
“তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়;/ সেই ভয়ের টুঁটিই ধরব টিপে, করব তারে লয়।/ মোরা আপনি মরে মরার দেশে আনব বরাভয়,/ মোরা ফাঁসি পরে আনব হাসি মৃত্যু–জয়ের ফল”―এই অগ্নিস্নাত উচ্চারণ কেবল কবিতার পঙ্ক্তি নয়, এটি যুগযুগান্তরের মেরুদণ্ড-সোজা করা শঙ্খধ্বনি। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কলমকে করেছিলেন বজ্র, শব্দকে করেছিলেন অগ্নি, আর চেতনাকে করেছিলেন অভয়বাণী। শোষিতের হাতে এ পঙ্ক্তি অস্ত্র, শোষকের বুকে এ পঙ্ক্তি আতঙ্ক।
বর্তমান সমাজ–বাস্তবতায় যখন ক্ষমতার গর্জন মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করতে উদ্যত হয়, তখন নজরুলের এই বজ্রনিনাদ এক মহৌষধ, এক মহামন্ত্র, এক পুনর্জন্মের আহ্বান।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়―যেখানে শাসকের দণ্ড সেবার হাত ছেড়ে শোষণের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, সেখানেই জন্ম নিয়েছে ‘ভয়’। এই ভয় নিছক ভীতি নয়; এটি আত্মাকে শৃঙ্খলিত করার এক শীতল, সূক্ষ্ম, প্রশাসনিক কৌশল। অথচ এই ভয়ের বিপরীতে যিনি চিরকাল অভয়ের শঙ্খ বাজিয়েছেন, তিনি নজরুল। তাঁর কলম কেবল শব্দ সাজায়নি―সিংহাসনের নিচে ভূকম্পন তুলেছে। আজও যখন ভয়ের সংস্কৃতি ডালপালা মেলতে চায়, তাঁর অমোঘ উচ্চারণ আমাদের শিরদাঁড়াকে হিমালয়ের মতো উন্নত করে তোলে, আমাদের বুকের ভেতর এক অনিবার্য দীপ্তি জ্বেলে দেয়।
ভয়ের টুঁটি চেপে ধরার সংগ্রাম:
প্রশাসনিক যাতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ যখন অধিকার চাইতে গিয়ে রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হয়, তখন নজরুলের কবিতা হয়ে ওঠে শাণিত তরবারি, অগ্নিশলাকা, মুক্তির মন্ত্র। “তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়”―এই পঙ্ক্তিতে লুকিয়ে আছে সত্যের অমর শক্তি। এ শক্তি বাহুর নয়, বিবেকের; এ শক্তি অস্ত্রের নয়, আত্মার। এটি হলো সত্যের শক্তি। নজরুলের সেই ‘বিদ্রোহী’ সত্তা আজও আমাদের কানে ফিসফিস করে বলে না, বরং চিৎকার করে ঘোষণা করে:
“আমি চির–বিদ্রোহী বীর―
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির–উন্নত শির!”
কবির চোখে মূল্যবোধহীন শাসক দমনকে জয় মনে করেন। সেখানে নির্যাতিতের জাগ্রত প্রাণই হয়ে ওঠে ভয়ের বিনাশী অগ্নিদূত। একপর্যায়ে জনগণের বিদ্রোহী প্রাণই সেই ভয়ের বিনাশ ঘটায়। যেটা দেশের মানুষ দেখে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে।
মরার দেশে বরাভয় ও আত্মবিসর্জনের দীপশিখা:
একটি সমাজ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণের ভাষা হারায়, প্রতিবাদের শিখা নিভিয়ে রাখে বুকের গহীনে, তখন সে সমাজ ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক ‘মরার দেশে’―জড়তার বরফে জমাট, ভয়ের কুয়াশায় আবৃত, বিবেকের শ্মশানে নিঃশব্দ। সেই নীরব মৃত্যুভূমিতে প্রাণের স্পন্দন জাগাতে, অন্ধকারের বুক চিরে প্রথম আলোর রেখা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর কণ্ঠ ছিল না কেবল কবিতার উচ্চারণ; তা ছিল বজ্রের অভিঘাত, শৃঙ্খলভাঙা ঝড়ের গর্জন, মৃত আত্মার শিরায় রক্তসঞ্চালনের অগ্নিস্পর্শ।
“মোরা আপনি মরে মরার দেশে আনব বরাভয়”―এই পঙ্ক্তি নিছক সাহসের আহ্বান নয়; এটি আত্মার মুক্তিদ্বার উন্মোচনের মন্ত্র, মানবিকতার পুনর্জাগরণের অগ্নিবীণা। কারার লৌহকপাট তাঁর চোখে ছিল না কেবল লোহা, ছিল ভাঙবার জন্য জন্ম নেওয়া এক প্রতীকী প্রাচীর; শৃঙ্খল ছিল না বন্ধন, ছিল মুক্তির পূর্বঘোষণা। তাঁর কণ্ঠে যখন প্রলয়ের বিষাণ বেজে উঠেছে, তখন ধ্বংসের ছাই থেকেই জেগে উঠেছে সৃষ্টির ফিনিক্সপাখি। নিপীড়নের লৌহমুষ্টি তাঁর শব্দকে স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং প্রতিটি আঘাতেই তাঁর উচ্চারণ হয়েছে আরও দীপ্ত, আরও প্রজ্বলিত―যেন অন্ধকার যত ঘনিয়েছে, ততই তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে দীপশিখা, মৃত্যুর বুকেই লিখেছে জীবনের জয়গান।
ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান
যখন নিষ্ঠুরতা তার সর্বশেষ দাঁত বের করে মানবতার বুকে আঁচড় কাটে, যখন ক্ষমতার রক্তচক্ষু আকাশ ঢেকে ফেলে সূর্যের আলো, তখন মানুষের সামনে খুলে যায় দুই বিপরীত দ্বার―একদিকে দাসত্বের দীর্ঘ অন্ধগলি, অন্যদিকে ত্যাগের দীপ্ত আলোকপথ। এই সন্ধিক্ষণে বিদ্রোহের অগ্নিশিখা হাতে যিনি শিখিয়েছেন হাসিমুখে আত্মবিসর্জনের মহিমা, তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর কণ্ঠে ত্যাগ কোনো বেদনার শোকগাথা নয়, বরং তা বীরের অলঙ্কার, আত্মার বিজয়মালা।
“মোরা ফাঁসি পরে আনব হাসি মৃত্যু–জয়ের ফল”―এই পঙ্ক্তি যেন মৃত্যুর কালো চোখে দীপ্ত সূর্যকিরণ ছুড়ে দেওয়ার দীক্ষা; যেন অন্ধকারের বুকেই আলোর জয়ধ্বনি। ফাঁসির মঞ্চ তাঁর কাছে পরাজয়ের নয়, বরং অমরত্বের সোপান―যেখানে দেহ ঝরে পড়ে, কিন্তু চেতনা ডানা মেলে অনন্তের আকাশে।
যে তরুণ সত্যের পতাকা তুলে দাঁড়ায়, সে জানে সাময়িক অপবাদ কেবল ধুলিকণার মতো; মর্যাদার সূর্যকে তা ঢাকতে পারে না। রক্তচক্ষুর দাপট ক্ষণস্থায়ী, অথচ সত্যের দীপ্তি চিরস্থায়ী। মৃত্যুকে অতিক্রম করেই জীবন হয়ে ওঠে মহিমান্বিত মহাকাব্য, আর ভয়কে পদদলিত করেই মানুষ আবিষ্কার করে তার প্রকৃত সত্তা―অমল, অদম্য, অমর।
সাম্য ও ইনসাফের উদীয়মান প্রভাত
বিদ্রোহ―শব্দটি অনেকের কানে ধ্বংসের বজ্রধ্বনি হয়ে বাজে; অথচ বিদ্রোহের অন্তঃস্থলে যে নির্মাণের নীরব নকশা লুকিয়ে থাকে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর বিদ্রোহ ছিল না কেবল ভাঙার উল্লাস, ছিল গড়ার মহাযজ্ঞ―এক ন্যায়ভিত্তিক, সাম্যভিত্তিক, মানবিক সমাজের স্থপতির হাতুড়ির শব্দ। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অট্টালিকার প্রতিটি ইটে লেগে থাকে শ্রমিকের ঘামের নোনাজল, প্রতিটি প্রাচীরে জমে থাকে মানুষের রক্তের লাল স্মৃতি। যে প্রাসাদকে আমরা সভ্যতার চূড়া বলে গর্ব করি, তার ভিত্তিতেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য নিঃশব্দ আর্তনাদ।
তাঁর কণ্ঠে ভেসে আসে এক শুভপ্রভাতের অগ্রগান―যেখানে শাসন নয়, সেবাই হবে রাষ্ট্রের প্রাণ; ভয় নয়, জয়ই হবে মানুষের প্রেরণা। তাঁর স্বপ্নের সমাজে ক্ষমতা মাথা নত করবে মানবতার দরবারে, মানবতা নয় ক্ষমতার দ্বারে দ্বারে। প্রশাসন সেখানে হবে আশ্রয়ের বৃক্ষ, আতঙ্কের ছায়া নয়; হবে ন্যায়ের দীপশিখা, ভয়ের অন্ধকার নয়।
এই প্রভাত কেবল সূর্যের উদয় নয়―এ এক বিবেকের জাগরণ, এক নৈতিক আলোকোন্মেষ, যেখানে মানুষের অধিকার হবে বাতাসের মতো স্বাভাবিক, আর ইনসাফ হবে আকাশের মতো উন্মুক্ত।
উপসংহার : বজ্র থেকে প্রদীপ
নজরুল কোনো ইতিহাসবন্দি নাম নন, কোনো জীর্ণ পৃষ্ঠার বিবর্ণ অক্ষর নন; তিনি প্রতিটি প্রতিবাদের স্লোগানে জেগে থাকা স্পন্দন, প্রতিটি সাহসী উচ্চারণের দীপ্ত শিখা, প্রতিটি ন্যায়ের দাবির অমর অনুরণন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আসলে এক অনির্বাণ চেতনা―যিনি সময়ের দেয়াল ভেদ করে আজও মানুষের বুকের ভেতর বজ্র হয়ে গর্জে ওঠেন, আবার প্রদীপ হয়ে আলোক ছড়ান।
ভয় যখন কণ্ঠরোধ করে, তাঁর কবিতা তখন ফুসফুসে বাতাস ঢুকিয়ে দেয়; নিস্তব্ধ বুকের ভেতর হঠাৎই জ্বলে ওঠে এক অদৃশ্য অগ্নিশিখা। মৃত্যু যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তাঁর শব্দ তখন জীবনের কপালে অমরতার তিলক এঁকে দেয়। যদি আমরা তাঁর বজ্রনিনাদ হৃদয়ের গভীরে ধারণ করতে পারি, তবে ভয়ের প্রাসাদ নিজ ভারেই ভেঙে পড়বে, অন্যায়ের প্রাচীর ধুলো হয়ে উড়ে যাবে দিগন্তে।
মৃত্যু–জয়ের ফল তখনই আমাদের মুঠোয় ধরা দেবে―যেদিন আমরা হাসিমুখে সত্যের পাশে দাঁড়াতে শিখব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলতে শিখব, এবং ভয়ের টুঁটি চেপে ধরার দুর্বার সাহস অর্জন করব। সেই দিন বিদ্রোহ আর আগুন হয়ে জ্বলবে না; সে পরিণত হবে প্রভাতের কোমল আলোয়। আকাশ–বাতাসে আর উৎপীড়িতের ক্রন্দনধ্বনি ভাসবে না; বরং ধ্বনিত হবে মুক্ত মানুষের অমর জয়গান―যেখানে বজ্রের গর্জনই শেষ পর্যন্ত প্রদীপের আলো হয়ে মানবতার পথ দেখাবে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
আপনার মতামত লিখুন :