
রাতের নিস্তব্ধতায় যখন পৃথিবী নিদ্রিত, তখন মুমিন মানুষের অন্তর জেগে ওঠে এক অদৃশ্য সংলাপে—বান্দা ও রবের নীরব কথোপকথনে। সেই সংলাপের এক মর্মস্পর্শী অনুরণন ধ্বনিত হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা মুজ্জাম্মিলের শেষ আয়াতে। পবিত্র আল-কুরআন এখানে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করেনি; বরং তাকে আলিঙ্গন করেছে দয়ার পরশে।
এই আয়াত যেন এক স্বর্গীয় আশ্বাস—আল্লাহ জানেন মানুষের ক্লান্তি, জানেন তার অসুস্থতা, জানেন তার রুজির সন্ধানে পথচলা, জানেন সংগ্রামের ভার। তাই তিনি ইবাদতকে করেছেন সহজ, আর সহজতার ভেতরেই রেখেছেন গভীরতা। এখানে ধর্ম কোনো শৃঙ্খল নয়; বরং এক সুরেলা আহ্বান—“যতটুকু পারো, ততটুকুই করো; কিন্তু হৃদয়টুকু নিঃস্বার্থ রাখো।”
ইসলামের আধ্যাত্মিক দর্শনে এই সহজীকরণ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কারণ, ঈমান কেবল পরিমাপের বিষয় নয়; এটি অনুভবের বিষয়। একজন মানুষ হয়তো দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল করতে পারে না, কিন্তু তার একটি আন্তরিক সিজদা আকাশ ভেদ করে পৌঁছে যায় রহমতের দরবারে। কুরআনের এই বার্তা মানুষের অন্তরকে ভারমুক্ত করে—ইবাদত হয়ে ওঠে আনন্দ, বাধ্যবাধকতা নয়।
এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে হাদীসের বাণী। সহিহ সহিহ বুখারি-তে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “ধর্ম সহজ; কেউ ধর্মকে কঠিন বানাতে গেলে সে তাতে পরাজিত হবে। তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, সুসংবাদ দাও, নিরাশ করো না।” এই বাণী কেবল উপদেশ নয়; এটি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান। মানুষ যখন ধর্মকে ভালোবাসে, তখন সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নৈতিক হয়; আর যখন ভয় পায়, তখন সে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় আটকে যায়।
হৃদয় দিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায়, পবিত্র আল-কুরআন-এর সূরা আল-মুজ্জাম্মিলের শেষ আয়াতে (৭৩:২০) মহান আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্য সহজীকরণ ও দয়ার বার্তা দিয়েছেন। আয়াতের মূল বক্তব্যের বাংলা অর্থ সংক্ষেপে এমন—
“নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক জানেন যে, আপনি ও আপনার সঙ্গীদের একটি দল রাতের দুই-তৃতীয়াংশ, অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ সময় নামাজে দাঁড়িয়ে থাকেন… আল্লাহ দিন-রাতের পরিমাপ নির্ধারণ করেন। তিনি জানেন যে, তোমরা তা পূর্ণভাবে পালন করতে পারবে না, তাই তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হয়েছেন।
সুতরাং কুরআন থেকে যতটুকু সহজ হয় ততটুকু পাঠ করো। তিনি জানেন, তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হবে, কেউ আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধানে ভ্রমণ করবে, আর কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে থাকবে।
তাই যতটুকু সহজ হয় ততটুকু কুরআন পাঠ করো, নামাজ কায়েম করো, জাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা নিজেদের জন্য যে সৎকর্মই অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও মহাপুরস্কার হিসেবে পাবে। আর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো—নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
এই আয়াতে মূলত তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়— ইবাদতে সহজীকরণ ও ভারসাম্য, নিয়মিত নামাজ-জাকাত ও কুরআন তিলাওয়াত এবং সৎকর্ম ও ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব। অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের সামর্থ্য জানেন; তাই দ্বীন পালনে কঠোরতা নয়, বরং আন্তরিকতা ও ধারাবাহিকতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
কুরআনের এই আয়াতে নামাজ, জাকাত ও কুরআন তিলাওয়াতের নির্দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সূক্ষ্ম আহ্বান—“আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও।” এই ঋণ কোনো পার্থিব দেনা নয়; এটি দয়া, দান, সহমর্মিতা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক। মানুষ যখন অন্যের কষ্ট লাঘব করে, তখন সে আসলে নিজের আত্মাকেই পরিশুদ্ধ করে। এই দান আত্মাকে প্রসারিত করে, হৃদয়কে কোমল করে, আর জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।
সবশেষে আয়াতটি যে দরজাটি খুলে দেয়, সেটি হলো ক্ষমা প্রার্থনার দরজা। ক্ষমা এখানে পরাজয়ের স্বীকারোক্তি নয়; বরং আত্মবিকাশের সূচনা। মানুষ ভুল করবে—এই স্বীকারোক্তিই তাকে মানুষ করে তোলে। আর সেই ভুলের মাঝেই যখন সে বলে “হে আল্লাহ, ক্ষমা করুন,” তখন তার আত্মা নতুন করে জন্ম নেয়।
এভাবেই সূরা মুজ্জাম্মিলের শেষ আয়াত আমাদের শেখায়—ইবাদত মানে কেবল নির্দিষ্ট সময়ের প্রার্থনা নয়; এটি এক অবিরাম অন্তর্জাগরণ। সহজতায় আছে গভীরতা, ধারাবাহিকতায় আছে শক্তি, আর ক্ষমা প্রার্থনায় আছে মুক্তি। যখন মানুষ এই ত্রিবিধ আলোকে জীবনকে সাজায়, তখন তার প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে তিলাওয়াত, প্রতিটি কাজ হয়ে ওঠে দান, আর প্রতিটি নিশ্বাস হয়ে ওঠে এক নীরব দোয়া—যেখানে আত্মা শান্ত হয়, হৃদয় প্রসারিত হয়, এবং জীবন আলোর দিকে ধাবিত হয়।
লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক; সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
01556560126
তারিখ: 18/02/2026
আপনার মতামত লিখুন :