মহাবিশ্বের অন্তহীন বিস্ময় ও স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব: সূরা ইউনুসের আলোকচ্ছটা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ১০, ২০২৬, ১১:১২ অপরাহ্ন /
মহাবিশ্বের অন্তহীন বিস্ময় ও স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব: সূরা ইউনুসের আলোকচ্ছটা
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুসের শুরুর দিকের আয়াতগুলোতে (৩-৬ নম্বর আয়াত) মহান আল্লাহ মহাবিশ্ব সৃষ্টি এবং এর সুশৃঙ্খল পরিচালনা সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক সত্যের বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গবেষণার এক বিশাল ক্ষেত্র। পবিত্র কুরআনকে আল্লাহ মানবজাতির জন্য হেদায়েতনামা হিসেবেই শুধু নাজিল করেননি, বরং এটি মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনের এক মহাজাগতিক ইশতেহারও বটে। সূরা ইউনুসের শুরুর আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং মহাকাশের বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করেছেন। এই আয়াতগুলো মানুষকে কেবল পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না, বরং এই নিখিল বিশ্বকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার নির্দেশ দেয়।

১. সৃষ্টিতত্ত্ব এবং ছয় দিনের রহস্য:

সূরা ইউনুসের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি আরশে সমাসীন হন।”

এখানে ‘ছয় দিন’ (সিত্তাতি আইয়াম) বলতে চব্বিশ ঘণ্টার দিন বোঝানো হয়নি; বরং তাফসিরবিদদের মতে, এটি সৃষ্টির ছয়টি বিশাল পর্যায় বা সময়কালকে নির্দেশ করে। আধুনিক বিজ্ঞানও বলে যে, এই মহাবিশ্ব হঠাৎ করে বর্তমান অবস্থায় আসেনি, বরং কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে আজকের এই সুশৃঙ্খল রূপ পেয়েছে। আয়াতের পরবর্তী অংশ—”তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন”—নির্দেশ করে যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর স্রষ্টা একে গুরুত্বহীনভাবে ছেড়ে দেননি; বরং অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে বিশালাকার গ্যালাক্সি পর্যন্ত প্রতিটি বিষয় তাঁর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

২. আলোকবিজ্ঞান ও মহাকাশীয় ক্যালেন্ডার:

৫ নম্বর আয়াতে বিজ্ঞ স্রষ্টা এক অলৌকিক বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রদান করেছেন: তিনিই সূর্যকে প্রখর দীপ্তিময় (জিয়া) করেছেন এবং চন্দ্রকে করেছেন স্নিগ্ধ আলোকময় (নূর)।”

এই আয়াতে সূর্যের জন্য ‘জিয়া’ এবং চন্দ্রের জন্য ‘নূর’ শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাফসির ও ভাষাতত্ত্ব অনুযায়ী, ‘জিয়া’ মানে যার নিজস্ব আলো আছে, আর ‘নূর’ মানে প্রতিফলিত আলো। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের জানিয়েছে যে, সূর্য একটি নক্ষত্র যা নিজ থেকে শক্তি ও আলো উৎপন্ন করে, আর চাঁদ একটি উপগ্রহ যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। দেড় হাজার বছর আগে কুরআনের এই সূক্ষ্ম ভাষাগত পার্থক্য মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপকেই তুলে ধরে।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আজ আমাদের বলছে যে, সূর্য একটি স্বয়ংপ্রভ নক্ষত্র (Luminous body), আর চাঁদ হলো প্রতিফলিত আলোর আধার (Non-luminous body)। কুরআনের এই সূক্ষ্ম শব্দচয়ন—সূর্যের জন্য ‘জিয়া’ এবং চাঁদের জন্য ‘নূর’—আমাদের স্রষ্টার বৈজ্ঞানিক নিপুণতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। একইসাথে চাঁদের কক্ষপথ বা ‘মানজিল’ নির্ধারণের মাধ্যমে মানুষকে সময় ও বছর গণনার এক প্রাকৃতিক পদ্ধতি দান করা হয়েছে।

সময়ের হিসাব ও গাণিতিক শৃঙ্খলা ইঙ্গিত এসেছে ৫ নম্বর আয়াতের শেষাংশে। মহান আল্লাহ বলেন, এবং তার (চন্দ্রের) জন্য মানজিলসমূহ (কক্ষপথ বা পর্যায়) নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার।”

চন্দ্র ও সূর্যের এই নির্ধারিত গতিপথ কেবল মহাকাশীয় সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এটি মানব সভ্যতার জন্য একটি প্রাকৃতিক ক্যালেন্ডার। চাঁদের কলা বৃদ্ধি এবং সূর্যের উদয়-অস্ত আমাদের দিন, মাস ও বছরের হিসাব বুঝতে সাহায্য করে। এই গাণিতিক শৃঙ্খলা প্রমাণ করে যে, বিশ্বজগৎ কোনো বিশৃঙ্খল বিবর্তনের ফল নয়, বরং এটি একটি সুনিপুণ পরিকল্পনার ফসল।

৩. সৃষ্টির সার্থকতা: অসারতার কোনো স্থান নেই

মহাবিশ্বের এই সুশৃঙ্খল ভৌত রূপের পেছনে যে একটি গভীর দার্শনিক সত্য রয়েছে, তা সূরা সোয়াদের ২৭ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে: আমি আকাশ, পৃথিবী ও এ দুইয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীনভাবে (বাতিল) সৃষ্টি করিনি।” এই আয়াতটি আধুনিক ‘কসমোলজিক্যাল ডিজাইন’ বা মহাজাগতিক নকশার এক অনন্য দলিল। নক্ষত্রের বিন্যাস থেকে শুরু করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য—সবই যে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে তৈরি, তা আজ বিজ্ঞানও স্বীকার করে। যদি এই সৃষ্টি কেবল একটি ‘কসমিক অ্যাক্সিডেন্ট’ বা দুর্ঘটনা হতো, তবে এতে এত গাণিতিক নিখুঁততা থাকত না। আল্লাহ পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এই জগতকে অর্থহীন মনে করা সত্যকে অস্বীকার করারই নামান্তর।

৪. মহাজাগতিক শৃঙ্খলায় মানুষের স্থান ও দায়বদ্ধতা:

আকাশ ও পৃথিবীর এই বিশালত্বের মাঝে মানুষের সৃষ্টি কি কেবলই কাকতালীয়? সূরা আল-মুমিনূনের ১১৫-১১৬ নম্বর আয়াতে এক অমোঘ প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়েছে: তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে কেবল অনর্থক (আবসান) সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?” এই আয়াতটি বিজ্ঞানের ভৌত জগত থেকে আমাদের নৈতিক জগতের দিকে নিয়ে যায়। যদি মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা একটি নিয়ম মেনে চলে, তবে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের জীবন কেন নিয়মহীন বা লক্ষ্যহীন হবে? আয়াতের পরবর্তী ঘোষণা—”মহিমান্বিত আল্লাহ, যিনি প্রকৃত মালিক (আল-মালিকুল হাক্ক)”—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একজন সত্য রাজা কখনো উদ্দেশ্যহীন কিছু সৃষ্টি করেন না। মহাবিশ্বের এই শৃঙ্খলাই প্রমাণ করে যে, মানুষের জীবনের প্রতিটি কর্মের একটি হিসাব রয়েছে এবং একদিন তাকে তার স্রষ্টার কাছে ফিরে যেতেই হবে।

৪. দিন ও রাতের পর্যায়ক্রম: গবেষণার আহ্বান

৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই রাত ও দিনের পরিবর্তন এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, তাতে মুত্তাকিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”

পৃথিবীর নিজ অক্ষের ওপর আবর্তন এবং দিন-রাতের এই অবিরাম ধারা কেবল প্রাণের অস্তিত্বের জন্যই জরুরি নয়, বরং এটি বিজ্ঞানের জন্য এক অন্তহীন কৌতূহল। আবহাওয়া পরিবর্তন, ঋতুচক্র এবং পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় দিন ও রাতের ভূমিকা আজ গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয়। যারা স্রষ্টাকে ভয় করে এবং মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করে (মুত্তাকি), তাদের জন্য এই প্রতিটি পরিবর্তনের মাঝে লুকানো রয়েছে অন্তহীন জ্ঞান। পৃথিবী তার কক্ষপথে আবর্তন করছে বলেই আমরা দিন ও রাত পাচ্ছি, যা জীবনের স্পন্দনকে টিকিয়ে রেখেছে। এই ভারসাম্যই স্রষ্টার পরম মমতার নিদর্শন। কুরআন এই প্রতিটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে আমাদের ‘উলুল আলবাব’ বা প্রজ্ঞাবান হওয়ার আহ্বান জানায়।

উপসংহার:

সূরা ইউনুসের এই আয়াতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই বিশাল মহাবিশ্ব একটি বিশাল গবেষণাগার। আকাশ, পৃথিবী, সূর্য ও চন্দ্রের প্রতিটি স্পন্দন মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার স্বাক্ষর বহন করছে। এই নিদর্শনগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা কেবল একজন বিজ্ঞানীর কাজ নয়, বরং প্রতিটি বিশ্বাসীর দায়িত্ব। মহাবিশ্বের এই শৃঙ্খলার গভীরে প্রবেশ করলেই মানুষ তাঁর স্রষ্টাকে আরও বেশি বিনম্রভাবে অনুভব করতে পারে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: //2026 খিষ্টাব্দ।