
বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা সাংবাদিকতা ও ইতিহাস গবেষণার এক নিভৃতচারী সূর্যকে দেখেছিল। সেই সূর্যের নাম ছিল মুজিবুল হক চৌধুরী। ২০০০ সালের ২২ আগস্টের সেই কৃষ্ণরাতে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় যখন তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে যায়, তখন চকরিয়ার মাটি শুধু একজন সাংবাদিককে হারায়নি, হারিয়েছিল তার শেকড় সন্ধানী এক নির্ভীক পথপ্রদর্শককে। তাঁর প্রয়াণে যেন অসময়েই ঝরে গিয়েছিল একটি সুশোভিত ফুল, যে ফুল আর কখনও ফুটবে না। কবি ওমর খৈয়ামের সেই অমর পঙক্তিমালা যেন তাঁর জীবনাবসানেরই প্রতিধ্বনি:
‘সব বুলি মিছে সবার মাঝে
একটি বচন সত্য যার,
যে ফুল গিয়াছে নিশায় ঝরিয়া
সে ফুল নাহি ফুটিবে আর।’
চকরিয়ার সাংবাদিকতা ও ইতিহাস গবেষণার প্রয়োজন ফুরাবার আগেই তিনি চলে গেলেন, রেখে গেলেন তাঁর গভীর চিন্তার কিছু স্মৃতি, কিছু কথা। শোকের এক নিদারুণ ঢেউয়ে ভাসিয়ে গেলেন তাঁর প্রিয়জন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের। আমার মতো একজন তরুণ সংবাদকর্মীর স্মৃতিতে তাঁর যেটুকু প্রতিচ্ছবি আঁকা, এটি সেই মহান ব্যক্তিত্বের একটি ক্ষুদ্র মূল্যায়ন।
সাংবাদিকতা ও গবেষণায় অবিস্মরণীয় অবদান:
সাংবাদিক মুজিবুল হক চৌধুরীর মাঝে লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ প্রতিভা। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা এবং চিন্তার উৎকর্ষতা ছিল পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। তাঁর এ শূন্যতা পূরণ হবার নয়। তিনি প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর জীবনলোকে বেঁচেছিলেন, তার মধ্যে আমার দেখা কর্মজীবন ছিল নিতান্তই অল্প সময়ের। সে সময়ে আমি ছিলাম একজন তরুণ সংবাদকর্মী। তবুও তাঁর চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার যেটুকু শুনেছি, তা আমার হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। তিনি ছিলেন চকরিয়ার ইতিহাস অনুসন্ধান ও সাংবাদিকতার শেকড় সন্ধানের বলিষ্ঠ প্রত্যয়। আমি তাঁকে স্মরণ করি সেই অগ্রসেনানী হিসেবে, যিনি তাঁর কলমের চূড়ান্ত অভিযাত্রার উদ্বেল মিছিলে সবার আগে ছিলেন।
১৯৬৪-৭৯ সালে চকরিয়ার কাকারা জুনিয়র হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক রশিদ আহমদ সম্পাদিত দেয়ালিকা ‘খবরা-খবর’ এ ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতার হাতেখড়ি হয়। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক আজাদী, দৈনিক দেশের কথা, সাপ্তাহিক চকোরী এবং পাক্ষিক মেহেদীতে বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লেখনীতে প্রতিফলিত হতো গভীর জ্ঞান, স্বচ্ছ দৃষ্টি, উন্নত চিন্তা এবং বিষয়বস্তু উপস্থাপনের অতুলনীয় কৌশল। চকরিয়ার ইতিহাস রচনা এবং মাটি ও মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য উদ্ধারে তাঁর অবদান ছিল অগ্রণী। তিনি দেশমাতৃকার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং স্থানীয় ইতিহাস গবেষণায় তাঁর অনুসন্ধিৎসু তীক্ষ্ণ ধীশক্তি ছিল অসাধারণ।
ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ:
মুজিবুল হক চৌধুরী ছিলেন উপমাতুল্য এক পুরুষ। তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক কলমযোদ্ধা, যিনি অবহেলিত জনগণের পক্ষে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। প্রবল পরাক্রান্ত নিপীড়কের রক্তচক্ষু কোনোদিনই এই যোদ্ধাকে ক্লান্ত বা দুর্বল চিত্ত করতে পারেনি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অনেকের মতের অমিল ছিল, যা হয়তো ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় সংকীর্ণতা থেকে উদ্ভূত। কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন উপমাতুল্য এক পুরুষ। তিনি ছিলেন গভীর অনুসন্ধিৎসু ও ধর্মানুরাগী। ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। তিনি ছিলেন যাবতীয় শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রচন্ড প্রতিবাদী। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল সত্যের জয়ধ্বনী। তিনি সেইসব তথাকথিত সাংবাদিকদের ঘৃণা করতেন, যারা বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে উটপাখি সেজে থাকে। সাংবাদিকতার আদর্শ ও সাহসিকতায় তিনি ছিলেন সত্যিই অনুকরণীয়। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়ও তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য; মৃত্যুর কিছুদিন আগে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় দেশস্বার্থ বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দেশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
জীবনের সংগ্রাম ও নিরহংকার প্রয়াণ:
সাংবাদিক মুজিবুল হক চৌধুরীর জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। নানা অপশক্তি ও বাধার মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছেন চরম সাহসিকতায়। তাঁর মাঝে ছিল সত্য প্রকাশের দুর্বার সাহস, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা। নীতি প্রশ্নে তিনি ছিলেন অটল ও অনড়। ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অবৈধ অর্থের পেছনে তিনি কখনো ছোটেননি, তাই মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন একপ্রকার কপর্দকহীন। তাঁর মাঝে ছিল সংগ্রামশীল চেতনা, ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা ও অহমিকা তাঁকে কখনো স্পর্শ করেনি। তিনি আমৃত্যু দেশস্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কলম চালিয়ে গেছেন। তাঁর জীবন পরিচালনায় আত্মকেন্দ্রিকতা ছিল না। অনেকে তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও তিনি আন্তরিকতার সাথে সবার সাথে মিশেছেন।
অমরত্ব ও উত্তরাধিকার:
মৃত্যু জীবনের এক দ্বান্দ্বিক সত্য হলেও, সাংবাদিক মুজিবুল হক চৌধুরী মরেও অমর হয়ে থাকবেন। চকরিয়ার ইতিহাসের অন্তরালে তাঁর অবদান অক্ষয় হয়ে থাকবে। তাঁর লোকান্তরের খবর সেদিন হৃদয় ভাঙ্গা কষ্টের এক নিদারুণ প্রতিধ্বনি তুলেছিল সমস্ত সত্তাজুড়ে। তাঁর রেখে যাওয়া চকরিয়ার ইতিহাস রচনার কাজ তরুণ প্রজন্মের আরেকজন লেখক হাসান মুরাদ সিদ্দিকীর হাত ধরে শীঘ্রই পূর্ণতা পাবে, যা চকরিয়াবাসীর জন্য এক আশাব্যঞ্জক খবর।
তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য পাণ্ডুলিপিগুলো, যেমন- ‘চকরিয়ার ইতিহাস প্রসঙ্গ’, ‘ইউরোপে বুলবুলের ব্যালে ঐতিহ্য’, ‘পাছে ভুলে যাই’, ‘নৃত্য শিল্পী আফরোজা বুলবুল’ ইত্যাদি, ছিল তাঁর স্বপ্ন ও সাধনার প্রতিচ্ছবি। অকাল মৃত্যু তাঁর সব স্বপ্নকে ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছে। আমরা তাঁর এই বইগুলো প্রকাশের দাবি জানাই, যাতে তাঁর স্বপ্ন সার্থক হয়।
তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অধ্যক্ষ এ.কে.এম গিয়াস উদ্দিনের আক্ষেপী কণ্ঠের সেই কথাগুলো আজও হৃদয় বিদীর্ণ করে, “এই পৃথিবীতে যথারীতি সূর্য উঠবে। পাখির কলকাকলিতে, মোয়াজ্জিনের আজানে-কর্মব্যস্ত মানুষ জাগবে। পড়ন্ত বিকেলে সব পাখি নীড়ে ফিরবে কিন্তু আমাদের মুজিব ভাই যে আর ফিরবে না এ কঠিন বাস্তবতা মেনে নিতে কষ্ট হবে, ভীষণ কষ্ট হবে, অনাগত অনেক দিন…” তাঁর মৃত্যু ছিল প্রিয়জন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য হৃদয় ভাঙ্গা কষ্টের এক নির্মম বাস্তবতা। কিন্তু তাঁর কর্ম ও অবদান, তাঁর আদর্শ ও সাহসিকতা চিরকাল আমাদের মাঝে অম্লান থাকবে।
লেখক: মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ১৮ আগস্ট ২০২২ খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :