
সংবাদপত্র শুধুমাত্র কাগজে ছাপা অক্ষর নয়—এটি সময়ের আয়না, সমাজের স্পন্দন, ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। একটি আঞ্চলিক দৈনিক যখন চার দশকের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে নতুন বর্ষে পদার্পণ করে, তখন তার বয়স কেবল সংখ্যায় বাড়ে না; বেড়ে ওঠে তার দায়, তার অভিজ্ঞতা, তার সামাজিক উত্তরাধিকার। চট্টগ্রামের জনজীবনে দৈনিক পূর্বকোণ সেই অর্থে এক চলমান দলিল—যেখানে শহরের জাগরণ, পাহাড়ের নিস্তব্ধতা, বন্দরের কোলাহল আর মানুষের নিত্যদিনের সুখ-দুঃখ এক সুতোয় গাঁথা। সংবাদপত্রের পথচলা যদি নৈতিকতার মশাল হাতে হয়, তবে জাতির পথ আলোকিত হয়; আর যদি সে বিচ্যুত হয়, তবে সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায়। পূর্বকোণ চার দশক ধরে সেই আলোর দায় বহন করে চলেছে এক নিরবচ্ছিন্ন সততায়।
স্মৃতির আঙিনায় পূর্বকোণ ও আলীকদম:
এই পত্রিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার জীবনের এক আলোকিত ঋতু। বান্দরবানের দুর্গম আলীকদমের পাহাড়ি পথ, ঝিরির স্বচ্ছ সুর, কুয়াশা ভেজা ভোর, সীমান্তঘেঁষা নিস্তব্ধ গ্রাম—সবই যেন আমার সংবাদজীবনের নীরব বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিটি খবর ছিল এক একটি যাত্রা, প্রতিটি প্রতিবেদন এক একটি দায়বদ্ধতার স্বাক্ষর। ২০১৫ থেকে ২০২২ অবধি পূর্বকোণে আলীকদম উপজেলার নিবস্ব সংবাদদাতা হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। পূর্বকোণের মফস্বল ডেস্কের সঙ্গে আলাপ আমাকে শিখিয়েছে—সংবাদ শুধু তথ্যের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস বহনের এক সূক্ষ্ম শিল্প, এক নৈতিক সাধনা।
তবে এই সম্পর্কের সূচনা আরও আগে। ১৯৯৭ সালে, ছাত্রজীবনের সরল দিনগুলোতে, পার্বত্য জনপদ আলীকদমেই মাঠ সাংবাদিকতার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তখনই অনিয়মিত পাঠক হিসেবে পত্রিকাটির সঙ্গে এক নীরব সখ্য গড়ে ওঠে। ভোরের আলোয় চায়ের কাপের পাশে ছড়িয়ে থাকা পত্রিকার পাতাগুলো ছিল আমার কাছে নতুন পৃথিবীর জানালা। সাংবাদিকতার উষালগ্ন থেকেই বিভিন্ন দৈনিকের প্রতি ছিল এক অদম্য আকর্ষণ—অক্ষরের ভেতর মানুষ খোঁজার এক অদৃশ্য নেশা। সেই নেশার ভিড়েও এই পত্রিকাটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আপন, পরিচিত, প্রিয়।
আজ ফিরে তাকালে মনে হয়—এসব কেবল স্মৃতি নয়; এগুলো সময়ের বুকের ভাঁজে রাখা কৃতজ্ঞতার শুকনো ফুল। যার গন্ধ এখনো মৃদু হয়ে ভেসে আসে, পাহাড়ি বাতাসের মতো নীরব অথচ গভীর।
প্রতিষ্ঠা, আদর্শ ও কর্তৃপক্ষের বলিষ্ঠ ভূমিকা:
একটি সংবাদপত্রের শক্তি কেবল তার প্রেসের গর্জন বা পৃষ্ঠার সংখ্যায় নয়; তার প্রকৃত মেরুদণ্ড গড়ে ওঠে নীতি, সিদ্ধান্ত এবং নৈতিক সাহসে। ১৯৮৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির সেই সূচনা ছিল যেন ইতিহাসের মাটিতে একটি বীজরোপণ—যা সময়ের স্নেহে আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন, মানবিক রাষ্ট্রের প্রত্যয়—এসব কেবল শব্দের অলংকার হয়ে থাকেনি; বরং ধারাবাহিক অবস্থান ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ভেতর দিয়ে জীবন্ত রূপ পেয়েছে। ক্ষমতার রক্তচক্ষু কিংবা জনপ্রিয়তার মায়াজালে আবদ্ধ না হয়ে বস্তুনিষ্ঠতার যে পথ তারা বেছে নিয়েছে, তা নিঃশব্দ অথচ গভীর এক বিপ্লবের নাম।
