

আলীকদম প্রতিনিধি: বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও আর্থিক লেনদেনসহ একাধিক অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি। উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ সোহেল রানা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার গোলাম ফারুক ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সৌভ্রাত দাসের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত ও শুনানির পর এই প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দফাওয়ারী অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাপ্ত তথ্য ও মতামত তুলে ধরা হয়েছে।
কমিটি গঠনে অনিয়ম: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যালয়ে ২০১০ সাল থেকে নিয়মিত কমিটি গঠন না করে প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন বিভিন্ন কায়দায় এডহক কমিটি গঠন করে বিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছেন। অভিযোগকারীদের রেকর্ডপত্র ও বয়ান অনুযায়ী, ৩০/০৬/২০০৪ খ্রিঃ থেকে বিদ্যালয়টিতে কোন নিয়মিত কমিটি নেই। প্রধান শিক্ষক এডহক কমিটির সভাপতিদের ব্যবহার করে বা পাশ কাটিয়ে একক সিদ্ধান্তে বিদ্যালয়ের আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, যার ফলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসহ স্পষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রথম নির্বাচিত নিয়মিত কমিটির আবেদন বাতিল করে প্রধান শিক্ষক নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে সভাপতি করে কমিটি অনুমোদন করিয়ে আনেন। পরবর্তীতে ইউএনওকে সভাপতি করে কমিটি গঠিত হলেও প্রধান শিক্ষক সভার আয়োজন না করে নিয়মিত কমিটি গঠনে বিলম্ব ঘটান। ২০১১ সালে প্রধান শিক্ষক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মঞ্জুরুল ইসলামকে বাদ দিয়ে নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করলে মামলার সূত্রপাত হয় এবং প্রধান শিক্ষক বারবার সময় চেয়ে মামলাটিকে নিজের স্বার্থে প্রলম্বিত করছেন বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে।
মামলা পরিচালনায় বিদ্যালয়ের অর্থ খরচ: তদন্তে দেখা গেছে, প্রধান শিক্ষক কমিটি সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত একক সিদ্ধান্তে ৫ লাখ ৮২ হাজার ৪৯০ টাকা খরচ করেছেন, যার কোনো অনুমোদিত ভাউচার তিনি দেখাতে পারেননি। এমনকি চলমান কমিটির কোনো সুস্পষ্ট অনুমতিও তিনি দেখাতে পারেননি এবং সভাপতির স্বাক্ষর নকল করে খরচের নোটশীট তৈরি করেছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি মনে করেন, অপ্রয়োজনীয় খাতে বিদ্যালয়ের অর্থ খরচ করা অর্থ তছরূপ বা আত্মসাতের শামিল।
এডহক কমিটির সভাপতির সরলতার সুযোগ: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এডহক কমিটির মেয়াদ ছয় মাস হলেও বিদ্যালয়ে ২০১০ সালের পর থেকে বারবার এডহক কমিটি গঠিত হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত কমিটি গঠনের নির্দেশনা থাকলেও প্রধান শিক্ষক অজ্ঞাত কারণে তা না মেনে বারবার এডহক কমিটি গঠন করে বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। এমনকি ২০২৩ সালে এডহক কমিটি সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের চিঠিতে ঘষামাজা করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে কমিটির সভাপতিকে অন্ধকারে রেখে কমিটির মেয়াদ বাড়িয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ভাউচার সংরক্ষণ না করা: ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ের বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অধিকাংশ ভাউচার পাওয়া যায়নি এবং যেগুলো পাওয়া গেছে সেগুলোর যথাযথ অনুমোদন নেই। প্রধান শিক্ষক নিয়ম বহির্ভূতভাবে এডহক কমিটি গঠন করে সভাপতির সরলতার সুযোগ নিয়ে আর্থিক অনিয়ম করেছেন বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। এমনকি খরচ অনুমোদন সংক্রান্ত নোটশীটে সভাপতির স্বাক্ষর জালিয়াতির প্রমাণও পাওয়া গেছে।
শিক্ষকের seniority নির্ধারণে অনিয়ম: বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হোসাইনুল ফারুক ও নুরুল আবছার একই তারিখে এমপিওভুক্ত হলেও এবং প্রথম এমপিও কপিতে হোসাইনুল ফারুকের নাম বয়সের ভিত্তিতে আগে থাকলেও, প্রধান শিক্ষক নুরুল আবছারের বি.এড ডিগ্রীর অজুহাতে তাকে হাজিরা খাতায় আগে রেখেছেন। তদন্ত কমিটি এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী হোসাইনুল ফারুককেই সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে মনে করেন।
সার্বিক মতামত: তদন্ত কমিটি তাদের সার্বিক মতামতে উল্লেখ করেছেন যে, বিদ্যালয়ে কোনো নিয়মিত কমিটি না থাকায় এবং প্রধান শিক্ষকের একক সিদ্ধান্তে আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় বিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কোনো অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি না থাকা এবং নিয়মিত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন না করার বিষয়টিকেও তদন্ত কমিটি নেতিবাচকভাবে দেখেছেন। এছাড়াও, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী হোসাইনুল ফারুককেই সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির এই বিস্তারিত প্রতিবেদন চৈক্ষ্যং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের চিত্র স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছেন ২০২৪ সালের ২৯ মে। প্রায় একবছর হতে চললেও তদন্ত প্রতিবেদনটি এখনো ফাইলে বন্দি। তিনি বলেন, এখন দেখার বিষয় উপজেলা প্রশাসন এই প্রতিবেদনের আলোকে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণ দ্রুত এই সমস্যার সমাধান ও একটি নিয়মিত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রত্যাশা করছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন বলেন, আমি বিষয়টি জানার পর অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে শোকজ করেছি। প্রধান শিক্ষকের জবাব সন্তোষজনক না হলে বিধি মোতাবেক সাময়িক সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :