মাতামুহুরীর তীরে স্বপ্নলোকের অনিমেষ নিবাস


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ২৪, ২০২৬, ৮:২৪ পূর্বাহ্ন /
মাতামুহুরীর তীরে স্বপ্নলোকের অনিমেষ নিবাস

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


পূর্বাকাশের ললাটে তখনো দিনের আলো পূর্ণ জাগ্রত হয়ে ওঠেনি। অন্ধকারের বুক চিরে দিবাভাগের এই মায়াবী সূচনা যেন ধীরে ধীরে উন্মীলিত হওয়া কোনো প্রাচীন ধ্রুপদী অলঙ্কারশাস্ত্রের এক গম্ভীর ভূমিকার মতো। দক্ষিণ-পূর্বের এই শৈলশ্রেণির শীর্ষদেশে জমাটবদ্ধ হয়ে থাকা কুয়াশাকে দূর থেকে মনে হয় যেন কোনো ধ্যানমগ্ন আদিম ঋষির শুভ্র জটাজাল। আর তারই নিভৃত অন্তরালে ভোরের রক্তাভ সূর্য এক নিবিড়, লজ্জাবনত ও পবিত্র দীপশিখার মতো চরাচরে উদ্ভাসিত। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে রূপসী মাতামুহুরী নদীকে অবলোকন করলে মনে হয়, সে যেন অরণ্যবেষ্টিত কোনো এক নিভৃত, পৌরাণিক দেবী; যার দীর্ঘ, রূপালী জলদেহ পাহাড়ের শ্যামল কান্তির পাশে এক পরম মায়ায় নিঃশব্দে বিস্তৃত হয়ে আছে।

এই পাহাড়ি নদীর স্রোত কোনোকালেই স্থূল বা উন্মত্ত নয়; বরং তার আসল গতি চিরকালই অন্তর্মুখী। কখনো সে পরম স্নিগ্ধ, কখনো এক অলৌকিক স্বপ্নবিহ্বলতায় আচ্ছন্ন, আবার কখনো বা এমন এক দুর্জ্ঞেয় রহস্যময়তায় ঘেরা যে মনে হয়—তার বুক বেয়ে জল নয়, বরং সুদূর অতীতের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া গোপন সুর ও সঙ্গীত অবিরত প্রবাহিত হচ্ছে। ভোরের এই পরম নিস্তব্ধতায় নদীতীরের নিবিড় শৈবালভূমি আর শিশিরসিক্ত কচি তৃণরাজি মানুষের অবচেতন মনে এমন এক নীরব ও তীব্র আকর্ষণ তৈরি করে, যা বাহ্যিক চাক্ষুষ দৃশ্যের চেনা সীমা অতিক্রম করে এক নিমেষে আত্মার গহিন অন্তঃপুরে পৌঁছে যায়। জলরেখার সেই ক্ষীণ, কম্পিত আন্দোলন, দূরের বাঁশবনের পত্রে পত্রে জাগা মৃদু মর্মর ধ্বনি, আর বুনো বাতাসের নরম শীতল স্পর্শ মিলেমিশে সেখানে এক অনির্বচনীয় অন্তর্জাগতিক প্রশান্তির জন্ম দেয়।

মাতামুহুরীর এই পার্বত্য উপত্যকার আঙিনায় প্রকৃতি কখনো কেবল বাইরের চোখ দিয়ে দেখার দৃশ্যমান কোনো বস্তু নয়; সে এখানে এক পরম অনুভবযোগ্য আত্মিক সত্য। দূরের পাহাড়গুলোর কুয়াশা-অস্পষ্ট রেখা যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর ধূসর রঙে আঁকা এক একটি অমর কালজয়ী জলরঙচিত্র। এই মর্ত্যের ধূলিময় দিনযাপনের ক্লান্তি, যান্ত্রিক সময়ের অবিরাম অস্থিরতা কিংবা নাগরিক কোলাহলের বিষণ্ণ ও কৃত্রিম চাপ—সব কিছু থেকে এই আদিম ভূদৃশ্য মানুষকে পরম মমতায় এক লহমায় বিচ্ছিন্ন করে আনে। তখন মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত জাগতিক তাড়না ও জরা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের অবশ মন কোনো সুদূর অনন্ত গিরিধারার দিকে ধীরে ধীরে মেঘের মতো ভেসে যাচ্ছে।

