মহাকালের প্রবাহে মানবমুক্তির কুরআনিক ম্যানিফেস্টো


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ১২, ২০২৬, ৬:২০ অপরাহ্ন /
মহাকালের প্রবাহে মানবমুক্তির কুরআনিক ম্যানিফেস্টো

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


পবিত্র কুরআনের সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সূরাগুলোর মধ্যে সূরা আল‑আসর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র তিনটি আয়াতের এই সূরা মানবজীবনের উদ্দেশ্য, সময়ের মূল্য এবং মুক্তির পথ সম্পর্কে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন উপস্থাপন করে। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে এই সূরার গুরুত্ব এতটাই গভীর যে মহান ফকীহ ইমাম শাফি বলেছেন―“মানুষ যদি শুধু এই সূরাটি নিয়ে চিন্তা করত, তবে হিদায়াতের জন্য এটিই যথেষ্ট হতো।”

বিখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)‑এর একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, সাহাবিরা যখন পরস্পরের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তখন বিদায়ের আগে একজন অন্যজনকে সূরা আল‑আসর তেলাওয়াত করে শুনাতেন এবং এর শিক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যিদ কুতুব তাঁর তাফসির ফি জিলালিল কুরআন‑এ লিখেছেন যে, এই সূরা মানুষের জীবনকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনের কাঠামো দেয়―যেখানে ব্যক্তিগত ঈমান, নৈতিক কর্ম, সামাজিক দায়িত্ব এবং সংগ্রামী ধৈর্য একত্রে একটি আদর্শ মানবসমাজ নির্মাণ করে। একইভাবে আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদ আবুল আ’লা মওদুদী তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে, সূরা আল‑আসর কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার নির্দেশনা নয়; বরং এটি একটি সভ্যতা নির্মাণের নৈতিক সূত্র। তাঁর মতে, ইতিহাসে যেসব সমাজ সত্য ও ন্যায়ের আহ্বানকে অবহেলা করেছে এবং ধৈর্য ও নৈতিকতার ভিত্তি হারিয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত পতনের মুখে পড়েছে। ফলে হাদীস, সাহাবীদের বাস্তব জীবনচর্চা এবং আধুনিক চিন্তাবিদদের বিশ্লেষণ―সবকিছু মিলিয়ে সূরা আল‑আসর মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন নৈতিক ও সভ্যতাগত নির্দেশনা হিসেবে প্রতিভাত হয়।



এই সংক্ষিপ্ত সূরার মধ্যে মানুষের চিরন্তন সংকট―সময়ের অপচয়, নৈতিক অবক্ষয় এবং আত্মিক দেউলিয়াত্ব―এর বিশ্লেষণ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মুক্তির একটি সুস্পষ্ট চারস্তম্ভবিশিষ্ট রূপরেখা। তাফসিরকারগণ যেমন ইবনে কাসির, ইমাম কুরতুবি এবং মুফতি মুহাম্মদ শফী (তাফসির মাআরিফুল কুরআন) এই সূরাকে ইসলামী নৈতিক দর্শনের এক সংক্ষিপ্ত ম্যানিফেস্টো হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

১. সময়ের শপথ: মহাকালের দর্শন

সূরার সূচনাতেই আল্লাহ বলেন―“ওয়াল আসর” অর্থাৎ “সময়ের শপথ”। কুরআনে কোনো কিছুর শপথ করা হলে তা সেই বিষয়টির গুরুত্বকে বিশেষভাবে নির্দেশ করে।

তাফসিরকার ইবনে কাসির ব্যাখ্যা করেছেন যে এখানে ‘আসর’ বলতে কেবল বিকেলের সময় বোঝানো হয়নি; বরং মানব ইতিহাসের সেই প্রবাহমান সময়ধারাকে বোঝানো হয়েছে যার মধ্যে মানুষের জন্ম, কর্ম, উত্থান ও পতন সংঘটিত হয়।

অন্যদিকে ইমাম কুরতুবি উল্লেখ করেন যে সময় আল্লাহর সৃষ্টির এক বিস্ময়কর নিদর্শন। দিন‑রাতের আবর্তন, ঋতুচক্রের পরিবর্তন এবং মানুষের জীবনকাল―সবই স্রষ্টার কুদরতের সাক্ষ্য। তিনি বলেন, সময়ের শপথের মাধ্যমে মানুষের কর্মের গুরুত্ব ও দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তাফসির মাআরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী লিখেছেন, মানুষের জীবন যেন এক ব্যবসা; আর সময় হলো তার মূলধন। এই মূলধন প্রতিনিয়ত কমছে। যে ব্যক্তি এই পুঁজিকে সৎ কাজে ব্যবহার করে, সে লাভবান হয়; আর যে অপচয় করে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২. সার্বিক ক্ষতি: মানবজাতির অস্তিত্ব সংকট

