
মাতামুহুরীর তীরে শ্রাবণের সন্ধ্যা। আকাশ তখন মেঘে ঢাকা, তবুও দিগন্তে এক ফালি আবছা আলো চিকচিক করছে। নদীর জল শান্ত, কলকল রবে বয়ে চলেছে আপন খেয়ালে। পাড়ে একাকী দাঁড়িয়ে কিশোর, প্রকৃতির নীরবতা অনুভব করছে গভীর ভাবে। ভেজা বাতাস তার উদাসী মন ছুঁয়ে যাচ্ছে আলতো করে।
হঠাৎ, দূরের আবছা আঁধারে তার দৃষ্টি আটকে যায় এক নারী মূর্তিতে। মনে হয় যেন কুয়াশার চাদর ভেদ করে এইমাত্র জেগে ওঠা কোনো স্বপ্নপরী। বৃষ্টির হালকা ছোঁয়ায় তার ভেজা বসন চিকচিক করছে মৃদু, মুখের অস্পষ্ট রেখা যেন কোনো না বলা রহস্যের ইঙ্গিত।
কিশোরের হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়। মাতামুহুরীর এই শান্ত, স্নিগ্ধ সন্ধ্যায়, প্রকৃতির এই মায়াবী আবহে, সেই রহস্যময়ীর উপস্থিতি তার মনে এক অব্যক্ত শিহরণ জাগায়। এ যেন চণ্ডীদাসের কবিতায় পড়া রাধিকা, তবে এই মায়াবী যেন এই তীরের নিজস্ব সৃষ্টি।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা সেই নারীর ভেজা স্পর্শের মতো অনুভূত হয় তরুণের মনে। তারুণ্যের চঞ্চল মন যেন খুঁজে পায় এক নতুন ঠিকানা, এক অচেনা গন্তব্য। কাছে যেতে চায় ব্যাকুল হৃদয়, কিন্তু এক অদৃশ্য দ্বিধা যেন তার পথ আগলে দাঁড়ায়। এই কি তবে প্রথম ভালো লাগা? নিছক কল্পনার রঙে রাঙানো এক ক্ষণিকের ছবি?
নদীর ঢেউয়ের মতো কিশোরের মনেও ঢেউ ওঠে। সেই মায়াবিনীর অস্পষ্ট মুখ তার কল্পনায় স্থায়ী হয়। মাতামুহুরীর তীরে বৃষ্টি চলতেই থাকে। আর সেই স্বপ্নিল সন্ধ্যা তারুণ্যের হৃদয়ে এক গভীর ছাপ ফেলে যায়।
রাতের নিস্তব্ধতা যখন চারপাশ গ্রাস করে, তখন মাতামুহুরীর তীরের সেই স্বপ্নিল সন্ধ্যা তরুণের মনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চোখের পাতায় ভেসে ওঠে সেই রহস্যময়ীর অস্পষ্ট মুখ। এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা বুকের ভেতর মোচড় দেয়। ক্রমশ: স্মৃতির আবছা পর্দা যেন আরও গাঢ় হয়।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে তরুণ। চোখের পাতায় ভেসে ওঠে সেই রহস্যময়ীর অস্পষ্ট মুখ। বৃষ্টির জলে ভেজা চিকচিক করা বসন, আবছা আলোয় রহস্যময় চাহনি—যেন কোনো দূর নক্ষত্রের আলো তার মনের আকাশে এসে পড়েছে।
হৃদয়ের গভীরে তখন এক অব্যক্ত অনুভূতি ঢেউ তোলে। এটা কি শুধুই ভালো লাগা, নাকি তার চেয়েও গভীর কিছু? তারুণ্যের প্রথম স্পর্শ যেমন রোমাঞ্চ জাগায়, তেমনই এই স্মৃতি তার মনে এক মিষ্টি অথচ অস্থির ভাবনার জন্ম দেয়।
জানালার বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ সেই সন্ধ্যার মায়াবী আবহ তৈরি করে তোলে। তরুণের মনে হয়, এখনও যেন সেই অপ্সরী মাতামুহুরীর তীরে অপেক্ষা করছে। এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা বুকের ভেতর মোচড় দেয়—যদি আবার দেখা যেত, যদি জানা যেত সেই রহস্যময়ীর পরিচয়।
ঘুম যেন আর আসতে চায় না। কল্পনার জাল বোনে তরুণ। সেই মায়াবিনীর সাথে তার নীরব কথোপকথন চলে। হয়তো সেও একা দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে, অনুভব করছে একই রকম ব্যাকুলতা। রাতের আঁধারে সেই স্বপ্নিল সন্ধ্যা তরুণের ভাবনার জগৎকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দেয়। তারুণ্যের সরল মন এক নতুন সম্পর্কের স্বপ্নে বিভোর হয়। সেই ক্ষণিকের দেখা যেন তার হৃদয়ে এক গভীর বীজ বুনে যায়, যা আগামী দিনের স্বপ্নে পল্লবিত হওয়ার অপেক্ষা রাখে।
