সংকটের মুখে সাংবাদিকতা ও উত্তরণের পথ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ৩, ২০২৬, ৪:৪০ অপরাহ্ন /
সংকটের মুখে সাংবাদিকতা ও উত্তরণের পথ

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


রাষ্ট্র ও সমাজের ইতিহাসে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি জনবিবেকের ভাষা, সত্যের অনুসন্ধান এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু যখন এই হাতিয়ার ভোঁতা হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিই কেঁপে ওঠে। বর্তমান সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এক জটিল সংকটের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে—যেখানে পেশাদারিত্বের জায়গা দখল করছে তোষামোদ, অনুসন্ধানের জায়গায় বসছে আনুগত্য, আর নিরপেক্ষতার স্থানে জায়গা নিচ্ছে দলদাসত্ব।

সংকটের চিত্র: সংবাদ নাকি অবস্থান?

সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদ নির্বাচন, উপস্থাপন ও বিশ্লেষণে স্পষ্ট পক্ষপাত লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদ আর সংবাদ থাকে না; তা হয়ে ওঠে ‘অবস্থান’। কোন খবর প্রকাশ পাবে, কোনটি উপেক্ষিত থাকবে—তা নির্ধারিত হয় জনস্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ বা করপোরেট প্রভাবের ভিত্তিতে। ফলে সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের পর্দা অনেক সময় জনগণের চোখ না হয়ে ক্ষমতার প্রতিধ্বনি কক্ষে পরিণত হয়।

এই প্রবণতার পেছনে কয়েকটি কারণ দৃশ্যমান—

  • রাজনৈতিক মেরুকরণ: সাংবাদিকদের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ, যা নিরপেক্ষ অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
  • অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: বিজ্ঞাপননির্ভর গণমাধ্যমে মালিকানার স্বার্থ প্রায়ই সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে সীমিত করে।
  • পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা: চাকরি হারানোর ভয় বা আইনি জটিলতার আশঙ্কা অনেককে আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য করে।
  • ডিজিটাল তাড়াহুড়া: দ্রুততম খবর দেওয়ার প্রতিযোগিতায় যাচাই–বাছাই উপেক্ষিত হয়, ফলে গুজব ও অর্ধসত্যের বিস্তার ঘটে।
  • প্রশাসনিক খবরদারি: ক্ষেত্রবিশেষে সংবাদ ও সংবাদ মাধ্যমের ওপর প্রশাসনিক খবরদারি ও চোখ রাঙানি এবং হুমকীর মুখে সাংবাদিকতাকে তটস্থ রাখা হয়।

ফলাফল—সাংবাদিকতার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, পাঠক–দর্শকের আস্থা কমে, আর গণতান্ত্রিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ে।

দলদাসত্বের মানসিকতা: নীরবতার সংস্কৃতি

তোষামোদি সাংবাদিকতা কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংস্কৃতির ফল। যখন সাংবাদিক নিজেকে ‘প্রশ্নকারী’ নয়, বরং ‘প্রচারক’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তখন সংবাদ হয়ে ওঠে প্রচারণা। সমালোচনা তখন শত্রুতা বলে বিবেচিত হয়, আর নীরবতা হয়ে ওঠে নিরাপদ আশ্রয়। এই নীরবতার সংস্কৃতি সমাজে এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা তৈরি করে—যেখানে সবাই জানে সমস্যা আছে, কিন্তু উচ্চারণের সাহস কমে যায়।

সামাজিক প্রভাব: আস্থাহীনতার বিস্তার

সাংবাদিকতার এই অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের। তথ্যের স্বচ্ছতা কমে গেলে গুজব বাড়ে, বিভাজন তীব্র হয়, আর নাগরিকেরা সিদ্ধান্ত নিতে বিভ্রান্ত হয়। গণমাধ্যম যদি সত্যের পরিবর্তে সুবিধাজনক বয়ান পরিবেশন করে, তবে সমাজে আস্থার সংকট জন্ম নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অবিশ্বাস ও নাগরিক উদাসীনতাকে বাড়িয়ে দেয়।

উত্তরণের পথ: পেশা থেকে মিশনে ফেরা

সংকট যত গভীরই হোক, উত্তরণের পথ সবসময় থাকে। সাংবাদিকতার পুনর্জাগরণ কোনো একদিনে সম্ভব নয়; এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া।

১. সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে স্বচ্ছ নীতিমালা ও মালিকানা–সম্পাদকীয় বিভাজন স্পষ্ট করতে হবে, যাতে সংবাদ নির্বাচন রাজনৈতিক বা করপোরেট প্রভাবমুক্ত থাকে।

২. পেশাগত সুরক্ষা ও প্রশিক্ষণ
সাংবাদিকদের জন্য ন্যায্য বেতন, আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই ও নৈতিকতা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

৩. নৈতিকতা ও স্বনিয়ন্ত্রণ
প্রতিটি সংবাদকর্মীর ব্যক্তিগত দায়বোধই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রাচীর। তথ্য যাচাই, সূত্রের সুরক্ষা, পক্ষপাত এড়িয়ে চলা—এসবকে ব্যক্তিগত শপথে পরিণত করতে হবে।

৪. পাঠক–দর্শকের সচেতনতা
গণমাধ্যমের জবাবদিহি কেবল ভেতর থেকে নয়, বাইরে থেকেও আসে। নাগরিকদের মিডিয়া–সাক্ষরতা বাড়ানো গেলে তারা খবরের ভেতরের পক্ষপাত চিনতে পারবে এবং মানসম্মত সাংবাদিকতার দাবি তুলতে পারবে।

৫. ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও ফ্যাক্ট–চেক সংস্কৃতি
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তথ্য যাচাই ও সংশোধনের সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে। ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং বিশ্বাসযোগ্যতার শক্তি।

উপসংহার

সাংবাদিকতা যখন তোষামোদের পথে হাঁটে, তখন সমাজ তার আয়না হারায়। কিন্তু আয়না ভেঙে গেলে যেমন নতুন আয়না তৈরি করা যায়, তেমনি সাংবাদিকতাও পুনর্গঠিত হতে পারে—দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও সাহসের মাধ্যমে। প্রয়োজন কেবল একটি সম্মিলিত প্রত্যয়—সত্যকে অস্বস্তিকর হলেও উচ্চারণ করার সাহস, আর জনস্বার্থকে সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার দৃঢ়তা।

গণমাধ্যম যদি আবার জনগণের কণ্ঠে পরিণত হতে পারে, তবে সমাজও ফিরে পাবে তার আস্থা। কারণ শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার আসল শক্তি ক্ষমতার নৈকট্যে নয়, সত্যের নিকটতায়

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: 03.02.2026