সময়ের শপথের পরই কুরআন ঘোষণা করেছে―
“নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।”

এই আয়াতে ব্যবহৃত “খুসর” শব্দটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। তাফসিরে ইবনে কাসির ব্যাখ্যা করেন যে, এখানে ‘মানুষ’ শব্দটি সমগ্র মানবজাতিকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিটি মানুষই ক্ষতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ইমাম কুরতুবি বলেন, মানুষের জীবন এক ব্যবসার মতো। যদি কেউ তার সময়কে ঈমান ও সৎকর্মে ব্যয় না করে, তবে সে এমন একজন ব্যবসায়ীর মতো হয়ে যায় যে তার মূলধন হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে।

মাআরিফুল কুরআন-এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে মানুষের জীবনের প্রকৃত ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক নয়; বরং এটি আত্মিক ও নৈতিক ক্ষতি। আধুনিক সভ্যতার বস্তুগত উন্নতি সত্ত্বেও মানুষের অন্তর্গত শূন্যতা ও নৈতিক সংকট এই আয়াতের বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে।

৩. মুক্তির চারস্তম্ভ: কুরআনের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা

এই সার্বজনীন ক্ষতি থেকে মুক্তির জন্য কুরআন চারটি মৌলিক গুণ নির্ধারণ করেছে।

ক. ঈমান বিশ্বাসের ভিত্তি:

প্রথম শর্ত হলো ঈমান। তাফসিরে ইবনে কাসির উল্লেখ করেন যে ঈমান হলো অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস, যা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং পরকালের প্রতি আস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করে।

মাআরিফুল কুরআন-এ বলা হয়েছে, ঈমান মানুষের জীবনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। লক্ষ্যহীন জীবনই মানুষের সর্ববৃহৎ ক্ষতির কারণ।

খ. আমালে সালিহ বিশ্বাসের বাস্তব রূপ:

ঈমানের পরেই আসে সৎ কর্ম। কুরআনের বহু আয়াতে ঈমান ও আমালে সালিহকে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইমাম কুরতুবি বলেন, সৎকর্ম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবকল্যাণ এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনও এর অন্তর্ভুক্ত।

গ. তাওয়াসি বিল হক সত্যের সামাজিক দায়িত্ব:

এই সূরার তৃতীয় নির্দেশনা হলো একে অপরকে সত্যের পথে আহ্বান করা।

ইবনে কাসির উল্লেখ করেন, সত্যের দাওয়াত দেওয়া মুসলিম সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। কেবল নিজের সংশোধন যথেষ্ট নয়; বরং সমাজকেও সত্যের পথে পরিচালিত করতে হবে।

ঘ. তাওয়াসি বিস সাবর ধৈর্যের শক্তি:

সত্যের পথে চলতে গেলে বাধা আসা অনিবার্য। তাই কুরআন ধৈর্যের ওপর জোর দিয়েছে।

মাআরিফুল কুরআন-এ বলা হয়েছে, সাবর তিন প্রকার:
১. পাপ থেকে বিরত থাকার ধৈর্য
২. সৎকর্মে অবিচল থাকার ধৈর্য
৩. বিপদে স্থির থাকার ধৈর্য

এই ধৈর্য ব্যক্তি ও সমাজ উভয়কে দৃঢ় করে।

৪. সময় ও ইতিহাস: মানব সভ্যতার শিক্ষা:

তাফসিরকারগণ উল্লেখ করেছেন যে এই সূরা ইতিহাসের এক সার্বজনীন সত্যকে তুলে ধরে। যে জাতি ঈমান, নৈতিকতা ও সত্যের মূল্য হারায়, তারা শক্তি ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পতনের দিকে ধাবিত হয়।

সময়ের প্রবাহ তাই কেবল ঘড়ির কাঁটার গতি নয়; এটি মানবজাতির কর্মের সাক্ষ্য বহনকারী এক নীরব বিচারক।

উপসংহার:

সূরা আল‑আসর মানবজীবনের এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক নির্দেশনা। এতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে মানুষের প্রকৃত পুঁজি হলো সময়, আর সেই সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে চারটি গুণ অপরিহার্য―ঈমান, সৎকর্ম, সত্যের আহ্বান এবং ধৈর্য।

এই চারটি গুণের সমন্বয়ই মানুষকে মহাকালের অবিনাশী ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। যে ব্যক্তি সময়কে এই চার নীতির আলোকে পরিচালনা করে, সে শুধু ব্যক্তিগত সফলতাই অর্জন করে না; বরং মানবসভ্যতার ইতিহাসেও স্থায়ী অবদান রেখে যায়।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: 10/03/2026 খিষ্টাব্দ।