
বার্ট্রান্ড রাসেলের যুক্তিবাদী-মানবতাবাদী দর্শন এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী-মানবতাবাদী সাহিত্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে তুল্যমূল্য ব্যাপক অনুসন্ধান সাপেক্ষ। তবে “স্বপ্ন ও বাস্তব” প্রবন্ধে রাসেলের যে রেশনালিস্ট অবস্থান উদ্ভাসিত হয়, তার সঙ্গে নজরুলের কাব্য ও গদ্যে প্রকাশিত মানবমুক্তির রাজনৈতিক অবস্থান কীভাবে ভিন্ন এবং কোথায় মিল রয়েছে—তা বিশ্লেষণে বেশ কিছু চিন্তার রসদ পাওয়া যায়। রাসেলের জিজ্ঞাসু যুক্তিবাদ এবং নজরুলের বিপ্লবী মানববাদ উভয়ই একই লক্ষ্য—মানুষের মুক্তি—অর্জনের ভিন্নতর পথ।
বিশ্বদর্শনের ইতিহাসে বার্ট্রান্ড রাসেল এবং কাজী নজরুল ইসলাম একে অপরের সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিনিধি হলেও মানবিক মুক্তি ও ন্যায়-অন্যায় প্রশ্নে তাঁরা এক ধরনের অন্তর্নিহিত সাদৃশ্য বহন করেন। রাসেল যুক্তিবাদ, সংশয় ও বৈজ্ঞানিক মনোভাব দিয়ে মানুষকে মুক্ত করতে চাইলে নজরুল বিদ্রোহ, প্রতিবাদ, ন্যায়বিচার ও সাম্যের দার্শনিক বোধ দিয়ে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ান। উভয়েরই রচনা একটি রাজনৈতিক, নৈতিক এবং বৌদ্ধিক অবস্থানে পৌঁছে দেয়, যা আধুনিক মানবতাবাদ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সাহিত্য পর্যালোচনা: রাসেলের “Sceptical Essays” বিশ শতকের যুক্তি, রাজনীতি ও নৈতিকতা বোঝার অন্যতম প্রধান গ্রন্থ। এর অনুবাদক আহমদ ছফা “স্বপ্ন ও বাস্তব” রচনায় যে যুক্তিমূলক অবস্থান তুলে ধরেছেন তা স্বাধীন চিন্তা ও কর্তৃত্ববিমুখতার প্রকাশ। অন্যদিকে নজরুলের “বিদ্রোহী”, “সংকল্প”, “দুর্গম গিরি কান্তার মরু”, “কান্ডারী হুঁশিয়ার”—সবগুলোতেই উঠে আসে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সাম্য, ধর্মীয় ভেদাভেদ-অতিক্রমের ঘোষণা এবং উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষা।
এ দুই প্রবণতার তুলনা নিয়ে বাংলা ভাষায় গভীর গবেষণা খুব বেশি নেই—বিশেষত দ্বন্দ্বমূলক রাজনৈতিক পাঠের ক্ষেত্রে। এই গবেষণা সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা।
তাত্ত্বিক কাঠামো (Theoretical Framework): আমরা তিনটি তিনটি তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর রাসেল ও নজরুলকে বিশ্লেষণ করবো। ১. যুক্তিবাদ (Rationalism): রাসেলের দার্শনিক অবস্থান, ২. বিপ্লবী মানবতাবাদ (Revolutionary Humanism): নজরুলের রাজনৈতিক-সাহিত্যিক দর্শন ও ৩. বস্তুবাদী-ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: মানবমুক্তি, ক্ষমতা, রাষ্ট্র ও সমাজ বিন্যাসের দ্বন্দ্বমূলক পাঠ।
এই বিশ্লেষণে আমরা এই দুই মনিষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করবো।
১. মানবমুক্তির লক্ষ্য: সমান্তরাল দুই পথ: রাসেল বলেন, মানুষের মুক্তি কেবল তখনই সম্ভব যখন সে নিজস্ব চিন্তাকে কর্তৃত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে—ধর্ম, রাষ্ট্র, প্রচলিত নৈতিকতা এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সমানভাবে দাঁড়িয়ে। নজরুলও ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও জাতিভেদব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার, তবে তাঁর ভাষা যুক্তির চেয়ে বেশি আবেগময়, কবিতাময় এবং রাজনৈতিক।
অর্থাৎ, রাসেল মুক্তিকে বৌদ্ধিক স্বাধীনতা হিসেবে দেখেন; নজরুল দেখেন রাজনৈতিক-সামাজিক স্বাধীনতা হিসেবে।
২. “স্বপ্ন ও বাস্তব”: রাসেলের সংশয়বাদ: রাসেল দেখান—মানুষের স্বপ্ন যদি যুক্তিহীন ও মূল্যবোধহীন হয়, তবে তা মানুষকে অন্ধ বিশ্বাসে আচ্ছন্ন করে। অন্যদিকে বাস্তবতা সেই স্বপ্নকে শাসন করে এবং মানুষকে নিজের সীমা বুঝতে সাহায্য করে। তাঁর দৃষ্টিতে স্বপ্নের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা যুক্তির আলোকে শোধিত না হলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।
নজরুলের কাছে স্বপ্ন রাজনৈতিক—একটি নতুন সমাজ, শোষণমুক্ত দেশ, সাম্যের পৃথিবী। রোমান্টিক ও বিপ্লবী মেজাজ তাঁর স্বপ্নকে শুধু কল্পনা নয়, আন্দোলনের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
৩. যুক্তি বনাম বিদ্রোহ: রাসেলের জগৎ হল জিজ্ঞাসা, যুক্তি, পরীক্ষণ। নজরুলের জগৎ হল বিদ্রোহ, প্রতিরোধ, কাব্যিক উত্তাপ। এখানেই তাঁদের সংঘাত।
রাসেল রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেন; নজরুল রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেন।
রাসেল নৈতিকতার মানদণ্ড তৈরি করতে চান যৌক্তিক ন্যায্যতায়; নজরুল নৈতিকতার ভিত্তি দেখেন মানবজন্মগত স্বাধীনতায়।
৪. রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব: উপনিবেশ বনাম উদার গণতন্ত্র: রাসেল ব্রিটিশ উদার গণতন্ত্রের ভেতর থেকে ফ্যাসিবাদ, যুদ্ধনীতি, সামরিকবাদ এবং দমননীতির সমালোচনা করেছেন। কিন্তু নজরুল লড়ছেন উপনিবেশিক দাসত্বের বিরুদ্ধে—যেখানে মানুষের মৌলিক সামাজিক অস্তিত্বই অস্বীকৃত ছিল।
এই দুই বাস্তবতা তাঁদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিন্ন করে—তবুও লক্ষ্য একই: অমানবিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
৫. ধর্মীয় প্রশ্ন: যুক্তিবাদ বনাম সার্বজনীনতা: রাসেল ধর্মকে মানুষকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার মনে করেন। নজরুল ধর্মকে মনে করেন মানুষের আত্মিক স্বাধীনতার পন্থা—তবে তিনি ধর্মীয় উচ্চারণকে মুক্তির ভাষায় রূপান্তর করেন—”আমি ধর্ষিতা জননীর বক্ষে আগ্নেয়গিরি”, “সকল ধর্মের মিলনক্ষেত্র আমার দেশ”।
এইভাবে নজরুল একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক—রাসেল পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তির ভিতর।
রাসেল ও নজরুল মানবমুক্তির দুই ভিন্ন পথপ্রদর্শক। একজন বৌদ্ধিক স্বাধীনতার স্থপতি; অন্যজন সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহের কণ্ঠস্বর। তবে তাঁদের মিল হল—মানুষের উপর আরোপিত যেকোনো দাসত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান। এই গবেষণাপত্রের মূল ফলাফল হলো—দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে থাকা সত্ত্বেও রাসেল ও নজরুল একই মানসিক ভূমিতে এসে দাঁড়ান, যেখানে মানবিক ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও যুক্তি একই সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গ্রন্থপঞ্জি (References) : ১. Bertrand Russell, Sceptical Essays. ২. Ahmad Sofa (Trans.), স্বপ্ন ও বাস্তব. ৩. Kazi Nazrul Islam, সঞ্চিতা, অগ্নিবীণা, দোলনচাঁপা. ৪. Secondary criticism on Russell and Nazrul from contemporary philosophical and literary studies.
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান।
আপনার মতামত লিখুন :