অসথু ত্রিপুরা নিজে নিরক্ষর, তবু শিক্ষার আলোকবর্তিকা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৩০, ২০২৬, ৬:২৩ অপরাহ্ন /
অসথু ত্রিপুরা নিজে নিরক্ষর, তবু শিক্ষার আলোকবর্তিকা

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

বাংলাদেশের প্রান্তিক পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার ইতিহাস খুঁজতে গেলে অনেক সময় দেখা যায়—রাষ্ট্র পৌঁছানোর আগেই পৌঁছে গেছেন কিছু নিরক্ষর মানুষ। তাঁরা পাঠ্যবই জানতেন না, কিন্তু ভবিষ্যৎ পড়তে জানতেন। আলীকদম উপজেলার আমতলী এলাকার অসথু ত্রিপুরা ছিলেন তেমনই একজন মানুষ—নিজে নিরক্ষর হয়েও যিনি একটি শিক্ষিত প্রজন্মের ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন।

১৯১৩ সালের ১৩ মে, থানচি উপজেলার কালা কারবারি পাড়া (বলি বাজার) এলাকায় জন্ম নেওয়া অসথু ত্রিপুরা বড় হয়েছেন চরম দারিদ্র্যের ভেতর দিয়ে। পিতা পাঁদিয়া ত্রিপুরা ও মাতা নসরুং ত্রিপুরা তাঁর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেননি। জুম চাষ ও কৃষিকাজ ছিল জীবিকার একমাত্র ভরসা। কিন্তু অভাব, নিরক্ষরতা কিংবা দুর্গম পাহাড়—কোনোটাই তাঁর মানবিক বোধ ও নেতৃত্বগুণকে দমাতে পারেনি।

পাকিস্তান আমলে, ১৯৬৮ সালে পারিবারিক প্রয়োজনে তিনি আলীকদমে চলে আসেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেয় আরও কয়েকটি ত্রিপুরা পরিবার। তখনকার বৃহত্তর আলীকদম ইউনিয়নের আমতলী এলাকায় তিনি নিজ নামে একটি পাড়া গড়ে তোলেন—আজকের অসথু ত্রিপুরা পাড়া। সময়টা ছিল এমন, যখন পুরো আলীকদম উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল মাত্র ১৪টি। অথচ আয়তনের দিক দিয়ে এটি বাংলাদেশের দশম বৃহত্তম উপজেলা। এই বিশাল ভূখণ্ডের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা ছিল প্রায় অনুপস্থিত।

এই বাস্তবতায় অসথু ত্রিপুরা বুঝেছিলেন—শিক্ষা না থাকলে এই প্রজন্মও তাঁর মতোই অন্ধকারে রয়ে যাবে। নিজে অক্ষরজ্ঞানহীন হয়েও পরিণত বয়সে এসে তিনি শিক্ষার গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি গ্রামের মানুষের সঙ্গে পরামর্শ শুরু করেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য। অধিকাংশ মানুষই তখন নিরক্ষর, তবু তাঁর ভাবনাকে সমর্থন করেছিলেন।

১৯৯২ সালে তিনি নিজের নামে রেকর্ডকৃত জমি থেকে ৪০ শতক জমি দান করেন বিদ্যালয়ের জন্য। শুধু জমি দানেই থেমে থাকেননি—বাঁশ কেটে, বন থেকে কাঠ এনে, নিজের কাঁধে বহন করে, নিজের উপার্জনের টাকায় টিন কিনে, নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন একটি ছনের ছাউনি দেওয়া স্কুলঘর। দিন নেই, রাত নেই—রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তিনি তৈরি করেছিলেন অসথু ত্রিপুরা পাড়া কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়

এই বিদ্যালয়ই ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হয়। আজ এটি পরিচিত অসথু ত্রিপুরা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে—পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট আধুনিক ভবন দাঁড়িয়ে আছে তাঁর দানকৃত জমিতেই। যে মানুষটি নিজে কখনো স্কুলে পড়তে পারেননি, তাঁর ঘাম আর শ্রমে গড়া এই বিদ্যালয় আজ শত শত শিশুর স্বপ্নের ঠিকানা।

অসথু ত্রিপুরা ছিলেন ধর্মানুরাগী ও সমাজসেবী। ১৯৭৫ সালে তিনি নিজ পাড়ার ভেতরে একটি গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে সাধু পিতর গির্জা নামে পরিচিত হয়। বিদ্যালয় ও গির্জা—এই দুটি প্রতিষ্ঠানই ছিল তাঁর কাছে সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, তিনি ছিলেন ভদ্র, নম্র, নীতিবান ও সহানুভূতিশীল নেতা। স্কুলের ঘণ্টা বাজলেই শিশুদের স্কুলে পাঠাতে তিনি নিজে তাগাদা দিতেন, প্রয়োজনে কঠোরও হতেন—কারণ তিনি জানতেন, শিক্ষাই মুক্তির পথ।

সমাজ গঠনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি “আদর্শ পাড়া প্রতিষ্ঠাতা” সম্মাননায় ভূষিত হন এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি, ১০৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে এই পাহাড়ি জনপদে সৃষ্টি হয় এক গভীর শূন্যতা।

আজ যখন আমরা পাহাড়ে শিক্ষার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলি, তখন অসথু ত্রিপুরার মতো মানুষের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিদ্যালয় শুধু ইট-সিমেন্টের কাঠামো নয়, এটি একেকটি স্বপ্নের আশ্রয়। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার পাশাপাশি এমন নিরক্ষর অথচ দূরদর্শী মানুষদের উদ্যোগই এ দেশের শিক্ষার ভিত্তিকে শক্ত করেছে।

নিজে নিরক্ষর হয়েও যিনি হাজারো শিশুর জন্য আলোর পাঠশালা তৈরি করে গেছেন—অসথু ত্রিপুরা আমাদের শেখান, শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা হলো ভবিষ্যতের দায় স্বীকার করার সাহস।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব।