নজরুলের ‘ফুল-ফাগুনের এলো মরশুম’: বসন্তের উচ্ছল বন্দনা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ১০, ২০২৫, ১১:২১ পূর্বাহ্ন /
নজরুলের ‘ফুল-ফাগুনের এলো মরশুম’: বসন্তের উচ্ছল বন্দনা

মমতাজ উদ্দিন আহমদ

কাজী নজরুল ইসলাম, বাংলা সাহিত্যের এক বর্ণিল প্রতিভার অধিকারী। তিনি প্রকৃতির প্রতিটি ছন্দে প্রাণের সুর খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর গানগুলো তাই প্রকৃতির চিরন্তন রূপকে জীবন্ত করে তোলে। “ফুল-ফাগুনের এলো মরশুম বনে বনে লাগল দোল্” তেমনই এক অনবদ্য সৃষ্টি। এটি বসন্তের আগমনী উচ্ছ্বাসকে চিত্রিত করে। এই গানে ফাগুনের রঙ, রূপ ও মাটির সুর একাকার হয়ে যায়। এটি প্রকৃতির সাজ আর মানব হৃদয়ের আনন্দের এক নিবিড় বন্ধন ফুটিয়ে তোলে।

গানের মূলভাব ও প্রেক্ষাপট:

এই গানটি বসন্ত ঋতুর আগমনকে উদযাপন করে। ফাগুন মাসের রঙিন আর উৎসবমুখর পরিবেশ এখানে মুখ্য। কবি প্রকৃতির এক সজীব প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন। এখানে প্রতিটি উপাদানে বসন্তের আগমনী সুর বেজে উঠেছে। তিনি বসন্তের রূপ, রস, গন্ধ আর তার প্রভাবে প্রকৃতির প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার এক কাব্যিক চিত্র তুলে ধরেছেন।

পঙক্তিভিত্তিক আলোচনা ও কাব্যিক তাৎপর্য:

গানটির প্রতিটি পঙক্তিতে বসন্তের এক মুগ্ধকর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে:

  • “ফুল-ফাগুনের এলো মরশুম বনে বনে লাগল দোল্। কুসুম-সৌখিন দখিন হাওয়ার চিত্ত গীত-উতরোল॥”

বসন্তের (ফাগুন) শুভাগমন ঘটেছে। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে বনরাজি। মনে হয় যেন গাছে গাছে এক আনন্দ-দোল লেগেছে। দক্ষিণের বাতাস বইছে। সে যেন ফুলের গন্ধ ভালোবাসে। সেই হাওয়ার মনে গানের উচ্ছলতা লেগেছে। নজরুলের গানে বসন্ত আসে এক নতুন জাগরণের বার্তা নিয়ে। যেমন তিনি ‘বসন্ত মুখর আজি গীতমুখর চারিদিক’ গানে বসন্ত বন্দনা তুলে ধরেছেন। দখিনা হাওয়ার এই প্রাণবন্ত ছন্দ তাঁরই ‘দখিন হাওয়া জাগো জাগো’ গানটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর ‘বসন্ত’ কবিতায়ও ধরা পড়েছে এই নতুন প্রাণের উন্মাদনা: ‘নবীন সেজেছে ধরা, নবীন প্রাণ আজ জাগে’।

  • “অতনুর ঐ বিষ-মাখা শর নয় ও-দোয়েল শ্যামার শিস্, ফোটা ফুলে উঠ্ল ভ’রে কিশোরী বনের নিচোল॥”

বসন্তের এই মাদকতা কামদেবের বিষ মাখা শর নয়। এটি দোয়েল ও শ্যামা পাখির মিষ্টি শিস। বসন্তের আগমনে বন যেন এক নবীন কিশোরী। তার আঁচল ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। প্রকৃতি এখানে যেন লাজে রাঙা, এক মুগ্ধ রূপসী।

  • “গুল্বাহারের উ্তরী কার জড়াল তরু-লতায়, মুহু মুহু ডাকে কুহু তন্দ্রা-অলস, দ্বার খোল্।”

যেন কোনো সুন্দরী রমণীর (গুলবাহার) ওড়না জড়িয়েছে তরুলতার সাথে। কোকিল মুহুর্মুহু কুহু স্বরে ডাকছে। এই ডাক যেন ঘুম জড়ানো এক আহ্বান। সে অলসভাবে দ্বার খুলতে বলছে। এটি বসন্তের আলস্য ও মুগ্ধতার এক নিবিড় চিত্র। নজরুলের কোকিল যেন এক প্রেমিক বাউল, যেমন তাঁর অন্য গানে সে ডাকে ‘কোকিল কেন ডাকে রে’ বলে।

  • “রাঙা ফুলে ফুল্ল-আনন দোলে কানন-সুন্দরী, বসন্ত তার এসেছে আজ বরষ পরে পথ-বিভোল্॥”

কাননের সুন্দরী (প্রকৃতি) যেন রাঙা ফুলে তার মুখ পূর্ণ করেছে। সে দোলে বসন্তের ছন্দে। এক বছর পর বসন্ত তার কাছে ফিরে এসেছে। যেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পথ হারিয়েছে সে। প্রকৃতির এই ফিরে আসা এক চিরন্তন সৌন্দর্য। নজরুলের কলমে প্রকৃতি প্রাণ পায়, যেমন ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচে গো আজ বনানী’ পঙক্তিতে তিনি বনানীকে নর্তকীর রূপে এঁকেছেন। তাঁর ‘বন-কুন্তলা ফুল-বসন! এ বন-সুন্দরী কে রে?’ পঙক্তিটিও যেন এই ‘কানন-সুন্দরী’রই এক মূর্ত ছবি।

কাব্যিক ও শৈল্পিক তাৎপর্য:

এই গানটি নজরুলের প্রকৃতি প্রেমের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি বসন্তের সৌন্দর্যকে মানুষের আবেগ আর অনুভূতির সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। গানে রূপক এবং উপমার ব্যবহার এটিকে আরও গভীরতা দিয়েছে। বসন্তের প্রাকৃতিক দৃশ্যের পাশাপাশি এর ভেতরের উৎসবমুখর আর আবেগময় দিকটিও এখানে ধরা পড়েছে। নজরুলের শব্দচয়ন আর সুরের বুনন এই গানটিকে একটি জীবন্ত বসন্ত চিত্রের রূপ দিয়েছে।

রচনাকাল, প্রকাশনা ও পর্যায় তথ্য:

গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায় না। তবে ১৯৩২ সালের মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৩৮) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় কবির বয়স ছিল ৩২ বছর ৯ মাস। গানটি ‘সুর-সাকী’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়, যার প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল আষাঢ় ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে (জুলাই ১৯৩২)। এটি ‘নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড’ (বাংলা একাডেমী, ঢাকা, জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮/মে ২০১১) এর ৯ নম্বর গান হিসেবে স্থান পেয়েছে। উল্লেখ্য, এইচ.এম.ভি থেকে প্রকাশিত রেকর্ডটি পরবর্তীতে বাতিল করা হয়েছিল।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ১০ জুন ২০২৫ খ্রি.