বৃষ্টিস্নাত তারুণ্য: মাতামুহুরীর তীরে আত্মকথন


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ৩, ২০২৫, ২:৪৪ পূর্বাহ্ন /
বৃষ্টিস্নাত তারুণ্য: মাতামুহুরীর তীরে আত্মকথন

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


মাতামুহুরীর তীরে বৃষ্টি নামে। প্রকৃতি তখন বিষণ্ণ। তবুও স্নিগ্ধ। মনে হয় আকাশ কাঁদছে নীরবে। সেই অশ্রুজলে ভেজে তারুণ্যের প্রথম প্রেম। ভেজা বাতাস বয়ে আনে সেই স্পর্শের স্মৃতি। হৃদয়ে জাগে মিষ্টি শিহরণ। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা মেঘের স্বচ্ছতা নিয়ে নামে। সেই স্বচ্ছতা মনের গভীরে নতুন আলো ফেলে।

মনে পড়ে ছোটবেলার দিন। বৃষ্টিতে ভিজে মাতামুহুরীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম নাচন। নদীর বুকে প্রতিটি বিন্দুর পতন ছিল অলৌকিক। নিস্তরঙ্গতা মুহূর্তে কল্লোলিত হত। সেই বিস্ময় ভাষায় প্রকাশের অতীত। ছিল এক নীরব মুগ্ধতা। যৌবনের প্রথম ছোঁয়াও হৃদয়ে আনে অব্যক্ত চাঞ্চল্য। বাজে এক নতুন সুরের মূর্ছনা।

নদীপাড়ের ধানক্ষেতে নামে বৃষ্টি। সবুজ ধানের শীষ নুয়ে পড়ে। যেন প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে। আবার পরক্ষণেই মাথা তোলে। বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে চায়। এই দৃশ্য তারুণ্যের দ্বিধা ও সাহসের প্রতীক। ভেজা ডানায় ওড়ে ফড়িং। শালিক ঝাপটায় জল। করে উড়াল। যেন নবীন প্রাণের অবাধ চাঞ্চল্য।

আমার জন্ম এই মাতামুহুরীর পাড়ে। শৈশবে নদী ছিল কাছের সঙ্গী। যৌবনে বৃষ্টি যেন তেমনই আপন। নদীর আশ্রয়ের বিপরীতে, বৃষ্টির স্পর্শে জাগে লুকানো বাসনা। বৃষ্টির মধ্যে শরীর ছেড়ে দেওয়ার আনন্দ নবযৌবনের উদ্দামতা। প্রকৃতির ঐশ্বর্যে, বৃষ্টির নীরব নির্মাণে অনুভব করি তারুণ্যের বিকাশ।

মাতামুহুরীর তীরে বর্ষণমুখর সন্ধ্যা নামে। প্রকৃতির সাথে মেশে মন। হৃদয়ে জাগে ক্ষণিকের স্বপ্নিল আবেশ। মনে হয় কুয়াশার মতো অস্পষ্ট রূপালী মূর্তি। বৃষ্টিতে ভেজা, সে রহস্যময়। সে হয়তো কোনো অপ্সরী নয়। নিছক মনের ভুল। তবুও ভেজা সন্ধ্যায় প্রকৃতির নীরবতা রঙে ছবি আঁকে। তা তারুণ্যের প্রথম উন্মাদনার মতোই ক্ষণস্থায়ী। তবুও গভীর।

বৃষ্টি দেখে কবি লেখে কবিতা। শিল্পী খুঁজে পায় রঙের জগৎ। তেমনি যৌবনের প্রথম স্পর্শে হৃদয় হয় কাব্যময়। বৃষ্টি জীবনধর্মী—তার বিনাশ নেই। শুধু রূপান্তর ঘটে। বৃষ্টির প্রতিটি স্নিগ্ধ ছোঁয়া যেন তারুণ্যের মুক্ত হাসি।

