিতে কোনো না কোনো রূপে বিদ্যমান থাকে।
  • মায়া ও অন্ধত্ব: “আমরা অবোধ, অন্ধ মায়ায় তাই তো কাঁদি প্রভু।” – এই চরণে জাগতিক মোহ বা মায়াকে অন্ধত্বের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা আমাদের সত্য উপলব্ধি করতে বাধা দেয়। হারানোর কষ্টও এই মায়ারই অংশ হতে পারে; আধ্যাত্মিক জ্ঞান এই মায়া থেকে মুক্তি দিতে পারে।
  • পরিবর্তন ও স্থিতিশীলতা: গানটি পরিবর্তনের অনিবার্যতা এবং একই সাথে এক গভীর স্থিতিশীলতার ধারণাকে ধারণ করে। “ঝরে যে ফল ধূলায় জানি, হয় না তাহা (কভু) হারা, ঐ ঝরা ফলে নেয় যে জনম তরুণ তরুর চারা — তারা হয় না কভু হারা” – এই দৃষ্টান্ত জীবনচক্রের পরিবর্তনকে নির্দেশ করে, যেখানে পুরনো জিনিসের সমাপ্তি নতুন কিছুর সূচনা করে। আপাতদৃষ্টিতে হারানো মনে হলেও, প্রকৃতির নিয়মে সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকে।
  • নশ্বরতা ও অবিনশ্বরতার দ্বন্দ্ব: গানটিতে ব্যক্তিগত হারানোর শোকের মাধ্যমে নশ্বর জগতের দুঃখ এবং বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে অবিনশ্বরতার দার্শনিক ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। কবি জানেন, তার প্রিয়জনরা তার কাছে না থাকলেও মহান প্রভূ আল্লাহর কাছে আছেন, অর্থাৎ তারা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাননি।
  • দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা: “দেখতে না পায় অন্ধ নয়ন তাই এ দুঃখ প্রভু” – এই পঙ্ক্তিটি আমাদের সীমিত জাগতিক দৃষ্টির কথা বলে। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যা হারানো মনে হয়, তা আসলে অন্য কোনো রূপে বিরাজমান। আমাদের সীমিত দৃষ্টির কারণেই আমরা দুঃখ অনুভব করি।

বিজ্ঞান, ধর্ম ও বাস্তবতার নিরিখে মহাজাগতিক যোগসূত্র:

যদিও গানটিতে সরাসরি বিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব তুলে ধরা হয়নি, এর অন্তর্নিহিত ভাবনার সঙ্গে বিজ্ঞান, ধর্ম ও বাস্তবতার ক্ষীণ যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

  • বস্তুর অবিনশ্বরতা: “তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু” – এই পঙ্ক্তিটি অনেকটা শক্তির নিত্যতা বা বস্তুর অবিনশ্বরতার ধারণার কাছাকাছি যেতে পারে। বিজ্ঞান বলে, মহাবিশ্বে মোট বস্তু ও শক্তির পরিমাণ ধ্রুব থাকে, এদের কেবল রূপান্তর ঘটে, কোনো কিছুই সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। কবিতায়ও সেই ভাবনার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
  • মহাবিশ্বের বিশালতা: “তোমার মতই তোমার ভুবন চির পূর্ণ, হে নারায়ণ!” – এই পঙ্ক্তিটি মহাবিশ্বের অসীমতা ও পূর্ণতার ইঙ্গিত দেয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আমরা মহাবিশ্বের বিশালতা এবং সেখানে থাকা অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্রের কথা জানি। যদিও গানটি সরাসরি সেই অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, তবে একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের ধারণা এখানে বিদ্যমান।
  • প্রকৃতির দৃষ্টান্তের ব্যবহার: ঝরে যাওয়া ফল থেকে নতুন চারার জন্মের উপমাটি জীবন, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের শাশ্বত চক্রকে তুলে ধরে। এর মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে আপাতদৃষ্টিতে বিনাশ ঘটলেও, প্রকৃতির নিয়মে নতুন কিছুর সৃষ্টি হয়। এটি প্রকৃতির বাস্তুতন্ত্রের একটি সুন্দর উদাহরণ, যেখানে বস্তু এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু ধ্বংস হচ্ছে না।
  • ভাষার সরলতা ও গভীরতা: গানটির ভাষা অত্যন্ত সরল হলেও ভাবনার গভীরতা অসীম। সহজ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কবি জীবনের কঠিন সত্যগুলোকে স্পর্শ করেছেন। “আমরা অবোধ, অন্ধ মায়ায় তাই তো কাঁদি প্রভু” – এই সরল স্বীকারোক্তি আমাদের জাগতিক সীমাবদ্ধতা এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অভাবকে তুলে ধরে।
  • অন্তিম পংক্তির সান্ত্বনা: শেষের পঙ্ক্তি (“আমার কাছে নাই তাহারা — হারায়নিক’ তবু”) গানটির মূল সুরটিকে আরও দৃঢ় করে। প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করলেও, কবি এই সত্যে সান্ত্বনা খুঁজে পান যে তারা মহাবিশ্বের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে হারিয়ে যাননি। এই উপলব্ধি শোকের মধ্যেও এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়।
সংক্ষেপে, কাজী নজরুল ইসলামের 'তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু' গানটি ব্যক্তিগত শোকের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে মহাজাগতিক অবিনশ্বরতার এক গভীর দার্শনিক বার্তা বহন করে। এটি আমাদের শেখায় যে জাগতিক দৃষ্টিতে যা হারানো মনে হয়, বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তা আসলে রূপান্তরেরই এক অংশ। কবির এই উপলব্ধি ব্যক্তিগত শোকের ঊর্ধ্বে উঠে এক সার্বজনীন সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। এই গানটি কেবল একটি সঙ্গীত নয়, বরং জীবন ও মৃত্যুর এক গভীর দার্শনিক ভাষ্য, যা আজও আমাদের মননে অনুরণিত হয়।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: 03 জুন ২০২৫ খ্রি.