এই অনন্য ভূখণ্ডের অপরূপ সৌন্দর্যের গভীরে এক অদ্ভুত, পবিত্র বৈরাগ্য লুকিয়ে আছে। এখানে এসে নশ্বর মানুষ কেবল বাহ্যিক প্রকৃতিকেই অবলোকন করে না; বরং সে প্রথমবার নিজের ভেতরের অন্তর্গত গোপন নিঃসঙ্গতা ও শূন্যতার সাথেও নিবিড়ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। পাহাড়ের সবুজ ও ঢালু ভূমি, নদীর নীলাভ তরঙ্গের চপল নুড়ি, আর আদি আকাশের এই অসীম প্রশান্ত বিস্তার মিলে মানুষের মনে এমন এক অনুভবের জন্ম দেয়, যেখানে বাস্তব জগতের রূঢ়তা আর কল্পনার মায়াবী ভুবনের ব্যবধান ক্রমশ কুয়াশার মতো ক্ষীণ হয়ে আসে। তখন তীব্রভাবে মনে হয়, মানুষ যেন তার এই মর্ত্যজীবনের বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া কোনো এক স্বর্গীয় স্বদেশের শাশ্বত সন্ধান পেয়েছে।

মাতামুহুরী কেবল ভূগোলের মানচিত্রে এঁকে দেওয়া একটি সাধারণ নদীর নাম নয়; এটি আসলে আমাদের এই পার্বত্য জনপদের শতাব্দীপ্রাচীন বহমান এক অমূল্য জীবনরেখা। মায়ানমার সীমান্তঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ি উৎসভূমি থেকে জন্ম নিয়ে এই নদী আলীকদম, লামা, চকরিয়া ও পেকুয়া’র বিস্তীর্ণ জনপদ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত সাগরমুখী এক মহান যাত্রায় প্রবৃত্ত হয়েছে। তার দুই তীরে যুগের পর যুগ ধরে গড়ে উঠেছে নানাবিধ জাতিগোষ্ঠী, সংস্কৃতি এবং জীবনযাপনের এক সম্মিলিত নান্দনিক ভূগোল। বাঙালি, মারমা, মুরুংসহ নানা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবহমান জীবনধারা এখানে এই নদীকে কেন্দ্র করেই বিকশিত ও পল্লবিত হয়েছে। শরতের শুভ্র কাশবন, শীতের নিঝুম বাঁশঝাড়, বালুচরের ধুলোখেলা, মাঝিনদীর ডিঙি নৌকা, খেয়াঘাটের ব্যস্ততা আর আদিবাসী হাটের প্রাত্যহিক হাঁকডাক—সব কিছু মিলিয়ে মাতামুহুরী যেন এ মাটির এক জীবন্ত লোকসভ্যতার সার্থক প্রতীক।

তবে এই নদীর আদি চরিত্র কিন্তু কেবলই কোমল বা স্নিগ্ধতার ফ্রেমে বাঁধা নয়। চৈত্র-বৈশাখের অন্তিমে যখন তার জলরেখা শান্ত, বিনম্র ও কাচের মতো স্বচ্ছ হয়ে আসে, তখন তাকে মনে হয় যেন নিভৃত অরণ্যে ধ্যানমগ্ন কোনো এক পবিত্র কুমারী। অথচ আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘস্ফীত দুর্যোগের দিনে সেই একই নদী এক নিমেষে ভয়ংকর ও সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে। পাহাড়ি ঢলের উন্মত্ত ও অবাধ্য বন্যায় নদীর দুই তীরভূমি আকস্মিক ডুবে যায়, মানুষের চেনা জনপদ বিপর্যস্ত হয়, সাজানো হাট-বাজার ভেসে যায় প্রলয় স্রোতে। নদীর এই যে ধ্বংস ও সৃষ্টির দ্বৈত স্বরূপ, তা তো আসলে মানুষের বহমান জীবনেরই এক একটি অমোঘ রূপক—যেখানে পরম দান ও নির্মম ধ্বংস, মাটির উর্বরতা ও প্রকৃতির বিপর্যয় চিরকাল পরম শান্তিতে পাশাপাশি সহাবস্থান করে।

তবুও এই জনপদের মানুষ তাকে কখনো ত্যাগ করে না, তার বুক থেকে দূরে সরে যায় না। কারণ, মাতামুহুরীর সঙ্গে এ মাটির মানুষের সম্পর্ক কেবল দৈনন্দিন জাগতিক প্রয়োজনের সংকীর্ণ ফ্রেমে বাঁধা নয়; এটি হৃদয়ের গভীর আবেগের এক অলক্ষ্য বন্ধন। গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে যখন নদীর বুক ক্ষীণ হয়ে বালুচর জেগে ওঠে, তখনও মানুষ এক নিবিড় টানে তার এই শুষ্ক তীরে ফিরে আসে। অবুঝ শিশুরা তার বুকে জলকেলিতে মেতে ওঠে, প্রবীণ বৃদ্ধরা শান্ত মনে বসে থাকে নদীর ওপার থেকে আসা শীতল বাতাসের আশায়, আর উদাসী যুবকেরা নদীর ওপারে দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে জীবনের অদৃশ্য কোনো রঙিন স্বপ্নের জাল বুনে চলে। নদী তখন যেন তাদের সকলের এক পরম নীরব, আদিম আত্মীয়।

