ইতিহাস ও স্মৃতির সংলাপে মারমা সমাজ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৪, ২০২৬, ৪:০৫ পূর্বাহ্ন /
ইতিহাস ও স্মৃতির সংলাপে মারমা সমাজ

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস লিখতে গেলে পাহাড়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কথাও অনিবার্যভাবে উঠে আসে। এই মানুষের ভেতর মারমা জাতিগোষ্ঠী একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও স্মৃতিভাণ্ডারকে প্রথমবারের মতো লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন ব্রিটিশ শাসনামলের জেলা প্রশাসক ক্যাপ্টেন থমাস হারবার্ট লুইন (T. H. Lewin)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা জনগোষ্ঠী দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার এক প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। তাদের ইতিহাস কোনো একক গ্রন্থে আবদ্ধ নয়; তা গড়ে উঠেছে লিখিত দলিলের ভাষা ও মৌখিক স্মৃতির স্রোত মিলিয়ে। ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লুইনের বিবরণ এবং বোমাং রাজপরিবার থেকে উৎসারিত একটি লোককাহিনীকে কেন্দ্র করে এই নিবন্ধে মারমা সমাজের পরিচয়, খ্যংসা গোত্রের সামাজিক বৈশিষ্ট্য, জাতিগত সম্পর্ক এবং স্মৃতিনির্ভর ইতিহাসের কিছু নির্বাচিত অনুষঙ্গ তুলে ধরার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এখানে ক্যাপ্টেন লুইনের অনুস্মৃতি-নির্ভর লোককথা কেবল কল্পনার গল্প হয়ে ওঠে না; বরং তা এক জনগোষ্ঠীর পরাজয়, বাস্তুচ্যুতি ও আত্মপরিচয়ের সংকটকে প্রতীকি ভাষায় ধারণ করে—যেখানে ইতিহাস ও স্মৃতি একে অন্যের প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়ায়।

উল্লেখ্য যে, ক্যাপ্টেন লুইন ১৮৬৬ থেকে ১৮৬৯ এবং ১৮৭১ থেকে ১৮৭৪—এই দুই দফায় মোট ছয় বছর তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাহাড়ি জনপদের এই দীর্ঘ প্রশাসনিক ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতি হিসেবেই ১৮৬৯ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers therein। বইটি আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার অন্যতম প্রাথমিক দলিল হিসেবে বিবেচিত।

এই গ্রন্থে মারমা সমাজ নিয়ে একটি আলাদা অধ্যায় রয়েছে। সেখানে লুইন বিশেষভাবে আলোকপাত করেছেন মারমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোত্র—খ্যংসা—কে ঘিরে। যদিও আলোচনার কেন্দ্র খ্যংসা, তথাপি প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে বোমাং রাজবংশের ইতিহাস, মহামুনি মেলার বিবরণ, মারমা সমাজের বিবাহপ্রথা, ধর্মবিশ্বাস এবং দৈনন্দিন সামাজিক রীতিনীতি।

লুইনের বিবরণ অনুযায়ী, খ্যংসারা কোনো একক সম্প্রদায় নয়; তারা বিভিন্ন উপগোত্রে বিভক্ত। এসব উপগোত্রের নামকরণ হয়েছে মূলত তাদের বসবাসস্থল অনুযায়ী—বিশেষ করে যে ঝিরি বা নদীর তীরে তারা বসতি গড়ে তুলেছে, তার নাম অনুসারে। পাহাড়ি জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত জুম চাষই তাদের প্রধান জীবিকার উৎস।

মারমা সমাজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের চুল বাঁধার রীতিতে। খ্যংসা পুরুষেরা সাধারণত মাথার পেছনের দিকে চুলের খোপা বাঁধেন। এখানেই তারা রাখাইন ও বর্মীদের থেকে আলাদা। কারণ রাখাইন ও বর্মী পুরুষেরা তুলনামূলকভাবে মাথার উপরিভাগে কিংবা কপালের এক পাশে খোপা বাঁধেন, যা তাদের সমাজে পৌরুষ ও শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