সংকটের উত্তাল মুহূর্তে ঝুঁকি নিয়ে সত্য উচ্চারণ করাই সংবাদপত্রের প্রকৃত পরিচয়—এই সত্যকে তারা বারবার প্রমাণ করেছে কলমের দৃঢ়তায় ও সিদ্ধান্তের সততায়। তাদের ভাষ্যে ছিল দায়বোধ, তাদের অবস্থানে ছিল নৈতিক সাহসের উজ্জ্বল ছাপ। সেই সাথে দেশমাতৃকার প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার এই ধারাবাহিকতা যেন অবিচল থাকে—এটাই প্রত্যাশা। পাশাপাশি দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন, তাদের ইসলামী চেতনা ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা ধারণ করে সাংবাদিকতার রথ এগিয়ে চলুক—এই আশাবাদও সমানভাবে জাগ্রত। কারণ সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতা—এই তিনের সমন্বয়েই একটি গণমাধ্যম হয়ে ওঠে কেবল সংবাদবাহক নয়, বরং জাতির বিবেক।
সাফল্য ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য:
সাফল্য ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কেবল সংখ্যার উত্থানে নয়, পাঠকের অটুট আস্থায় পরিমাপিত হয়। পেশাদারিত্বের ধারাবাহিকতা, প্রযুক্তির সঙ্গে সাহসী অভিযোজন এবং নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক তৈরির প্রতিশ্রুতি—এই ত্রয়ীই একটি সংবাদমাধ্যমকে সময়ের ভেতর জীবন্ত রাখে। দৈনিক পূর্বকোণ–এর চল্লিশোর্ধ্ব বয়স তাই ক্লান্তির নয়, বরং আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেকে আরও শাণিত করার পরিণত প্রজ্ঞা। তারা ভবিষ্যৎকে দেখে ভয় নয়, প্রস্তুতির চোখে; দ্বিধা নয়, দৃঢ়তার ভরসায়। কর্তৃপক্ষের সুদূরপ্রসারী সদিচ্ছা, নৈতিক অবস্থান ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব সত্যিই সাধুবাদযোগ্য—কারণ এই মানসিকতাই একটি প্রতিষ্ঠানকে কেবল টিকিয়ে রাখে না, বরং সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণাও জোগায়।
শেষকথা:
একটি সংবাদপত্রের জন্মদিন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দায়বদ্ধতার পুনরুচ্চারণ। আমার প্রত্যাশা—দৈনিক পূর্বকোণ চিরকাল গণমানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে থাকুক। পাহাড় ও সমতলের মানুষের হাসি-কান্না, সমস্যা-সম্ভাবনা, বন্দরনগরীর উচ্ছ্বাস আর প্রান্তিক জনপদের নীরব বেদনা—সবকিছুর বিশ্বস্ত ভাষ্য হয়ে সে এগিয়ে যাক আরও বহুদূর। ন্যায়ের নিশান উঁচু থাকুক, সত্যের প্রতি আনুগত্য অটুট থাকুক—তবেই সংবাদপত্র কেবল পৃষ্ঠা নয়, জাতির বিবেক হয়ে বেঁচে থাকে।
এই প্রত্যাশার সঙ্গে একটি আন্তরিক আশাবাদও যুক্ত থাকুক—পাহাড়ের মানুষের জীবন, সংগ্রাম, সম্ভাবনা ও স্বপ্ন নিয়ে আগামী দিনে আরও বেশি মনোযোগী হোক পূর্বকোণ। পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি উপজেলায় নিজস্ব প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় কণ্ঠস্বরকে আরও জোরালো ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিক। তবেই পাহাড়ের মানুষ নিজেদের কথা নিজেদের ভাষায় দেখতে পাবে জাতীয় পরিসরে, আর পূর্বকোণ হয়ে উঠবে সত্যিকারের সর্বজনের সংবাদপত্র।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
আপনার মতামত লিখুন :