নিরাশার জবান ও ক্ষমার রাজনীতি: সত্য বনাম কল্যাণের দ্বন্দ্ব


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৯, ২০২৬, ৫:২৭ অপরাহ্ন /
নিরাশার জবান ও ক্ষমার রাজনীতি: সত্য বনাম কল্যাণের দ্বন্দ্ব
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

শে্খ সা’দীর ‘গুলিস্তাঁ’য় একটি গল্প রয়েছে। এই গল্পে মানবমনস্তত্ত্ব, নৈতিকতা এবং রাজনীতির গভীর পাঠ রয়েছে। গল্পটিকে সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত ব্যাখ্যামূলক রূপক–নিবন্ধ হিসেবে সাজানো যায়। হযরত শেখ সা’দীর গল্পটি এই-

‘এক বাদশাহের দরবারে একদিন মৃত্যুর রায় ঘোষিত হলো। বন্দী অসহায় ও একা। সে জানে, এই দরবার থেকেই তাকে নিয়ে যাওয়া হবে অন্ধকারের শেষ দরজায়। জীবনের সব আশা যখন নিভে যায়, তখন মানুষের ভেতরের ভয়ও মরে যায়। আর ভয় মারা গেলে, জবান লম্বা হয়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই বন্দী মানুষটিও তাই আর কিছু লুকোল না। নিজের মাতৃভাষায়, হৃদয়ের সব জমে থাকা তিক্ততা উগরে বাদশাহকে গালি দিল, অশ্লীল ভাষায় আঘাত করল। কারণ সে জানত, হারানোর মতো তার আর কিছু নেই। এই গল্প নিয়ে শেখ সা’দী বলেন— মানুষ যখন নিরাশ হয়ে যায়, তখন পরাজিত বিড়ালের মতো হয়— জীবন বাঁচাতে কুকুরের দিকেও ঝাঁপিয়ে পড়ে। পালাবার পথ না পেলে ধারালো তলোয়ারের ফলাও হাতে ধরে— হাত কেটে যাওয়ার ভয় তখন আর কাজ করে না।

শে্খ সা’দীর গল্পের সেই বন্দী নিয়েই আজকের এই নিবন্ধ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বন্দী লোকটি রাজকীয় আদবকেতার তোয়াক্কা করলো না। তার জবান হয়ে ওঠেছিল এক মরণজয়ী অস্ত্র। জীবনের মায়া ত্যাগ করা এই বন্দীর কাছে মনে হলো গালি আর অশ্লীলতা তখন তার আত্মরক্ষার শেষ বর্ম।

ভদ্রতা ও নিরাশার মনস্তত্ত্ব:

মানুষ যখন তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, যখন তার হারাবার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, তখন সে তার মার্জিত আচরণের খোলসটি ছুড়ে ফেলে দেয়। আমরা যাকে ‘ভদ্রতা’ বলি, তা আসলে এক ধরণের সামাজিক পুঁজি—যা আগামীর এক টুকরো ‘আশা’ থেকে জন্ম নেয়। যেখানে কোনো আগামী নেই, যেখানে কোনো সকালের সূর্য ওঠার সম্ভাবনা নেই, সেখানে সৌজন্যের প্রদীপও নিভে যায়।

শে্খ সা’দীর গল্পের সেই বন্দী মানুষটি এই চরম নিরাশারই এক মূর্ত প্রতীক। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে আর শব্দের মারপ্যাঁচ বা রাজকীয় আদবকেতার তোয়াক্কা করে না। তার জবান তখন কোনো ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং হয়ে ওঠে এক মরণজয়ী অস্ত্র। জীবনের মায়া ত্যাগ করা মানুষের কাছে গালি আর অশ্লীলতা তখন আত্মরক্ষার শেষ বর্ম। কারণ, কাটা হাতের চেয়েও মৃত্যু যখন কাছে এসে দাঁড়ায়, তখন তলোয়ারের ধারও তার কাছে তুচ্ছ হয়ে পড়ে।

রাজার দরবার ও ভাষার রাজনীতি:

এই গল্পের আসল নাটকীয়তা বন্দীর গালিতে নয়, বরং বাদশাহর দরবারের ভাষার রাজনীতিতে। দরবার মানে তোষামোদীর কাছে ক্ষমতার আদান-প্রদানের খেলা। কিন্তু দরবার হওয়ার কথা সত্যকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ব্যাখ্যা করার জায়গা। যখন বাদশাহ মন্ত্রীর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, “বন্দী লোকটি কী বলছে?”, তখন আসলে তিনি শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থ জানতে চাননি; তিনি জানতে চেয়েছিলেন সেই মুহূর্তের পরিস্থিতির একটি রাজনৈতিক ও মানবিক ব্যাখ্যা। তখন প্রথম মন্ত্রী মাথা নত করে বললেন, “জাহাপানা, সে বলছে— ‘যারা রাগ সংবরণ করে, মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাআলা তাদের ভালোবাসেন।’ এই কথাটা ছিল কুরআনের বাণী, কিন্তু বন্দীর মুখে বলা কথা নয়। তবুও— বাদশাহর কঠিন বুকে হঠাৎ নরম কিছু নড়ে উঠল। হৃদয়ের কোথাও যেন মমতার আলো জ্বলে উঠল। তিনি হত্যার আদেশ স্থগিত করলেন।

কিন্তু দরবারে আরেক মন্ত্রী ছিল—প্রথমজনের চিরবিরোধী। দ্বিতীয় মন্ত্রী এগিয়ে এসে বললেন, “জাহাপানা! বাদশাহর সামনে মিথ্যা বলা কোনো মন্ত্রীর কাজ হতে পারে না। এই লোকটি তো আপনাকে গালি দিয়েছে, অশ্লীল ভাষায় অপমান করেছে। আর উনি বলছেন, সে নাকি আপনার প্রশংসা করছে!”

বাদশাহ এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন। চোখে ছিল রাজকীয় দৃঢ়তা, কণ্ঠে ছিল প্রজ্ঞার ভার। তিনি বললেন— “তোমার বলা সত্য আমার কাছে ততটা প্রিয় নয়, যতটা প্রিয় সেই মিথ্যা— কারণ ওই মিথ্যার ভেতরে ছিল কল্যাণের ইচ্ছা। আর তোমার সত্যের ভিত ছিল ফেতনার ইট দিয়ে গাঁথা।” তারপর রাজা এক চিরন্তন সত্য উচ্চারণ করলেন— “যে মিথ্যা কল্যাণ আনে, তা সেই সত্যের চেয়ে উত্তম যা মানুষের মধ্যে বিভেদ আর রক্তক্ষরণ ঘটায়।”

দরবার নীরব হয়ে গেল। একজন বন্দী বেঁচে গেল। এই গল্পে দেখা গেলো রাজ দরবারের দুই ধরণের চরিত্র—যাঁদের আমরা আজও আমাদের সমাজে এবং রাজনীতিতে দেখতে পাই। প্রথম মন্ত্রী সেই মুহূর্তে সত্য বলেননি, কিন্তু কল্যাণ বলেছেন। তিনি বন্দীর গালিকে অনুবাদ করেছেন ক্ষমার ভাষায়। তিনি জানতেন, সব সত্য বলা যায় না, আর সব মিথ্যা নিন্দনীয়ও নয়। কিছু মিথ্যা আছে, যা জীবন বাঁচায়—আর কিছু সত্য আছে, যা রক্ত চায়। এই গল্পে দ্বিতীয় মন্ত্রী এসে দাঁড়ায় নৈতিকতার খড়্গ হাতে। সে সত্য বলে—নগ্ন, নির্মম, নির্দয় সত্য। সে মনে করে, সত্য মানেই ন্যায্যতা। কিন্তু সে বোঝে না, সব সত্য ন্যায়ের পোশাক পরে আসে না; কিছু সত্য আসে ফেতনার ছুরি নিয়ে।

১. প্রথম মন্ত্রী (কল্যাণের রূপকার): তিনি সত্যকে গোপন করেছেন, কিন্তু মানবতাকে রক্ষা করেছেন। তিনি বন্দীর বিষাক্ত গালিকে অনুবাদের মাধ্যমে ‘ক্ষমার ভাষায়’ রূপান্তর করেছেন। তিনি জানতেন, যে সত্য রক্তপাত ঘটায় তার চেয়ে সেই মিথ্যা অনেক বেশি পবিত্র, যা একটি জীবন বাঁচায়।

২. দ্বিতীয় মন্ত্রী (নিষ্ঠুর সত্যবাদী): তিনি সত্যের ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু সেই সত্যের নিচে ছিল ধ্বংসের বীজ। তিনি মনে করেছিলেন নগ্ন সত্য প্রকাশ করাই বুঝি একমাত্র ন্যায্যতা। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন—সব সত্য ন্যায়ের পোশাক পরে আসে না; কিছু সত্য আসে ফেতনার ছুরি নিয়ে।

সত্য যখন অনর্থের কারণ:

বাদশাহ যখন দ্বিতীয় মন্ত্রীর সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে প্রথম মন্ত্রীর ‘কল্যাণকামী মিথ্যা’কে গ্রহণ করলেন, তখন তিনি ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ও মানবিক দর্শনটি উচ্চারণ করলেন: “কল্যাণের উদ্দেশ্যে বলা মিথ্যা আমার কাছে প্রিয়, ফেতনার ভিতের উপর দাঁড়ানো সত্য নয়।” এই বাক্যটি প্রমাণ করে যে, নৈতিকতা কোনো যান্ত্রিক সূত্র নয়। এটি পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং ফলাফলের এক জীবন্ত সমন্বয়। কোনো সত্য যদি শান্তি নষ্ট করে এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তবে সেই সত্যের চেয়ে শান্তির জন্য বলা মিথ্যা অনেক বেশি অর্থবহ।

সমকালীন প্রেক্ষাপট: সত্য যখন ভাঙনের হাতিয়ার

আজকের পৃথিবীতেও আমরা সেই একই দরবারী রাজনীতির শিকার। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা একটি মিথ্যা বয়ানকে নিয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি যে রুদ্ররোষে ঘটনাটি ঘটালেন তাতে ছিলো না ক্ষমাসুন্দর মানবিকতা। ছিলো না নৈতিকতা এবং দরবারি দৃষ্টিভঙ্গির গভীর পাঠ। বর্তমান যুগেও ‘সত্যের দোহাই’ দিয়ে ঘৃণা ছড়ানো হয়, মানুষের সম্পর্কের আগুনে ঘি ঢালা হয়। যারা সত্যের নামে বিভেদ তৈরি করে, তারা আসলে দ্বিতীয় মন্ত্রীর উত্তরসূরি। অন্যদিকে, যারা সমাজকে রক্ষা করতে, সম্পর্ক বাঁচাতে বা মানুষকে শান্ত রাখতে শব্দকে কিছুটা নমনীয় বা বাঁকিয়ে নেন, তাদের সমাজ প্রায়ই ‘মিথ্যাবাদী’ বলে দেগে দেয়।

শে্খ সা’দীর এই গল্প আমাদের শেখায় যে: সব সৎ মানুষ প্রকৃত অর্থে ন্যায়বান নয়। সব ন্যায়বান মানুষ সবসময় কঠোর সত্যবাদী হয় না। মানুষ বাঁচানোই হলো জগতের সবচেয়ে বড় সত্য।

অথচ দু’দিনের এই দুনিয়ার জীবনের শেষ বিচারে, মানবিকতাই হলো শ্রেষ্ঠ রাজনীতি। যেখানে মানুষের প্রাণ ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে, সেখানে যান্ত্রিক সত্যের চেয়ে মমত্ববোধের ওজন অনেক বেশি। নিরাশার জবানকে যখন ক্ষমার রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করা হয়, তখনই কেবল পৃথিবী বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ২৯.০১.২০২৬