বৃষ্টি আকাশ থেকে নেমে আসে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব বাধা। তেমনই যৌবনের আবেগ ভাঙে পুরাতন নিয়ম। ধাবিত হয় নতুনত্বের পথে। হৃদয়ের কম্পনে জাগে প্রশ্ন—’আমি কে? আমার গন্তব্য কোথায়?’ এই আকুল জিজ্ঞাসা জাগায় প্রাণের গভীরে নতুন স্পন্দন। মনে পড়ে রাসুল (সা.)-এর বাণী—বৃষ্টি আল্লাহর প্রসাদ। একে স্বাগত জানাও। অভিসম্পাৎ দিও না।

বৃষ্টির মতোই যৌবন হঠাৎ আসে। আবার অপ্রত্যাশিতভাবে চলেও যায়। কিন্তু যখন থাকে, সবকিছু আলোড়িত করে তোলে। যৌবনের ক্ষণস্থায়ী তীব্র প্রভাব বৃষ্টির মতোই অপ্রত্যাশিত। সবকিছুকে দেয় নতুন করে দেখার দৃষ্টি।

বৃষ্টির জলে ভেজা রাধিকার ছবি চণ্ডীদাসের পদে ভিন্ন মাত্রা পায়। বর্ষার দিনে রাধা অভিসারে যান। অথবা মিলিত হন যমুনা তীরে। তখন তাঁর সৌন্দর্য হয় আরও মোহময়। বৃষ্টির কণা মেশে ভেজা বস্ত্রে। সৃষ্টি হয় অপার্থিব দৃশ্য। ভেজা বস্ত্র যেন দেখায় শরীরের ভাঁজ। দর্শকের মনে জাগে চাপা কামনা।

চণ্ডীদাস ভেজা রূপের বর্ণনায় মেশাতে চেয়েছেন প্রকৃতি ও মানব দেহের সৌন্দর্য। বৃষ্টির স্বচ্ছ জলের মতো রাধার সৌন্দর্য হয় আরও গভীর। ভেজা কেশ, চিকচিক করা গায়ের রঙ, সিক্ত বসন—সব মিলেমিশে তৈরি করে পবিত্র ও কামনাদীপ্ত চিত্র। বৃষ্টিস্নাত রাধিকার সৌন্দর্য কামনার এক শক্তিশালী উৎস। প্রকৃতির ভেজা স্পর্শ রাধার সৌন্দর্যকে করে তোলে আরও উদ্দীপক। কৃষ্ণের মনেও জাগে ব্যাকুলতা।

চণ্ডীদাস দেখেছিলেন বৃষ্টিস্নাত রাধিকার সৌন্দর্য। তেমনি তারুণ্যের চোখেও রমণীর প্রসাদ আনে নতুন অনুভূতি। পরিচিত রমণীরা শুধু আত্মীয়। কোনো অপরিচিতা যুবতীর প্রথম দৃষ্টি যেন দেয় আকাঙ্ক্ষিত ঐশ্বর্যের সন্ধান। প্লেটোর দ্বিখণ্ডিত সত্তার মতো তারুণ্যও খোঁজে পূর্ণতা। ধাবিত হয় অন্য সত্তার পানে।

বৃষ্টির ছোঁয়ায় জেগে ওঠে নিষ্প্রাণ প্রকৃতি। তেমনই যৌবনের স্পর্শে ফুল পায় নতুন রূপ। বাড়ির লাল গোলাপ, ক্লাবের কৃষ্ণচূড়া সেদিন মিশেছিল পশ্চিম আকাশের লালে। এনেছিল হৃদয়ের গভীরে রক্তিম আকাঙ্ক্ষার ঢেউ।

গ্রিক দেবতা অ্যাপোলো কবিতা ও ঔষধের দেবতা। তেমনই যৌবনের কামনাও যেন নিরাময়ের আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষার প্রথম প্রকাশ হয়তো কবিতার জন্ম দেয়—তারুণ্যের প্রথম গান।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: 03/06/2025 খ্রি.।