
মমতাজ উদ্দিন আহমদ
কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি একাধারে বিদ্রোহ ও প্রেমের কবি, তাঁর সাহিত্যকর্মে ধর্মীয় ভক্তির এক গভীর ও সমন্বয়ী সুরও বেজে উঠেছে। তিনি কেবল মুসলিম ভক্তিমূলক গানই লেখেননি, হিন্দু দেব-দেবী নিয়েও রচনা করেছেন অজস্র ভক্তিগীতি। “মহাবিদ্যা আদ্যাশক্তি পরমেশ্বরী কালিকা” তেমনই এক অসাধারণ সৃষ্টি। এই গানে নজরুল হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, বিশেষত বেদ, গীতা ও উপনিষদের দার্শনিক গভীরতাকে নিজের কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এ গানটি দেবীর সর্বময় ক্ষমতা, তাঁর সৃষ্টি ও সংহারের লীলা এবং ভক্তের প্রতি তাঁর করুণাকে চমৎকারভাবে চিত্রিত করে।
নজরুলের ধর্মানুরাগ: সমন্বয়ের সাধক
নজরুলের ধর্মানুরাগ ছিল অনন্য। তিনি কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী ও সমন্বয়ের সাধক। জন্মসূত্রে মুসলিম হলেও, তিনি হিন্দু দেব-দেবী যেমন কালী, দুর্গা, শিব, কৃষ্ণ, সরস্বতীকে নিয়ে শত শত গান রচনা করেছেন। তাঁর কাছে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, কেবল রূপ ভিন্ন। তিনি শক্তিকে দেখেছেন এক সর্বময়ী সত্তা হিসেবে। এই গানের মতো শ্যামাসঙ্গীতগুলোতে তাঁর হিন্দু ধর্মের গভীর জ্ঞান ও আন্তরিক ভক্তি পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সকল ধর্মই একই পরম সত্তার দিকে ধাবিত হয়।
গানের মূলভাব ও প্রেক্ষাপট:
এই গানটি মূলত দেবী কালিকার স্তুতি ও বন্দনা। এখানে কালীকে পরমেশ্বরী, আদ্যাশক্তি, এবং মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গানের প্রতিটি স্তবক দেবীর বিভিন্ন গুণের কথা বলে। এটি দেবীর মহাকালী, মহাসরস্বতী, মহালক্ষ্মী, বেদমাতা, গায়ত্রী, ষোড়শী কুমারী বালিকা ইত্যাদি রূপের মহিমা বর্ণনা করে। গানটি দেবীর সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের ক্ষমতাকে তুলে ধরে। এটি ভক্তি ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দেবীর কাছে অশুভ নাশের প্রার্থনা জানায়।
পঙক্তিভিত্তিক আলোচনা: শাস্ত্রীয় ও সামাজিক আলোকে দেবীর মহিমা
গানটির প্রতিটি পঙক্তি দেবীর মহিমা ও তাঁর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা করে, যা সনাতন ধর্মগ্রন্থের দর্শনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ:
এই পঙক্তিগুলো দেবী কালিকার সর্বজনীন ও আদিম রূপকে তুলে ধরে। তিনি মহাজ্ঞানের উৎস মহাবিদ্যা। তিনিই সকল শক্তির আদি কারণ আদ্যাশক্তি। তিনি পরমেশ্বরী এবং কালিকা, অর্থাৎ যিনি কাল বা সময়কেও নিয়ন্ত্রণ করেন। দেবী মাহাত্ম্যম-এ দেবীকে ‘শক্তি’ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে: “যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা। নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।” (দেবী মাহাত্ম্যম, অধ্যায় ৫)। অর্থাৎ, যে দেবী সর্বভূতে শক্তি রূপে বিরাজিতা, তাঁকে প্রণাম। এটি দেবীর ‘আদ্যাশক্তি’ রূপকে দৃঢ় করে। কবি তাঁকে পরমা প্রকৃতি, অর্থাৎ জগতের মূল কারণ বলেছেন। তিনি জগন্মাতা এবং ভবানী, যিনি ত্রিভুবনের পালিকা। ভগবদ্গীতাও পরম সত্তার অধীনে প্রকৃতির ভূমিকা তুলে ধরে: “ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্।” (গীতা ৯.১০)। অর্থাৎ, আমার তত্ত্বাবধানে প্রকৃতি স্থাবর ও জঙ্গম সবকিছু সৃষ্টি করে। এটি দেবীর ‘পরমা প্রকৃতি’ রূপের মহাত্ম্য বর্ণনা করে।
এখানে দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রকাশকে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ধ্বংসের দেবী মহাকালী। তিনি জ্ঞানের দেবী মহাসরস্বতী। আবার তিনিই ধনসম্পদের দেবী মহালক্ষ্মী। এসব রূপের সম্মিলিত প্রকাশ তিনি, তাই তিনি ভগবতী। দেবী মাহাত্ম্যম-এ দেবীর এই তিন রূপের বর্ণনা আছে। যেমন, সরস্বতী রূপে: “যা দেবী সর্বভূতেষু বিদ্যারূপেণ সংস্থিতা।” (দেবী মাহাত্ম্যম, অধ্যায় ৫)। তিনি বেদমাতা, অর্থাৎ বেদের উৎস। তিনি গায়ত্রী, যা হিন্দুদের একটি পবিত্র মন্ত্র। ঋগ্বেদের গায়ত্রী মন্ত্রই জ্ঞানের উৎস রূপে বিবেচিত হয়। একইসাথে তিনি ষোড়শী কুমারী বালিকা রূপে প্রকাশিত হন, যা তাঁর চিরযৌবনা ও ষোড়শ গুণের প্রতীক।
এই পঙক্তিগুলো দেবীর ‘মহামায়া’র ক্ষমতাকে বর্ণনা করে। তাঁর মায়াতেই কোটি কোটি ব্রহ্মা (সৃষ্টিকর্তা), বিষ্ণু (পালনকর্তা) এবং রুদ্র (সংহারকর্তা) সৃষ্টি হন। এবং সমুদ্রের জলবিন্দুর মতো বিলীন হয়ে যান। দেবী মাহাত্ম্যম-এ বলা হয়েছে: “সা বিদ্যা পরমা মুক্তিহেতুভূতা সনাতনী। সংসারবন্ধহেতুশ্চ সৈব সর্বেশ্বরেশ্বরী।।” (দেবী মাহাত্ম্যম, অধ্যায় ১)। অর্থাৎ, তিনি সেই পরা বিদ্যা, যিনি মোক্ষের কারণ। তিনিই সংসার বন্ধনের হেতু, এবং তিনি সকল ঈশ্বরের ঈশ্বরী। ভগবদ্গীতাও মায়াকে দুর্লঙ্ঘনীয় বলেছে: “দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।” (গীতা ৭.১৪)। অর্থাৎ, এই আমার ত্রিগুণময়ী দৈবী মায়া দুর্ভেয়। এই সবকিছু দেবীর ‘মহামায়া’ রূপকে প্রতিষ্ঠিত করে।
দেবী এখানে অচিন্ত্য, অর্থাৎ ধারণার অতীত। তিনি পরমাত্মারূপিণী। তিনিই দেবতা, মানুষ এবং সমগ্র চরাচরের জননী। উপনিষদে পরমাত্মাকে অদ্বিতীয় সত্তা বলা হয়েছে, যেমন ছান্দোগ্য উপনিষদে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’। দেবী মাহাত্ম্যম-এও দেবীকে মাতৃরূপে বর্ণনা করা হয়েছে: “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।” (দেবী মাহাত্ম্যম, অধ্যায় ৫)। অর্থাৎ, যে দেবী সর্বভূতে মাতৃরূপে বিরাজিতা, তাঁকে প্রণাম। কবি তাঁকে প্রণাম জানিয়ে বলছেন, তিনি শুভকারী, অশুভনাশিনী। তিনি তারা রূপেও মঙ্গল করেন। তিনি মঙ্গল চণ্ডিকা, যিনি কল্যাণ করেন এবং অশুভকে দূর করেন। পুনরাবৃত্তি করে তিনি দেবীর ‘অশুভ নাশিনী’ ও ‘মঙ্গল সাধিকা’ রূপকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করেছেন।
ধর্মীয়, সামাজিক ও শৈল্পিক তাৎপর্য:
এই গানটি নজরুলের শাক্ত ভক্তিগীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি একদিকে যেমন দেবীর সর্বময় ক্ষমতার কথা বলে, তেমনি ভক্তের আশ্রয় ও ভরসার স্থান হিসেবে তাঁর ভূমিকাও নির্দেশ করে। গানটিতে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার এবং ধ্রুপদাঙ্গ সুরের প্রয়োগ এটিকে এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ দিয়েছে।
‘সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ মন্ত্রটি মনে করিয়ে দেয় যে, দেবী সকল জীবের মধ্যেই মাতৃরূপে বিরাজিতা। তাই প্রকৃত দেবীর আরাধনা নিহিত আছে সমাজের বঞ্চিত, লাঞ্ছিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে। কোনো উৎসবের আলো থেকে সমাজের গরীব-অসহায়রা বঞ্চিত হয়, তখন তাদের প্রতি সহানুভূতি ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করাই হবে দেবীর ‘অশুভ নাশিনী’ ও ‘মঙ্গল সাধিকা’ রূপের প্রকৃত প্রতিফলন। নজরুলের এই ভক্তিগীতি প্রমাণ করে, তাঁর কাছে ধর্ম ছিল ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে এক মানবতাবাদী ও আধ্যাত্মিক যাত্রা, যা সামাজিক চেতনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
রচনাকাল, প্রকাশনা ও পর্যায় তথ্য:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। তবে ১৯৩৭ সালের মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বছর ১১ মাস। গানটি ‘দেবীস্তুতি’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়, যা ‘নজরুল রচনাবলী জন্মশধবর্ষ সংস্করণ, অষ্টম খণ্ড’ (বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১২ ভাদ্র ১৩১৫/২৭শে আগস্ট ২০০৮) এ প্রকাশিত হয়। ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮ (রবিবার, ২ মাঘ ১৩৪৪) তারিখে এটি ‘আমাদের কথা’ বিভাগে স্থান পায়।
কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে গানটি প্রথম প্রচারিত হয়েছিল ২৭ জানুয়ারি ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার ১৩ মাঘ ১৩৪৪) তারিখে, শিল্পী ছিলেন গীতা মিত্র। এটি দ্বিতীয়বার প্রচারিত হয় ২৫ জুলাই ১৯৩৯ (মঙ্গলবার, ৯ শ্রাবণ ১৩৪৬) তারিখে। এইচএমভি থেকে মে ১৯৩৭ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪) মাসে রেকর্ড (নম্বর: এন ৯৮৯৬) আকারে এটি মৃণালকান্তি ঘোষের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়। নিতাই ঘটক তাঁর ‘সঙ্গীতাঞ্জলি’ (দ্বিতীয় খণ্ড) গ্রন্থে এবং সালাউদ্দিন আহমেদ তাঁর ‘নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি’ (অষ্টাদশ খণ্ড) গ্রন্থে এর স্বরলিপি সংকলন করেছেন। এটি হিন্দু ভক্তি [শাক্ত] বিষয়ক ধর্মসঙ্গীত পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। গানটি ধ্রুপদাঙ্গ সুরে, ভৈরবী রাগে এবং তেওরা তালে নিবদ্ধ।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ১০ জুন ২০২৫ খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :