মানুষ, মুখোশ ও ক্ষমতার ছায়া


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ৪, ২০২৬, ৬:৪০ অপরাহ্ন /
মানুষ, মুখোশ ও ক্ষমতার ছায়া

নজরুল, মার্টন ও বুর্দিয়োর আলোকে এক সমাজপাঠ


মমতাজ উদ্দিন আহমদ


প্রথম অধ্যায়: রাত্রিকালীন এক অভিশাপের গল্প

রাত ছিল গভীর। বান্দরবানের নিঝুম পাহাড়ি পল্লীর একটি পুরনো বাড়িতে বসে আছেন একজন বয়স্ক লেখক। তার নাম শরিফ সাহেব। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী পড়ছেন। তার পাশে বসে আছে তার নাতি রহিম, যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান পড়ছে।

রহিম বলে, “দাদা, নজরুল কেন এত রাগী ছিলেন? কেন তিনি সবসময় বিদ্রোহ করতে থাকেন?”

শরিফ সাহেব চুপ করে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, “রহিম, নজরুল রাগী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সংবেদনশীল। এবং সংবেদনশীল মানুষ যখন একটি অসৎ সমাজ দেখে, তখন তার ভেতর জন্ম নেয় এক অভিশাপের মতো আগুন।”

“কিন্তু দাদা, আজকের সমাজ তো আরও বেশি অসৎ। তাহলে আজকের তরুণরা কেন এত নীরব?” রহিম প্রশ্ন করে।

শরিফ সাহেব একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তারপর বলেন, “কারণ আজকের সমাজ শুধু অসৎ নয়। এটি সূক্ষ্মভাবে অসৎ। এটি নিজেকে সৎ বলে দাবি করে, অথচ ভেতরে সম্পূর্ণ বিপরীত। এই দ্বিমুখিতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।”

এবং সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় একটি গভীর কথোপকথন—মানুষের মুখোশ, ক্ষমতার ছায়া এবং সমাজের অসততা সম্পর্কে।

দ্বিতীয় অধ্যায়: নজরুলের প্রশ্ন এবং আমাদের সমাজ

কাজী নজরুল ইসলাম এক পত্রে লিখেছিলেন একটি বিখ্যাত প্রশ্ন—মানুষের মুখ উল্টে গেলে সে ভূত হয়, না কি ভূত হলে তার মুখ উল্টে যায়? এই প্রশ্নটি শুধু একটি রূপক নয়। এটি একটি গভীর সামাজিক প্রশ্ন। এটি আমাদের জিজ্ঞাসা করে—মানুষ কখন মানুষ থাকে না? কখন সে হয়ে ওঠে অন্য কিছু?

নজরুল জানতেন, সবচেয়ে ভয়ংকর রূপান্তরটি ঘটে মানুষের হৃদয়ে। বাইরের চেহারা বদলায় না। কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হয় না। কিন্তু হৃদয় উল্টে গেলে, যখন সেখানে আর ভালোবাসা থাকে না, যখন সেখানে শুধু থাকে প্রতিহিংসা এবং লোভ—তখন মানুষ হয়ে ওঠে প্রতিহিংসার এক জীবন্ত কারখানা।

আজকের সমাজ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই নজরুল-পত্র যেন আরও তীব্র হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে নৈতিকতার ভাষা আছে প্রচুর। প্রতিটি অনুষ্ঠানে, প্রতিটি বক্তৃতায়, প্রতিটি সংবাদপত্রে আমরা শুনি নৈতিকতার কথা। কিন্তু নৈতিকতার অনুশীলন? সেটি হারিয়ে গেছে কোথাও।

এখানে সত্য উচ্চারিত হয়। মঞ্চে, মিডিয়ায়, আইনের আদালতে সত্যের কথা বলা হয়। কিন্তু সত্যকে রক্ষা করা হয় না। সত্যকে তুচ্ছ করা হয়। সত্যের সাথে যারা থাকে, তাদের একঘরে করা হয়। এই দ্বিচারিতার সমাজতাত্ত্বিক নাম হলো মুনাফেকি—যার আধুনিক রূপ ব্যাখ্যা করা যায় সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টন এবং পিয়ের বুর্দিয়োর তত্ত্ব দিয়ে।

তৃতীয় অধ্যায়: মার্টনের anomie এবং আমাদের নৈতিক শূন্যতা

রবার্ট কে. মার্টন, আমেরিকার একজন বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী, একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা নিয়ে এসেছিলেন—anomie, অর্থাৎ নৈতিক শূন্যতা। তিনি বলেছিলেন, সমাজ যখন লক্ষ্য (goals) এবং উপায় (means)-এর মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন জন্ম নেয় এই anomie। এটি কী বোঝায়?

ধরুন, একটি সমাজ তার সকল সদস্যকে বলে—সফল হও, অর্থবান হও, মর্যাদাশালী হও। এটি হল লক্ষ্য। কিন্তু সেই সমাজ সকল সদস্যকে সমান উপায় দেয় না। কেউ পায় শিক্ষা, কেউ পায় না। কেউ পায় সুযোগ, কেউ পায় না। কেউ পায় সংযোগ এবং পরিচয়, কেউ পায় না। এখন কী ঘটে? যারা সমাজস্বীকৃত উপায়ে সফল হতে পারে না, তারা অসমাজস্বীকৃত উপায় খুঁজে নেয়। তারা মিথ্যা বলে। তারা ঘুষ দেয়। তারা প্রতারণা করে। তারা অন্যদের ক্ষতি করে। এবং এসব কিছু করার সময় তারা বলে—এটি তো সবাই করে। এটি তো সমাজের নিয়ম।

এই strain থেকেই জন্ম নেয় ঈর্ষা, ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার। মানুষ তখন সমাজস্বীকৃত মূল্যবোধের ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু নিজের স্বার্থে সেই মূল্যবোধ ভেঙে ফেলে। বাইরে সে নীতিবান, ভেতরে সে সুবিধাবাদী। এটাই নজরুল যাকে বলেছিলেন—মানুষের হৃদয়ের উল্টে যাওয়া।

একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি সরকারি অফিসে কাজ করেন একজন মানুষ। তার নাম করিম। করিম একজন সৎ মানুষ। তিনি ঘুষ নেন না। তিনি অন্যায় করেন না। কিন্তু তার চারপাশে সবাই ঘুষ নিচ্ছে। সবাই অন্যায় করছে। এবং তারা সফল হচ্ছে। তাদের বাড়ি বড়, গাড়ি আছে, সন্তানরা বিদেশে পড়ছে। অথচ করিম? তার বাড়ি ছোট, গাড়ি নেই, সন্তানরা সাধারণ স্কুলে পড়ছে।

এখন করিম কী করবে? তার মনে জন্ম নেয় এক অপার ঈর্ষা। তার মনে প্রশ্ন জাগে—কেন আমি সৎ থাকব? কেন আমি ঘুষ নেব না? কেন আমি অন্যায় করব না? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে শুধু একটি শক্তিশালী নৈতিক বিশ্বাস। কিন্তু যখন সমাজ নিজেই সেই নৈতিক বিশ্বাসকে প্রশ্ন করে, যখন সমাজ নিজেই বলে—সবাই তো ঘুষ নেয়, তখন করিমের মনে জন্ম নেয় এক গভীর শূন্যতা। এই শূন্যতাই হল anomie।

এবং এই anomie-র মধ্যে দিয়ে যখন করিম চলে, তখন তার মনে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত মানসিকতা। সে বলে—সবাই যদি ঘুষ নেয়, তাহলে আমি কেন নেব না? এবং এই যুক্তিতে করিম নিজেকে ন্যায্যতা দেয়। সে ঘুষ নেয়। অন্যায় করে। কিন্তু তার মনে থাকে এক অপার দ্বন্দ্ব। সে জানে এটি ভুল। কিন্তু সে করছে। এবং এই দ্বন্দ্বের যন্ত্রণায় তার মন ক্ষত হয়ে যায়। এটিই anomie-র প্রকৃত রূপ।

চতুর্থ অধ্যায়: বুর্দিয়োর symbolic power এবং ক্ষমতার সূক্ষ্ম খেলা

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মার্টন যা দেখিয়েছেন, তা হল ব্যক্তিগত স্তরের সমস্যা। কিন্তু ক্ষমতার খেলা আরও সূক্ষ্ম। এটি আরও গভীর। এটি আরও বিপজ্জনক। এই খেলা ব্যাখ্যা করেছেন ফ্রান্সের বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো।

বুর্দিয়ো আমাদের দেখান ক্ষমতার এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ—symbolic power। এখানে ক্ষমতা লাঠিতে নয়, ভাষায়। ক্ষমতা গুলিতে নয়, গুজবে। ক্ষমতা শাসনে নয়, স্বীকৃতির বণ্টনে। এটি হল ক্ষমতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং সবচেয়ে কার্যকর রূপ।

বুর্দিয়ো বলেন, প্রতিটি সমাজে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পুঁজি। শুধু অর্থনৈতিক পুঁজি নয়। রয়েছে সাংস্কৃতিক পুঁজি—শিক্ষা, জ্ঞান, রুচি। রয়েছে সামাজিক পুঁজি—সম্পর্ক, নেটওয়ার্ক, আনুগত্য। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রয়েছে প্রতীকী পুঁজি—পরিচয়, সম্মান, স্বীকৃতি।

এখন কোনো প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কেউ কেউ এই পুঁজিগুলি ব্যবহার করে অন্যদের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে। তারা মাঠে নামে না। তারা লাঠি ধরে না। তারা কোনো সরাসরি হুমকি দেয় না। কিন্তু তারা মাঠের নিয়ম বদলে দেয়। তারা নিয়ন্ত্রণ করে কে সম্মানিত হবে, কে অসম্মানিত হবে। তারা নিয়ন্ত্রণ করে কে কথা বলতে পারবে, কে পারবে না। তারা নিয়ন্ত্রণ করে কে দলের অংশ, কে বহিরাগত।

বুর্দিয়োর ভাষায়, এটাই field-এর ভেতরে অবস্থানগত যুদ্ধ। এবং এই যুদ্ধ অত্যন্ত নীরব। এতে কোনো রক্ত ঝরে না। কিন্তু এতে মানুষের আত্মা ক্ষত হয়। মানুষের সম্মান নষ্ট হয়। মানুষের বিশ্বাস ভেঙে যায়।

একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন একজন প্রফেসর। তার নাম সুমাইয়া। সুমাইয়া একজন প্রতিভাবান গবেষক। তিনি নিয়মিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু তার বিভাগের প্রধান তার সাথে সন্তুষ্ট নন। কেন? কারণ সুমাইয়া প্রধানের মতামতকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। সুমাইয়া বলেছেন যে প্রধানের একটি গবেষণা পদ্ধতিগতভাবে ভুল।

এখন প্রধান কী করেন? তিনি সুমাইয়াকে সরাসরি আক্রমণ করেন না। তিনি বলেন না—তুমি বিভাগ ছাড়ো। তিনি বলেন না—তুমি চাকরি হারাবে। বরং তিনি আরও সূক্ষ্ম কিছু করেন। তিনি সুমাইয়াকে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি থেকে বাদ দেন। তিনি সুমাইয়ার গবেষণার জন্য তহবিল বরাদ্দ করেন না। তিনি সুমাইয়ার নাম উল্লেখ করেন না গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে। তিনি সুমাইয়ার সাথে কথা বলেন না। তিনি সুমাইয়াকে নীরবে একঘরে করে দেন।

এবং এই একঘরে করার প্রক্রিয়ায় সুমাইয়া ধীরে ধীরে হারিয়ে যান। তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তার গবেষণার আগ্রহ হারিয়ে যায়। তার মনে জন্ম নেয় এক অপার ভয়। এবং একদিন সুমাইয়া চলে যান। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যান। এবং প্রধান বলেন—দেখো, সুমাইয়া ছিল দুর্বল। সে টিকতে পারেনি।

এটাই বুর্দিয়োর symbolic power। এটাই ক্ষমতার সূক্ষ্ম খেলা। এবং এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এটি নীরব। এটি অদৃশ্য। এটি প্রমাণ করা যায় না। এবং এটি সমাজের সর্বত্র বিদ্যমান।

পঞ্চম অধ্যায়: নজরুলের সংবেদনশীলতা এবং আমাদের অসংবেদনশীলতা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই অবস্থানগত যুদ্ধকে খুব আগেই চিনেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে সমাজের সবচেয়ে বড় অপরাধ হল—সৎ মানুষকে একঘরে করা। সৎ মানুষকে অসম্মান করা। সৎ মানুষকে নীরবে হত্যা করা।

তাই নজরুল লিখেছিলেন—কিছু করতে না পারলেও ব্যথিত মানুষের সাথে কাঁদতে চান। কারণ তাঁর কাছে নৈতিকতা ছিল অবস্থান নয়, অনুভব। নৈতিকতা ছিল মুখোশ নয়, হৃদয়ের সত্যিকারের কণ্ঠস্বর।

কিন্তু আজকের সমাজে এই অনুভবটাই অনুপস্থিত। আমরা কাঁদার ভান করি, কিন্তু আঘাত করি ঠাণ্ডা মাথায়। আমরা সহানুভূতির কথা বলি, কিন্তু অন্যের দুঃখে আনন্দ খুঁজি। আমরা ভালোবাসার কথা বলি, কিন্তু ভালোবাসা করি শুধু নিজেকে।

এই অসংবেদনশীলতা কোথা থেকে আসে? এটি আসে anomie থেকে। যখন সমাজ নৈতিকতাকে প্রশ্ন করে, তখন মানুষও নৈতিকতাকে প্রশ্ন করতে শিখে। যখন সমাজ সততাকে পুরস্কৃত করে না, তখন মানুষ সততা ছেড়ে দেয়। যখন সমাজ সৎ মানুষকে একঘরে করে, তখন মানুষ সৎ থাকার সাহস হারায়।

এবং এই সাহস হারানোর মধ্যে দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠে অসংবেদনশীল। তার হৃদয় হয়ে ওঠে পাথরের মতো কঠিন। তার চোখ হয়ে ওঠে অন্ধ। তার কান হয়ে ওঠে বধির। এবং এই অসংবেদনশীল মানুষই তৈরি করে একটি অসংবেদনশীল সমাজ।

ষষ্ঠ অধ্যায়: ঈর্ষা—ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, সামাজিক প্রতিক্রিয়া

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। ঈর্ষা শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়। এটি একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া। যখন কেউ দীর্ঘ শ্রমে, ত্যাগে, নিষ্ঠায় একটি নৈতিক অবস্থান তৈরি করে, তখন যাদের কাছে সেই পুঁজি নেই, তারা তাকে ভাঙতে চায়।

বুর্দিয়ো বলতেন—যাদের হাতে অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পুঁজি কম, তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতীকী সহিংসতার মাধ্যমে। কুৎসা, সন্দেহ, অপবাদ—সবই সেই সহিংসতার অস্ত্র।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি গ্রামে একজন শিক্ষক আছেন। তার নাম রহিম। রহিম একজন নিবেদিত শিক্ষক। তিনি গরিব শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়ান। তিনি গ্রামের সকল শিশুকে শিক্ষিত করতে চান। তার এই নিষ্ঠা এবং ত্যাগ সবাই দেখে। সবাই তার প্রশংসা করে।

কিন্তু গ্রামে একজন জমিদার আছেন। তার নাম খান সাহেব। খান সাহেব রহিমের এই জনপ্রিয়তা দেখে অসন্তুষ্ট। তার মনে জন্ম নেয় ঈর্ষা। কারণ খান সাহেব নিজে কখনও এত সম্মান পাননি। তিনি টাকা দিয়ে সম্মান কিনেছেন, কিন্তু হৃদয় থেকে সম্মান পাননি।

এখন খান সাহেব কী করেন? তিনি রহিমকে সরাসরি আক্রমণ করেন না। বরং তিনি গুজব ছড়ান। তিনি বলেন—রহিম নাকি শিক্ষার্থীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক রাখেন। তিনি বলেন—রহিম নাকি ধর্মীয় মূল্যবোধ নষ্ট করছেন। তিনি বলেন—রহিম নাকি বিদেশী এজেন্ট।

এবং এই গুজবগুলি ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। মানুষ সন্দিহান হয়ে ওঠে। রহিমের উপর বিশ্বাস কমে যায়। এবং একদিন রহিম একঘরে হয়ে যান। তার নৈতিক অবস্থান ভেঙে যায়। এবং খান সাহেব বলেন—দেখো, রহিম ছিল ধর্মহীন। সে তাই একঘরে হয়েছে।

এটাই symbolic violence। এটাই ক্ষমতার সূক্ষ্ম খেলা। এবং এটি সমাজের সর্বত্র চলছে। প্রতিটি অফিসে, প্রতিটি স্কুলে, প্রতিটি কলেজে, প্রতিটি পরিবারে, প্রতিটি সমাজে, প্রতিটি সংঘে।

সপ্তম অধ্যায়: মুখোশের সমাজ এবং সত্যের একাকিত্ব

এই সমাজে আজ সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো—সৎ থাকা, নির্বিবাদী থাকা, এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা। কারণ সৎ থাকা মানে মুখোশ না পরা। সৎ থাকা মানে সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে না চলা। সৎ থাকা মানে ঝুঁকি নেওয়া।

এবং এই ঝুঁকি নেওয়ার জন্য সমাজ সৎ মানুষকে শাস্তি দেয়। সমাজ তাদের একঘরে করে। সমাজ তাদের বিশ্বাস করে না। সমাজ তাদের গুজব ছড়ায়। এবং এই শাস্তির ভয়ে মানুষ মুখোশ পরে নেয়। মানুষ নিজের সত্যিকারের মুখ লুকিয়ে ফেলে। মানুষ হয়ে ওঠে অভিনেতা।

এবং এই অভিনয়ের সমাজে সত্য হয়ে ওঠে সবচেয়ে একা। সত্য কথা বলা মানুষ হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন। তার কোনো সঙ্গী নেই। তার কোনো সহযোগী নেই। সবাই তার বিরুদ্ধে। এবং এই একাকিত্বের মধ্যে দিয়ে সত্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—এই একা সত্যই একদিন পথ দেখায়। যারা আজ কাঁটা ছোড়ে, কাল তারাই ছায়া খোঁজে। যারা আজ সৎ মানুষকে একঘরে করে, কাল তারাই সৎ মানুষের কাছে ফিরে আসে। এটি ইতিহাসের চিরন্তন সূত্র।

অষ্টম অধ্যায়: নজরুলের আশাবোধ এবং আমাদের দায়িত্ব

তবু নজরুল আশাবাদী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন—এই ধূলিমাখা মানুষই একদিন ধুলোর নিচে স্বর্গ টেনে আনবে। এই অসৎ সমাজও একদিন সৎ হয়ে উঠবে। এই মুখোশের সমাজও একদিন মুখোশ ফেলে দেবে।

সমাজতত্ত্বও বলে, anomie চিরস্থায়ী নয়। সংকটের ভেতর দিয়েই নতুন নৈতিকতা জন্ম নেয়। কিন্তু তার জন্য দরকার সাহস—নির্ভীক তরুণের সাহস, যাদের নজরুল ডাক দিয়েছিলেন। দরকার সচেতনতা—যা মার্টন দেখিয়েছেন anomie-র মাধ্যমে। আর দরকার ক্ষমতার মুখোশ চিনে নেওয়ার বুদ্ধি—যা বুর্দিয়ো আমাদের শিখিয়েছেন symbolic power-এর মাধ্যমে।

এই তিনটি জিনিস একসাথে আসলে, তখন সমাজ বদলে যায়। তখন মানুষ মুখোশ ফেলে দেয়। তখন সত্য আর একা থাকে না। তখন সৎ মানুষরা সংগঠিত হয়। তখন নতুন নৈতিকতা জন্ম নেয়।

নবম অধ্যায়: সমাপনী—শরিফ সাহেব এবং রহিমের কথোপকথনের সমাপ্তি

সেই রাতে শরিফ সাহেব এবং রহিমের কথোপকথন শেষ হয়। রহিম বলে, “দাদা, তাহলে আমরা কী করব? আমরা কীভাবে এই সমাজ বদলাতে পারব?”

শরিফ সাহেব রহিমের কাঁধে হাত রাখেন। তারপর বলেন, “রহিম, তুমি প্রথমে নিজেকে বদলাও। তুমি মুখোশ ফেলে দাও। তুমি সৎ থাকো। তুমি সাহস রাখো। এবং তুমি দেখবে—আরও অনেকে তোমার সাথে যুক্ত হবে। আরও অনেকে মুখোশ ফেলে দেবে। এবং এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলি একদিন বড় পরিবর্তন হয়ে উঠবে।”

“কিন্তু দাদা, এটি কি সম্ভব?” রহিম প্রশ্ন করে।

শরিফ সাহেব হাসেন। তারপর বলেন, “রহিম, নজরুল এটি সম্ভব করেছেন। তিনি একা ছিলেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি লিখেছেন, গেয়েছেন, কথা বলেছেন। এবং আজ তার কণ্ঠস্বর আমাদের সবার ভেতরে বাজছে। তাই হ্যাঁ, এটি সম্ভব। এটি অবশ্যই সম্ভব।”

সমাপনী: সত্যের পুনরুত্থান এবং মানুষের মুক্তি

এই সমাজে আজ সত্য সবচেয়ে একা হয়ে পড়েছে। মুখোশের ভিড়ে সত্যের কোনো স্থান নেই। ক্ষমতার খেলায় সত্য হয়ে উঠেছে অপ্রাসঙ্গিক।

কিন্তু ইতিহাস বলে, এই একাকিত্ব চিরস্থায়ী নয়। এই অন্ধকারও চিরস্থায়ী নয়। একদিন না একদিন সত্য ফিরে আসে। একদিন না একদিন মানুষ মুখোশ ফেলে দেয়। একদিন না একদিন নৈতিকতা পুনরায় জন্ম নেয়।

এবং সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে, আমাদের প্রতিটি সৎ কাজ, প্রতিটি সাহসী কণ্ঠস্বর, প্রতিটি অসম্মত মতামত—এগুলি হয়ে ওঠে বীজ। এই বীজগুলি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এবং একদিন এগুলি হয়ে ওঠে বিশাল বৃক্ষ, যার ছায়ায় সকলে আশ্রয় নিতে পারে।

তাই নজরুলের সাথে আমরাও বলি—মানুষ, তোমার মুখোশ ফেলে দাও। তোমার হৃদয় খোলা রাখো। তোমার সত্য কথা বলো। এবং তোমার দেখবে—এই অসৎ সমাজও একদিন সৎ হয়ে উঠবে। এই মুখোশের সমাজও একদিন মুখোশ ফেলে দেবে। এবং সেই দিনে, সত্য আর একা থাকবে না। সত্য হবে বিজয়ী।

চিরন্তন সত্য, চিরন্তন আশা:

মানুষ, মুখোশ এবং ক্ষমতার এই খেলায় আমরা সবাই জড়িত। কেউ শিকার, কেউ শিকারী। কেউ মুখোশ পরা, কেউ মুখোশ ফেলা। কিন্তু এই খেলার শেষ কখনও আসে না। এই খেলা চলে থাকে যুগের পর যুগ।

তবু প্রতিটি যুগে, প্রতিটি সমাজে কিছু মানুষ থাকে যারা মুখোশ ফেলে দেয়। যারা সত্য বলে। যারা ঝুঁকি নেয়। এবং এই মানুষগুলিই পরিবর্তন আনে। এই মানুষগুলিই ইতিহাস লেখে। এই মানুষগুলিই মানুষের মুক্তির পথ দেখায়।

নজরুল ছিলেন এমনই একজন মানুষ। মার্টন এবং বুর্দিয়ো ছিলেন এমনই দুজন চিন্তাবিদ। এবং আমরা, আমাদের প্রতিটি সৎ কাজে, প্রতিটি সাহসী কথায়, আমরাও হতে পারি এমনই মানুষ।

তাই বলি—মুখোশ ফেলে দাও। সত্য বলো। সাহস রাখো। এবং দেখবে—এই অসৎ সমাজও একদিন সৎ হয়ে উঠবে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: ০৫/০৫/2026 খিষ্টাব্দ।