রেজাউল করিমের ‘কেঁপে ওঠে জেগে ওঠা চর’: দ্রোহ, স্মৃতি ও আত্মশুদ্ধির জবানবন্দি


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ২৮, ২০২৬, ৩:১৪ পূর্বাহ্ন /
রেজাউল করিমের ‘কেঁপে ওঠে জেগে ওঠা চর’: দ্রোহ, স্মৃতি ও আত্মশুদ্ধির জবানবন্দি

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক পরিসরে এমন কিছু কণ্ঠ শোনা যায়, যারা উচ্চকিত ভাষার ঝংকারে নয়, বরং নীরবতার গভীরতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। রেজাউল করিম-এর কাব্যগ্রন্থ কেঁপে ওঠে জেগে ওঠা চর” সেই নীরব অথচ তীব্র উচ্চারণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে কবিতা কোনো অলংকার নয়; বরং এটি সময়, সমাজ ও মানুষের অন্তর্গত আর্তনাদের এক নান্দনিক ভাষ্য।

অধ্যাপক রেজাউল করিমের কাব্যজগৎ মূলত তিনটি প্রবল স্রোতে প্রবাহিত―প্রকৃতি, মানুষ ও সময়ের অন্তর্গত বেদনা। এই ত্রিবেণী স্রোতের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর কবিতাগুলো। একবিংশ শতাব্দীর অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তাঁর কাব্যে ধ্বনিত হয় এক সংবেদনশীল আত্মার গভীর ক্যাথারসিস―আত্মশুদ্ধির এক শিল্পিত দলিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি সমকালীন বাংলা কবিতার মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র স্বর হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার দাবি রাখে।

এই কাব্যে কবি প্রকৃতির ভেতর দিয়ে সময়, সমাজ ও মানুষের অন্তর্লীন আর্তিকে পাঠ করেছেন। ফলে এই গ্রন্থ হয়ে ওঠে একাধারে নন্দনচেতনার নির্মাণ এবং সমাজবাস্তবতার নীরব প্রতিবাদ।

বইটি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের আলী প্রয়াস (তৃতীয় চোখ)। এর নান্দনিক প্রচ্ছদ করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। কবি তাঁর এই সৃষ্টি উৎসর্গ করেছেন তাঁর স্ত্রী জেসমীন সুলতানাকে। ২৫০ টাকা মূল্যের এই বইটি বর্তমানে বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ এবং রকমারি ডটকমসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বুকশপগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে।

চরজাগরণ: অস্থির সময়ের রূপক:

গ্রন্থের শিরোনাম কবিতা কেঁপে ওঠে জেগে ওঠা চর”–এ আমরা দেখি প্রকৃতির এক দৃশ্য, কিন্তু তা নিছক দৃশ্য নয়―এটি সময়ের রূপক। নদীর বুকে জেগে ওঠা চর যেন ইতিহাসের নতুন ভূখণ্ড, আবার তা ভাঙন ও সৃষ্টির দ্বৈততাকেও ধারণ করে। এটি এক অস্থির রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক।

কবির দৃষ্টি এখানে কেবল প্রকৃতির বাহ্যিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি প্রকৃতির ভেতর দিয়ে মানবজীবনের অনিশ্চয়তা, ভাঙন ও পুনর্গঠনের এক দার্শনিক বোধ নির্মাণ করেছেন। শিকারির তীরবিদ্ধ হয়ে একটি বকের লুটিয়ে পড়া এবং অন্য বকগুলোর নীরব শোক যেন সমকালীন সমাজের নির্মম সত্যকে উন্মোচন করে―ভয়, নিস্তব্ধতা এবং প্রতিরোধহীনতার এক গাঢ় চিত্র।

চর এখানে একই সাথে ভাঙন ও সম্ভাবনার প্রতীক―যা কবির দার্শনিক বোধের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

প্রান্তজীবনের করুণ আর্তি: “একটি ঘোড়ার আর্তনাদ”―

গ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী কবিতা “একটি ঘোড়ার আর্তনাদ”―এখানে একটি ক্ষুধার্ত, পরিত্যক্ত ঘোড়ার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এক নির্মম সামাজিক সত্য―

“আমি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত…”

