আল-কুরআনে শক্তির দর্শন ও প্রতিরক্ষা চিন্তা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ৯, ২০২৬, ৬:০৬ অপরাহ্ন /
আল-কুরআনে শক্তির দর্শন ও প্রতিরক্ষা চিন্তা

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


মানবসভ্যতার ইতিহাসে শান্তি রক্ষা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তি ও প্রজ্ঞার সমন্বয় সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনফালের ৬০ নম্বর আয়াত এই নীতিকে এক গভীর ও সর্বকালীন দর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা আনফালের ৬০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:

“তোমরা তাদের মুকাবালা করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি (‘কুওয়াহ’) ও সদাসজ্জিত অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে, যার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে আতঙ্কিত করবে…”।

এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন―তারা যেন শত্রুর মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এখানে কেবল সামরিক শক্তির কথা বলা হয়নি; বরং এটি এমন এক সামগ্রিক প্রস্তুতির শিক্ষা দেয় যেখানে ঈমান, জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং কৌশলগত দক্ষতা একত্রে কাজ করে। ফলে এই আয়াত ইসলামী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনের প্রণেতা মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) এবং অন্যান্য আধুনিক মুফাসসিরগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘কুওয়াহ’ বা ‘শক্তি’ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। এটি কেবল তৎকালীন যুগের তীর-ধনুক বা অশ্ববাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল যুগের জন্য প্রযোজ্য একটি সার্বজনীন নির্দেশনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তৎকালীন প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, “জেনে রেখো, শক্তি হলো নিক্ষিপ্ত অস্ত্র (তীর)।” তবে ‘শক্তি’ শব্দটির ব্যবহার ইঙ্গিত দেয় যে, এটি যুগে যুগে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে বিবর্তনশীল। সপ্তম শতাব্দীতে যা ছিল তীর-ধনুক বা অশ্ববাহিনী, একবিংশ শতাব্দীতে তার রূপ পাল্টেছে।

তাফসীরবিদদের মতে, এখানে কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি; বরং ‘শক্তি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে যাতে এটি যুগে যুগে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। প্রাচীন যুগে শক্তির প্রতীক ছিল তীর-ধনুক, তরবারি এবং অশ্বারোহী বাহিনী। কিন্তু সময়ের প্রবাহে শক্তির রূপ পাল্টেছে। আজকের পৃথিবীতে সেই শক্তির পরিধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আধুনিক সমরাস্ত্র। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সমসাময়িক যুগের শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি ও জ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টা কেবল পার্থিব প্রয়োজন নয়―বরং তা এক অর্থে আল্লাহর নির্দেশ পালনও বটে।

আল-কুরআনের এই আয়াতের আলোকে আধুনিক প্রযুক্তি, কৌশল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রদান করা যায়:

সামরিক প্রযুক্তি ও আধুনিক সরঞ্জাম: আয়াতে ‘অশ্ববাহিনী’র উল্লেখ থাকলেও এর মূল উদ্দেশ্য হলো শত্রুর মোকাবিলায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। বর্তমান যুগে এর ব্যাখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হবে: • আকাশপথ ও মহাকাশ প্রযুক্তি: ড্রোন, ফাইটার জেট, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তি। • নৌ-শক্তি: সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী এবং উন্নত রাডার সিস্টেম। • পারমাণবিক ও সাইবার শক্তি: আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় অংশ এখন সাইবার স্পেসে সংঘটিত হয়। শত্রুর নেটওয়ার্ক অকেজো করে দেওয়া বা সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ‘কুওয়াহ’-র অন্তর্ভুক্ত।

বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সামর্থ্য: কুরআনে বর্ণিত এই ‘শক্তি’ কেবল অস্ত্রের শক্তি নয়; এর একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক মাত্রা রয়েছে। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের ময়দান এখন আর ভৌগোলিক সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন ‘আইডিওলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা আদর্শিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের ময়দান এখন নির্দ্ধিষ্ট ভূখণ্ডেও সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন জ্ঞানের লড়াই, তথ্যের লড়াই এবং ধারণার লড়াইয়েও রূপ নিয়েছে। তাই শিক্ষা, গবেষণা, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং কৌশলগত চিন্তাভাবনা―সবই ইসলামী শক্তির অংশ। ইতিহাসে আমরা এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখি যখন সালমান আল-ফারিসী (রা.) খন্দকের যুদ্ধে পারসিক কৌশল ‘পরিখা খনন’-এর প্রস্তাব দেন। এটি ছিল কেবল একটি সামরিক কৌশল নয়, বরং জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে বাস্তব প্রয়োগে রূপান্তর করার একটি অনন্য উদাহরণ।

তাই মুসলিম বিশ্বের উচ্তি হবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করা। জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা জাতি কখনোই প্রকৃত ‘শক্তি’র অধিকারী হতে পারে না। অপরদিকে বর্তমান যুগে তথ্যই শক্তি। সঠিক তথ্যের প্রচার এবং অপপ্রচারের মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করা এই আয়াতের নির্দেশের একটি আধুনিক রূপ।

কৌশলগত ও প্রশাসনিক দক্ষতা: আয়াতে ‘প্রস্তুত রাখা’র ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতাংশের আরেকটি গভীর দিক হলো প্রতিরোধের দর্শন। এখানে প্রস্তুতির উদ্দেশ্য যুদ্ধ শুরু করা নয়; বরং এমন শক্তি অর্জন করা যাতে শত্রু অন্যায় আগ্রাসনের সাহস না পায়। আধুনিক সামরিক ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধনীতি। অর্থাৎ শক্তি এমনভাবে সংগঠিত হতে হবে যাতে তা শান্তির রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আসলে যুদ্ধের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়, কারণ সম্ভাব্য আগ্রাসী জানে যে তার আক্রমণের মূল্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

কুরআনের এই নির্দেশনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সদাসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত বাহিনী বজায় রাখা। আয়াতে অশ্ববাহিনীর উল্লেখের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে একটি রাষ্ট্রকে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। বিপদ আসার পর তড়িঘড়ি করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কার্যকর হয় না। তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সুসংগঠিত বাহিনী ইসলামী প্রতিরক্ষা নীতির মৌলিক ভিত্তি।

এখানে জাতীয় অর্থনীতির ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামোর পেছনে থাকে শক্তিশালী অর্থনীতি এবং জনগণের অংশগ্রহণ। কুরআন নির্দেশ দিয়েছে যে আল্লাহর পথে ব্যয় করা সম্পদের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। এর অর্থ হলো―জাতির নিরাপত্তা, জ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য সম্পদ ব্যয় করা একটি উচ্চ মর্যাদার কাজ। এটি কেবল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নয়; বরং সমাজের সম্মিলিত অংশগ্রহণের একটি মহান কর্মযজ্ঞ।

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, “যার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে আতঙ্কিত করবে।” এখানে ‘আতঙ্কিত করা’র অর্থ অন্যায় আক্রমণ নয়, বরং এমন এক সক্ষমতা অর্জন করা যাতে কোনো শত্রু মুসলিম উম্মাহর ওপর আক্রমণ করার সাহস না পায়। একে আধুনিক সামরিক পরিভাষায় ‘প্রতিরোধ নীতি’ বলা হয়।

সবশেষে বলা যায়, সূরা আল-আনফালের এই আয়াত মুসলিম উম্মাহকে এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শনের দিকে আহ্বান জানায় যেখানে ঈমান ও কর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞান, বিশ্বাস ও প্রস্তুতি একে অপরকে পরিপূর্ণ করে। একদিকে আল্লাহর সাহায্যের ওপর অটল আস্থা থাকবে, অন্যদিকে মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকা সকল জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৌশল অর্জনের জন্য অবিরাম প্রচেষ্টা চলবে। এই সমন্বয়ই ইসলামের সেই শক্তির দর্শন, যা যুদ্ধের জন্য নয়―বরং ন্যায়, শান্তি এবং মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: 09/03/2026 খিষ্টাব্দ।