শিখার আলোতে চিন্তার স্বাধীনতা: বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের এক শতাব্দী


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ১১, ২০২৬, ৬:৩৮ পূর্বাহ্ন /
শিখার আলোতে চিন্তার স্বাধীনতা: বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের এক শতাব্দী


।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


বাঙালি মুসলমানের সমাজ ও চিন্তার ইতিহাসে ১৯২৬ সাল এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। সে বছরের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের (বর্তমানে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডায় জন্ম নিয়েছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে অমর হয়ে থাকে। এই আন্দোলনের মুখপত্র ‘শিখা’ পত্রিকার আলোতে বাঙালি মুসলমান সমাজ প্রথম শিখতে পেরেছিল আড়ষ্ট বুদ্ধিকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সাহস।

১. স্লোগান ও মূলদর্শন: জ্ঞান, বুদ্ধি ও মুক্তি

‘শিখা’ পত্রিকার প্রচ্ছদে মুদ্রিত সেই বিখ্যাত স্লোগানটিই ছিল এই আন্দোলনের মূল প্রাণভোমরা— জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব”। এই দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল যুক্তিবিমুখতা ও অন্ধত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মানুষের বিবেককে স্বাধীন করা। আন্দোলনটি তৎকালীন সমাজকে এই বার্তা দিয়েছিল যে, কেবল পারলৌকিক মোহ বা কুসংস্কার দ্বারা আক্রান্ত না হয়ে সবকিছুকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করতে হবে।

২. চিন্তার স্বাধীনতার কারিগররা

এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন একদল অকুতোভয় বুদ্ধিজীবী। কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মনীষীরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে চিন্তার স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

  • কাজী আব্দুল ওদুদ মনে করতেন, মুসলমানরা মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় আছে এবং এই ‘সম্মোহন’ থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যমই হলো বুদ্ধির মুক্তি।
  • আবুল হোসেন তাঁর ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তৃত্বের নামে চলা শোষণের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী অবস্থানের কথা বলেন।
  • কাজী আনোয়ারুল কাদির স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বুদ্ধির বিকাশ ছাড়া ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করাও অসম্ভব।

৩. অন্ধত্ব ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই

তৎকালীন মুসলিম সমাজে রক্ষণশীলতা ও পশ্চাৎপদ মানসিকতা যখন প্রবল, তখন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সারথিরা মানুষের ইহজাগতিক কল্যাণ ও মুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, অতীতের সব অন্ধকারকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তাঁরা রেনেসাঁ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি মানবিক, যুক্তিভিত্তিক ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

৪. উত্তরাধিকার: ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ

‘শিখা’র জ্বালানো সেই চিন্তার আলোকবর্তিকা কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যদিও এই সংগঠনটি মাত্র এক দশকের মতো সক্রিয় ছিল (১৯২৬-৩৬), কিন্তু এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এই আন্দোলনের ফলেই বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একটি অসাম্প্রদায়িক এবং ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয়। যা পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটানোর মূল তাত্ত্বিক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

৫. বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা

আজ শতবর্ষ পরে দাঁড়িয়েও ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ সমভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সমাজের উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে ‘শিখা’র সেই যুক্তিবাদী ও মানবিক দর্শনের কোনো বিকল্প নেই। একটি উদার ও প্রগতিশীল সমাজ গঠন করতে হলে আজও আমাদের বুদ্ধির আড়ষ্টতা কাটিয়ে চিন্তার স্বাধীনতার পথেই হাঁটতে হবে।

উপসংহার: বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কেবল একটি সাহিত্যিক আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল বাঙালি মুসলমানের মানসিক দাসত্ব ভাঙার এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই। ‘শিখা’ পত্রিকার সেই আলো আজও আমাদের শিখিয়ে যায়—মুক্তি পেতে হলে সবার আগে নিজের মেধাকে প্রশ্নহীন বশ্যতা থেকে মুক্ত করতে হবে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরাবান পার্বত্য জেলা।