জাতিগত সম্পর্কের প্রশ্নে কর্নেল স্যার এ. ফেয়ার তাঁর আরাকান বিষয়ক বিবরণীতে (জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, ১৮৪১) উল্লেখ করেন যে, খ্যংসা ও রাখাইনরা মূলত একই জাতিগোষ্ঠীভুক্ত। বর্মীদের মতো তাদের জাতীয় নাম ‘ম্রাম্মা’ (Myamma), যা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে ‘মারমা’ হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে। ‘রাখাইন’ বলতে বোঝায় রাখাইন দেশের অধিবাসী, আর ‘খ্যংসা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় পাহাড়ি ঝিরি বা নদীর তীরে বসবাসকারী, জুমচাষনির্ভর মারমা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে।

ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা সমাজ ছিল ‘বোমাং’ নামক এক প্রধান বা চীফের শাসনাধীন। আরাকানি শব্দ ‘বো’ (প্রধান) এবং ‘মং’ (নেতা) থেকে ‘বোমাং’ শব্দটির উৎপত্তি। বোমাং রাজার আবাসস্থল ছিল সাঙ্গু নদীর তীরে বর্তমান বান্দরবান এলাকায়।

এই বোমাং রাজাই একদিন ক্যাপ্টেন লুইনকে শোনান একটি লোককাহিনী—যা ইতিহাস ও স্মৃতির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে। লোককথা অনুযায়ী, মোগল শাসনামলে যখন চট্টগ্রাম তাদের অধিকারে এবং আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য, তখন বোমাং রাজবংশের পূর্বপুরুষরা আরাকানের কালাদান নদীর তীরে বসবাস করতেন। সেই সময় বার্মার রাজা আরাকানের রাজার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর রাজ্য দখলের ষড়যন্ত্র করেন। তিনি তাঁর রাজ্যের জ্ঞানীদের ডেকে ঘোষণা দেন—যে ব্যক্তি জাদুবিদ্যার মাধ্যমে আরাকানের রাজাকে দুর্বল করে দিতে পারবে, তাকে তিনি নিজের সমান মর্যাদা দেবেন।

এক ধূর্ত জ্ঞানী এই দায়িত্ব গ্রহণ করে। প্রতারণার অংশ হিসেবে সে একজন নিচু চরিত্রের নারীকে স্ত্রী সাজিয়ে আরাকানে প্রবেশ করে এবং নিজেকে বার্মার রাজার নির্যাতিত শরণার্থী হিসেবে উপস্থাপন করে। ধীরে ধীরে সে আরাকানের রাজার আস্থা অর্জন করে এবং তাঁকে বিভ্রান্ত করতে শুরু করে। সে দাবি করে—রাজধানী জাদুমন্ত্র ছাড়াই নির্মিত হওয়ায় তা অরক্ষিত; তাই প্রথমেই শহরের দেয়াল ভেঙে নতুন করে ‘শুদ্ধ’ করতে হবে।

রাজার অনুমতিতে সে শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে এবং চারদিকে এমন জাদুমন্ত্র পুঁতে দেয়, যা জনগণকে ভীরু ও দুর্বল করে তোলে। এরপর সে এক অদ্ভুত নির্দেশ দেয়—রাজা ও প্রজারা যেন পূর্বপুরুষদের মতো কপালের খোপা না বেঁধে নারীদের মতো মাথার পেছনে চুল বাঁধে। এমনকি সে দৈনন্দিন ব্যবহার্য চামচের আকৃতি বদলে দেয় এবং রাজার দাঁতের ধার কমিয়ে দেয়—সবকিছুই প্রতীকি দুর্বলতার অংশ হিসেবে।

শেষপর্যায়ে সে অসুস্থতার ভান করে নিজেকে ঘরে বন্দি রাখে এবং একটি পাত্রে ধান ভিজিয়ে রেখে অঙ্কুরিত হওয়ার দৃশ্য তৈরি করে পালিয়ে যায়। অঙ্কুরিত ধান দেখে রাজা মনে করেন লোকটি এখনো ঘরে আছে—যা ছিল চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল।

এরপর বার্মার রাজা বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে আরাকান আক্রমণ করে। অরক্ষিত ও দুর্বল রাজ্য সহজেই পরাজিত হয়। আরাকানের রাজা নিহত হন। সেই বিপর্যয়ের পর বোমাং রাজার পিতামহ পুরো গোত্রসহ পালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় নেন।

লোককাহিনীর শেষাংশে এক ধরনের আত্মসমালোচনামূলক স্মৃতি রয়ে যায়—আজও নাকি সেই জাদুমন্ত্রের প্রভাব কাটেনি; তাই মারমা সমাজ আগের মতো সাহসী নয়, এবং আজও তারা মাথার পেছনে খোপা বাঁধে।

ইতিহাসের সত্যতা যাই হোক না কেন, এই লোককাহিনী মারমা সমাজের স্মৃতিভাণ্ডারে গভীরভাবে প্রোথিত। এটি তাদের পরাজয়, বাস্তুচ্যুতি এবং আত্মপরিচয়ের এক প্রতীকী ভাষ্য—যেখানে ইতিহাস ও স্মৃতি মিলেমিশে এক অনন্য পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর আত্মকথা হয়ে উঠেছে।

ইতিহাসের নিরিখে এই কাহিনীর সবটাই সত্য নাও হতে পারে। কিন্তু মারমা সমাজের স্মৃতিভাণ্ডারে এটি একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যামূলক আখ্যান। এতে রয়েছে পরাজয়, বাস্তুচ্যুতি ও আত্মপরিচয়ের গল্প—যা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের ইতিহাসকে শুধু প্রশাসনিক দলিল নয়, মানবিক স্মৃতির আলোতেও দেখার সুযোগ করে দেয়।

ইতিহাসের বাইরে মানুষের গল্প: পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস কেবল প্রশাসনিক দলিলের শুষ্ক ভাষায় ধরা পড়ে না। এই ইতিহাস পাহাড়ের ঢালে ঢালে ছড়িয়ে থাকা মানুষের স্মৃতি, লোককথা ও আত্মপরিচয়ের ভেতর নীরবে বয়ে চলে। এখানে ইতিহাস কোনো একক সত্য নয়; বরং স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সহাবস্থানে থাকা এক বহুস্বরের বয়ান। মারমা সমাজের খ্যংসা গোত্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই আখ্যান সেই বৃহত্তর পাহাড়ি ইতিহাসেরই এক মানবিক দলিল—যেখানে লিখিত ইতিহাস ও লোকস্মৃতি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একে অন্যকে ব্যাখ্যা করে।

তবে ইতিহাসের এই স্মৃতিগাঁথার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সব অভ্যাস আজ আর অবিকল মিলে যায় না। ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লুইন বোমাং রাজার অনুস্মৃতির সূত্রে যে চুল বাঁধার রীতির কথা উল্লেখ করেছেন—মাথার পেছনে খোপা বাঁধা—তা বর্তমান মারমা সমাজে আর চোখে পড়ে না। আমি নিজে জন্মসূত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা। আমার বাড়ির পাশেই একটি বড় মারমা পাড়া। শৈশব থেকে আজ অবধি এই দীর্ঘ সময় জুড়ে আমি মারমা সমাজের পুরুষদের কাছ থেকে কখনোই মাথার পেছনে চুলের খোপা বাঁধার সেই প্রথা প্রত্যক্ষ করিনি। আমার পাড়ার পার্শ্বর্তী মার্মা সমাজের একজন শিক্ষিতজন জানান, তাঁরা এখন আর পুরনো নিয়মে মাথায় খোপা বাঁধেন না।

সম্ভবত কালের পরিক্রমায়, আধুনিক জীবনধারা ও পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে মারমা সমাজও অনেক পুরোনো রীতিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে এসেছে। কালের পরিক্রমায়, আধুনিক জীবনধারা ও পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে মারমারা আজ আর গোত্রের সব পুরোনো ঐতিহ্য বহন করেন না। তবু সেই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি—তা রয়ে গেছে গল্পে, লোককথায়, ইতিহাসের প্রান্তটীকা হয়ে। আর সেখানেই এই আখ্যানের প্রকৃত মূল্য—যেখানে বর্তমানের বাস্তবতা আর অতীতের স্মৃতি একে অন্যকে অস্বীকার না করে, বরং নীরবে সহাবস্থান করে।

ফাইল নোট: গ্রন্থ: The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers therein, লেখক: ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লুইন, প্রকাশকাল: ১৮৬৯, কলকাতা।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ২৪.০১.২০২৫