বর্ষাকালের মেঘলা দিনে এই সমগ্র ভূদৃশ্য আরও বেশি অলৌকিক ও অপার্থিব হয়ে ওঠে। মেঘ ভাঙা বৃষ্টির অবিরাম ধারা নেমে এলে পাহাড়ের গা থেকে সমস্ত জমাট কুয়াশা অশ্রুর মতো ঝরে পড়ে, নদীর জল পলিমাটির ছোঁয়ায় গাঢ় ও ওজস্বী হয়, আর চরাচরের বাতাসে ভেসে বেড়ায় সিক্ত মৃত্তিকার এক আদিম ও মায়াবী গন্ধ। এই অলৌকিক আবহে মানুষের মনস্তত্ত্বেও এক অদ্ভুত ও গোপন কম্পন জেগে ওঠে। শৈশবের সেই প্রথম গোপন আলোড়ন, কোনো এক মেঠোপথে দেখা হওয়া অচেনা মুখের আকস্মিক মধুর স্মৃতি, কিংবা প্রেম ও বিরহের অনির্বচনীয় এক মধুর ব্যথা—সব কিছু যেন শ্রাবণের বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

মাতামুহুরীর এই তীরে তাই মানুষের প্রেম কেবল কোনো সাধারণ জাগতিক বা মানবিক সম্পর্ক মাত্র নয়; এটি তো আসলে আদি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অন্তরের আত্মার এক প্রগাঢ় ও শাশ্বত সখ্য। এখানে বৃষ্টিস্নাত কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলে নদীর কল্লোলিত জলে প্রতিফলিত ধূসর আকাশ দেখে স্পষ্ট মনে হয়—মানুষের অবচেতনের হৃদয়টাও বোধহয় অবিকল এমনই; কখনো সে শান্ত-বিনম্র, কখনো তীব্র অস্থির, কখনো সুগভীর, আবার কখনো বা এক অতলস্পর্শী রহস্যের আঁধার।

এই বহমান নদী মানুষকে প্রতিক্ষণ এই ধ্রুব পাঠ দিয়ে যায় যে, এই নশ্বর মহাবিশ্বে অস্তিত্ব মানেই হলো অবিনাশী ‘পরিবর্তন’। যেমন তার জলস্রোত ঋতুভেদে রূপান্তরিত হয়ে নিজেকে নতুন রূপ দেয়, ঠিক তেমনই মানুষের জীবনও সুখ ও বিষাদের, আলো ও অন্ধকারের মধ্য দিয়ে নিজের এক একটি নিজস্ব গতিপথ নির্মাণ করে নেয়। প্লাবনের প্রলয় আসে, পাড়ের ক্ষয় আসে, আবার তার পরক্ষণেই প্রকৃতির পরম মমতায় উর্বর নতুন পলিমাটিও আসে। ধ্বংসের এই রূঢ় অন্দরের ভেতর দিয়েই চিরকাল জন্ম নেয় নতুন পুনর্নির্মাণের এক একটি অবিনাশী সম্ভাবনা।

পরিশেষে বলা যায়, মাতামুহুরী কেবল ভূগোলের মানচিত্রে এঁকে দেওয়া প্রবহমান কোনো জড় রেখা বা জলধারা নয়। সে এক অন্তহীন ও শাশ্বত অনুভবের বিশাল আধার—যেখানে সবুজ পাহাড়, আকাশের মেঘ, শ্রাবণের বৃষ্টি, প্রমত্ত নদী এবং মরণশীল মানবহৃদয় পরস্পরের মধ্যে গোপনে ও নিঃশব্দে বিনিময় করে নেয় তাদের অন্তরের নীরবতম আদি ভাষা। তার এই পলিমাখা তীরে একলা এসে দাঁড়ালে মনে হয়, এই যান্ত্রিক পৃথিবীর সমস্ত কৃত্রিম কোলাহল থেকে বহু যোজন দূরে, পাহাড়ের খাঁজে কোথাও এখনো এক শাশ্বত স্বপ্নলোক সগৌরবে টিকে আছে—যেখানে অবিনাশী প্রকৃতি আর মানুষের অবশ আত্মা পরস্পরকে পরম মমতায় চিনে নেয় এক অনিমেষ, অলৌকিক প্রশান্তির মহাসুনীড়ে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: ২৪/০৫/2026 খিষ্টাব্দ।