আলীর সুড়ঙ্গ: না-দেখা জগতের হাতছানি


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ১৫, ২০২৫, ৫:৫৪ অপরাহ্ন /
আলীর সুড়ঙ্গ: না-দেখা জগতের হাতছানি

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

২০০৫ সালে প্রথম যখন এই কাহিনির সন্ধান পেলাম, তখন থেকেই এক অস্পষ্ট জগৎ আমার কল্পনায় ভিড় করে আসে। মনে হয়, যেন কোনো স্বপ্নলোকে উঁকি দিচ্ছি, যেখানে আলো আর আঁধারের খেলা চলে। কান পাতলে আজও যেন সেই সময়ের চাপা গুঞ্জন শুনতে পাই। তবে আলীর পাহাড়ের গোধূলিবেলার ঝিঁঝি পোকার ডাক সেদিনের কথোপকথন স্পষ্ট হতে দেয় না।

আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর আগের এক বিষণ্ণ বিকেলে সেই ঘটনা আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ভয় মেশানো এক কল্পনার রাজ্যে ডুব দেই, যেখানে তৈনখাল পাড়ের গোধূলিতে এক রহস্যময় সভা বসেছিল। কাঠুরিয়া আর সেই অদ্ভুত ঝটাধারী লোকটি… সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না।

মনে হয়, সন্ধ্যাছায়াচ্ছন্ন খাল পাড়ের বনভূমি যেন একসঙ্গে ফিসফিস করে সেদিনকার কথা শোনার জন্য জেগে উঠেছে। তৈনখাল আর আলীর পাহাড়ের পশু-পাখিরাও যেন কান পেতেছে সেই অশরীরী কাহিনি শোনার জন্য।

স্বপ্ন নাকি বাস্তব, কে জানে! তবে সেই তিন শতাব্দীর পুরোনো তৈনখাল পাড়ের কুটির থেকে যেন এক অদৃশ্য মরীচিকা আমার দিকে ধেয়ে এসেছিল, পলকের মধ্যে আবার মিলিয়েও গেল। এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক রূপসী নারী। আমার কল্পনার আকাশে তার দেহহীন দ্রুত পদচারণা আর শব্দহীন অট্টহাসি অনুভব করতে পারি! এমনকি তৈনখালের জল পেরিয়ে তার ভেজা অঞ্চল থেকে জল ঝরার ছায়া পর্যন্ত দেখতে পাই!

হঠাৎ এক শীতল ভয়ে আমার ধ্যান ভেঙে যায়—এই বুঝি নির্জনতার সুযোগ নিয়ে সেই রূপসীর ছায়ামূর্তি আমার কাঁধে ভর করলো! সেদিনকার সেই ঘটনার অস্পষ্ট কল্পচিত্র—

সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের কথা। তৈনখাল তীরবর্তী আলীর পাহাড়ের গভীর অরণ্যে কাঠ কাটতে যাওয়া একদল কাঠুরিয়ার জীবনে নেমে আসে এক বিভীষিকাময় রাত। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন তারা তৈনখাল পাড়ের ঝুপড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিল, তখনই ঘন জঙ্গলের আড়াল থেকে আবির্ভূত হন এক অদ্ভুত আগন্তুক। লম্বা চুল, দাড়ি, গোঁফে ঢাকা তার মুখ, দেখলে মনে হয় যেন কোনো প্রাচীন প্রেতাত্মা।

কাঠুরিয়ারা প্রথমে ভয় পেলেও, আগন্তুকের করুণ চাহনি দেখে তাদের মনে দয়ার উদ্রেক হলো। সে জানালো, সে কোনো জ্বিন বা ভূত নয়, বরং এক অভিশপ্ত আত্মা, যে মুক্তি চায়।

এরপর আগন্তুক যে কাহিনি শোনালো, তা হাড় হিম করা। বহুবছর আগে, সেও ছিল তাদের মতোই এক কাঠুরিয়া। একদিন বাঁশ কাটার সময় সে দলছুট হয়ে যায় এবং এক মায়াবী নারীর খপ্পরে পড়ে। সেই নারী কোনো রক্তমাংসের মানুষ ছিল না, ছিল এক বনদেবী, অথবা হয়তো কোনো পিশাচী। তার রূপে মুগ্ধ হয়ে কাঠুরিয়া নিজের জগৎ সংসার ভুলে যায়।

সেই রূপসী তাকে টেনে নিয়ে যায় আলীর সুড়ঙ্গের গভীরে। তৃতীয় সুড়ঙ্গটি ছিল তাদের বন্দীশালা। দিনের আলো সেখানে পৌঁছাতো না, কেবল নিকষ কালো অন্ধকার আর হিমশীতল বাতাস বইতো। রূপসী দিনের বেলা কোথায় অদৃশ্য হয়ে যেত, তা কেউ জানে না, কিন্তু রাতে ফিরে এসে তার মায়াজাল বিস্তার করতো।

কাঠুরিয়া বুঝতে পারছিল, সে এক অলৌকিক শক্তির বাঁধনে বাঁধা পড়েছে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সে সেই মায়াবীর পাশে বন্দি জীবন কাটাতে লাগলো। একসময় সেই পিশাচীর গর্ভে তার সন্তান জন্ম নেয়।

একদিন, যখন পিশাচী শিকারে বেরিয়েছিল, তখন সুড়ঙ্গের মুখে পাথর চাপা দিতে ভুলে যায়। এটাই ছিল কাঠুরিয়ার মুক্তির সুযোগ। সে ভয়ে ভয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে আসে এবং দৌড়াতে শুরু করে।

কিন্তু মুক্তি তার কপালে সইলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই পিশাচী, কোলে তার সন্তানকে নিয়ে সেখানে আবির্ভূত হয়। তার চোখে ছিল নরকের আগুন। কাঠুরিয়ারা ভয়ে পাথর হয়ে গেল। পিশাচী তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে কাঠুরিয়াকে বিদ্ধ করলো, তারপর এক বীভৎস কাণ্ড ঘটালো। দুর্বোধ্য ভাষায় বিড়বিড় করে সে তার সন্তানকে কোলে নিল, তারপর নিমেষে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলল। এক অংশ ছুঁড়ে মারলো কাঠুরিয়ার দিকে, আর অন্য অংশ নিজে মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে গহীন অরণ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সেই থেকে, কথিত আছে, আলীর পাহাড় আর সুড়ঙ্গে আজও সেই পিশাচীর অশরীরী কান্না শোনা যায়। গভীর রাতে যারা ওই পথে যায়, তারা নাকি আজও সেই মায়াবীর রূপ দেখতে পায়, আর শুনতে পায় তার করুণ আর্তনাদ। সেই কাঠুরিয়ার অভিশপ্ত আত্মাও নাকি আজও মুক্তি খুঁজে ফেরে আলীর পাহাড়ের আনাচে কানাচে!

লেখক: সভাপতি, আলীকদম  প্রেসক্লাব।