এই স্বীকারোক্তি শুধু প্রাণীর নয়; এটি প্রান্তিক মানুষেরও আর্তি। কবি এখানে এক অনবদ্য প্রতীক নির্মাণ করেছেন―ঘোড়াটি হয়ে ওঠে শোষিত মানুষের প্রতিনিধি, আর সমাজের নিষ্ঠুরতা তার নীরব নির্যাতক। ফলে কবিতা এখানে কেবল শিল্প নয়; হয়ে ওঠে এক সমাজতাত্ত্বিক দলিল।

প্রকৃতি: নান্দনিকতা ও বিপর্যয়ের দ্বৈত রূপ:

প্রকৃতির বিষাক্ত রূপ” কবিতায় প্রকৃতির ধ্বংস, দূষণ ও বিপর্যয়ের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নদী, পাহাড়, আকাশ―সবই যেন মানুষের লোভে ক্ষতবিক্ষত।

অন্যদিকে ঢেউয়ের মোহন বায়োলিন” কবিতায় প্রকৃতি এক সুরময় অভিজ্ঞতা―যেখানে সমুদ্র, আকাশ, পাহাড় এক সুরে মিলিত হয়ে সৃষ্টি করে এক মহাকাব্যিক সঙ্গীত।

এই দ্বৈততা―সৌন্দর্য ও ধ্বংস―কবির প্রকৃতিচিন্তার গভীরতাকে উন্মোচন করে।

প্রকৃতির আরশিতে মানবযন্ত্রণা:

রেজাউল করিমের কবিতায় প্রকৃতি নিছক পটভূমি নয়; এটি এক জীবন্ত চরিত্র।

নিভৃতে নিসর্গ ডাকে” কবিতায় চৈত্রের নিঃসঙ্গ দুপুর, প্রাগৈতিহাসিক পাহাড়, সর্পিল নদী―সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক সজীব দৃশ্যপট। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে এক গভীর বিষণ্নতা।

অন্যদিকে ঢেউয়ের মোহন ভায়োলিন”–এ সাগরের গর্জন ও ঢেউয়ের সুর এক সিম্ফনির জন্ম দেয়―যেখানে আকাশ ও পাহাড় একাকার হয়ে যায়।

এই দ্বৈততা―সৌন্দর্য ও বেদনা―কবির প্রকৃতিচেতনার মূল ভিত্তি।

দ্রোহ, ভাঙন ও পুনর্গঠনের দর্শন:

এই কাব্যে এক গভীর দ্রোহী সুর লক্ষণীয়। ভাঙছে, ভাঙুক” কবিতায় কবি উচ্চারণ করেন―

‘সবকিছু ভাঙছে, খুব দ্রুত ভাঙছে―

যা অবিশ্বাস্য।

ভাঙছে সমাজ, সংসার, অফিস-আদালত,

ভাঙছে বিচারসভা, সংবিধান,

ভাঙছে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ।

এই উচ্চারণে ধ্বনিত হয় এক ভাঙনের মহাকাল—যেন সময় নিজেই নিজের শরীর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ছে। এখানে ‘ভাঙা’ কেবল বস্তুগত নয়; এটি এক সভ্যতার অন্তর্গত বিপর্যয়ের প্রতিধ্বনি। সমাজের প্রাচীর, সংসারের আস্থা, বিচারসভা ও সংবিধানের মতো প্রতিষ্ঠিত কাঠামো—সবকিছু এক অদৃশ্য ক্ষয়ে ভেতর থেকে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে।

এই ভাঙন হঠাৎ নয়, অথচ বিস্ময়করভাবে দ্রুত—যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা পচন এক মুহূর্তে মুখ উন্মোচন করেছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য, যা আমাদের শিকড়ের মাটি, তাও যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে; মূল্যবোধ, যা ছিল মানুষের নৈতিক মেরুদণ্ড, তা ভেঙে পড়ছে নিঃশব্দে।

এই কবিতাংশ তাই কেবল একটি সময়ের বর্ণনা নয়; এটি এক গভীর অস্তিত্ব-সঙ্কটের দলিল। এখানে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে এক ভাঙা সেতুর ওপর—পেছনে ধ্বংস, সামনে অনিশ্চয়তা। তবু এই ভাঙনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অন্তর্লীন প্রশ্ন—
ভেঙে পড়া ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই কি জন্ম নেবে নতুন কোনো নির্মাণ, নতুন কোনো মানবিক ভোর?

শেকড়ের সন্ধান ও স্মৃতির অন্তর্গত আর্তি:

অধ্যাপক রেজাউল করিম নিজেকে ‘সমুদ্রতটের সন্তান’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর কবিতায় তাই বারবার ফিরে আসে উপকূল, বালিয়াড়ি, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস―এক গভীর ভূগোলচেতনা।

আলী আকবর ডেইলে” কবিতায় এক ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারানো বৃদ্ধের স্মৃতি কেবল ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এটি এক সামষ্টিক ট্র্যাজেডির প্রতীক। এই স্মৃতি নস্টালজিক নয়―দগদগে, জীবন্ত এবং সময়ের নির্মম সাক্ষ্য।

ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপ:

এই কাব্যগ্রন্থে পূর্বজ কবিদের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ লক্ষ করা যায়।

মাইকেল, তোমাকে মনে পড়ে” কবিতায় কবি কপোতাক্ষ নদের বর্তমান শীর্ণতা দেখে ব্যথিত হন এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত -এর স্মৃতির সঙ্গে এক অন্তর্মুখী সংলাপে প্রবেশ করেন।

এখানে ঐতিহ্য কোনো স্থির অতীত নয়; বরং তা বর্তমানের সঙ্গে এক জীবন্ত আলাপচারিতা―যা কবির কাব্যচেতনায় ঐতিহাসিক গভীরতা যোগ করে।

স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার মৃদু বিষাদ:

রবীন্দ্রের ঘ্রাণ” কিংবা গ্রামীণ জীবনের চিত্রময় কবিতাগুলোতে আমরা পাই এক মৃদু নস্টালজিয়া―যেখানে শৈশব, গ্রাম, নদী, সন্ধ্যা―সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক আবেগময় স্মৃতির জগৎ।

এই স্মৃতি কোনো সরল আবেগ নয়; এটি সময়ের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।

ভাষা ও কাব্যরীতি: গদ্যকবিতার স্বচ্ছ প্রবাহ:

রেজাউল করিমের ভাষা অলংকারবহুল নয়; বরং সহজ, স্বচ্ছ এবং গদ্যকবিতার মতো প্রবাহমান। তাঁর কবিতায় স্থানিক শব্দ, আঞ্চলিক জীবন, প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা―সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গি।

এই সরলতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে গভীর প্রতীক, সংকেত ও রূপক।

সময়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ:

গ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায় সমাজের অবক্ষয়, মূল্যবোধের সংকট ও মানবিকতার ক্ষয় উঠে এসেছে।
“এখন কেউ কাউকে সম্মান করে না”―এই ধরনের উচ্চারণ কবির সামাজিক বোধের তীক্ষ্ণতা প্রকাশ করে।

তবে এই প্রতিবাদ উচ্চকিত নয়; এটি গভীর, নীরব, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী।

সমাপনী: শিল্পরসের রসায়ন ও সময়ের দলিল:

অধ্যাপক রেজাউল করিমের কেঁপে ওঠে জেগে ওঠা চর” কাব্যগ্রন্থটি কেবল পাঠের জন্য নয়; এটি এক অভিজ্ঞতা। এখানে প্রকৃতি, দ্রোহ, স্মৃতি, শেকড় ও সময়―সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল কিন্তু সুরময় কাব্যভুবন।

এই কাব্য একদিকে যেমন ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির ভাষ্য, অন্যদিকে তেমনি এটি সমকালীন মানুষের অস্তিত্বসংকটের এক শৈল্পিক উত্তর।

নীরবতার ভেতর এক দীপ্ত উচ্চারণ:

অধ্যাপক রেজাউল করিমের এই কাব্যগ্রন্থ মূলত এক জীবনদর্শনের দলিল। এখানে প্রকৃতি আছে, মানুষ আছে, স্মৃতি আছে, প্রতিবাদ আছে―কিন্তু সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক অন্তর্গত যাত্রা।

এই কবিতা উচ্চারণ করে না; এটি প্রতিধ্বনি তোলে।
এটি চিৎকার করে না; বরং নীরবে আমাদের ভেতর কাঁপন তোলে―

যেন নদীর বুকে হঠাৎ জেগে ওঠা এক চর,
যা একইসাথে ভাঙন ও সম্ভাবনার প্রতীক।

শেষকথা:

এই কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতার ভুবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন―কারণ এটি আমাদের শেখায়, ভাঙনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে জাগরণের সম্ভাবনা, আর নীরবতার ভেতরেই জন্ম নেয় সবচেয়ে শক্তিশালী উচ্চারণ।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: ২৮/০৩/২০২৬ খিষ্টাব্দ।