পরের দিন সকাল। সূর্যের আলো চোখে পড়লেও তরুণের মন তখনও রাতের স্বপ্নে বিভোর। সেই মায়াবিনীর ভেজা রূপ, রহস্যময় চাহনি—যেন তার দিনের আলোকেও রাঙিয়ে দিয়েছে।
সারা দিন ধরে তার ভাবনায় সেই অপ্সরী। ক্লাসের ফাঁকে, বন্ধুদের সাথে আড্ডায়—সবকিছুর মাঝে সে যেন সেই মায়াবিনীর অস্পষ্ট মুখ দেখতে পায়। মাতামুহুরীর তীরের ভেজা সন্ধ্যা তার মনের ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে থাকে।
রাতে ঘুমের রাজ্যে সেই স্বপ্ন আরও গাঢ় হয়। তরুণ দেখে, সে একা দাঁড়িয়ে আছে মাতামুহুরীর তীরে। বৃষ্টি থেমে গেছে, আকাশে উঠেছে চাঁদ। স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় সেই মায়াবিনী ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার ভেজা চুল থেকে চুঁইয়ে পড়ছে জ্যোৎস্নার আলো।
তাদের মধ্যে কোনো কথা হয় না, শুধু চোখের ভাষায় এক গভীর সংযোগ স্থাপিত হয়। মনে হয় যেন বহু জন্ম জন্মান্তরের চেনা তারা আজ এই নদীর তীরে এসে মিলিত হয়েছে। সেই মায়াবিনীর স্পর্শ অনুভব করে তরুণ, এক অপার্থিব শান্তিতে ভরে ওঠে তার মন।
কখনও তারা দুজনে হাতে হাত রেখে নদীর পাড় ধরে হেঁটে বেড়ায়। চাঁদের আলোয় তাদের ছায়া দীর্ঘ হয়, মিশে যায় বালির উপর। মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে, এই মুহূর্ত অনন্তকালের। আবার কখনও তরুণ দেখে, সেই মায়াবিনী দূরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সেই হাসি যেন তারুণ্যের প্রথম প্রেমের মতোই স্নিগ্ধ আর মাদকতাময়। সেই হাসিতেই তরুণ খুঁজে পায় তার হৃদয়ের সকল প্রশ্নের উত্তর।
সারা রাত ধরে চলে এই স্বপ্নিল খেলা। জেগে উঠেও সেই রেশ তার মনে লেগে থাকে। মাতামুহুরীর তীরের সেই মায়াবিনী যেন তার হৃদয়ে এক গভীর বীজ বুনে গেছে। এখন প্রতিটি স্বপ্নে সেই বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে, পল্লবিত হচ্ছে ভালোবাসার নতুন স্বপ্নে। স্বপ্নে দেখা সেই মায়াবিনী যেন তার কাছে এক নতুন প্রেরণা। তারুণ্যের চঞ্চল মন খুঁজে পায় এক স্থির লক্ষ্য—যেন সেই স্বপ্নিল রূপটিকে বাস্তবেও খুঁজে পেতে হবে। সেই রাতের স্বপ্নগুলিই হয়ে ওঠে তার আগামী দিনের পথ চলার পাথেয়।
তরুণ আর সেই মায়াবিনীর দেখা পায় না বাস্তবে। হয়তো সেই মায়াবী রূপ ছিল নিছক তারুণ্যের কল্পনা, মাতামুহুরীর প্রকৃতির বুকে এক ক্ষণিকের মায়া। কিন্তু সেই স্বপ্নিল সন্ধ্যা তার হৃদয়ে অমর হয়ে থাকে। জীবনের নানা বাঁকে চলতে চলতে যখনই সে ক্লান্ত হয়, তখনই সেই রাতের মায়াবী স্মৃতি তাকে শান্তি দেয়, নতুন করে বাঁচার প্রেরণা যোগায়। সে বুঝতে পারে, কিছু অনুভূতি শুধু হৃদয়েই বেঁচে থাকে, তাদের বাস্তবতার প্রয়োজন হয় না। মাতামুহুরীর তীরের সেই স্বপ্নিল সন্ধ্যা তারুণ্যের অনন্ত কল্পনার প্রতীক হয়ে তার মনে চিরস্থায়ী আসন করে নেয়।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: 03/05/2025 খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :