‘পথের দিশা’—অন্ধকার সময়ে আলোর আর্তনাদ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ১৭, ২০২৬, ১:৩৯ অপরাহ্ন /
‘পথের দিশা’—অন্ধকার সময়ে আলোর আর্তনাদ

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


সমাজে যখন অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন সত্য বলা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ঠিক এই মুহূর্তেই কলমের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতা “পথের দিশা”-য় যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন এক শতাব্দী আগে, আজ তা নতুন করে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে। আজও যখন নজরুলের ‘পথের দিশা’ কবিতাটি পাঠ করি তখন কল্পনায় কবির শতবছর আগের উপলব্ধি এখনো কিভাবে আমাদের সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে তা ভেবে আমি আকুল হই। শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় কবির প্রতি হৃদয় সিক্ত হয়ে উঠে।

আমার কাছে তাই মনে হয় কাজী নজরুল ইসলামের ‘পথের দিশা’  শুধুমাত্র একটি কবিতা নয়; এটি এক উত্তাল সময়ের বিবেকঘোষণা, এক বিপন্ন সমাজের প্রতি কবির তীব্র প্রশ্নোচ্চারণ। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে, ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িক ভাঙন, নৈতিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির ঘন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নজরুল এই কবিতায় আহ্বান জানিয়েছিলেন এক নতুন মানুষের—যে মানুষ ভয় পায় না, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে না, এবং পথ হারানো জাতিকে দিশা দেখাতে প্রস্তুত।

এই কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি যেন সময়কে বিদ্ধ করে ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নবাণ। ‘গুণ্ডা ও বদমায়েসির আখড়া’, ‘চিল-শকুনির উড়াল’, ‘নিন্দাবাদের ঢক্কানিনাদ’—এসব চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে নজরুল তুলে ধরেছেন সেই সমাজকে, যেখানে সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ, সৌন্দর্য অপমানিত, আর নৈতিকতা বন্দি। ‘পথের দিশা’ মূলত একটি প্রতীক্ষার কবিতা—অগ্রদূতের প্রতীক্ষা, যিনি চক্রব্যুহ ভেদ করে যাবেন, যিনি কলঙ্কের কাদায় গা ভাসাবেন না, যিনি সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলবেন: অন্যায়ই শেষ কথা নয়।

এই কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর প্রশ্নমুখরতা। নজরুল কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেন না; বরং পাঠক ও সমাজের সামনে আয়না ধরে প্রশ্ন করেন—আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? আমাদের বিবেক কি এখনো জাগ্রত? পথ কি হারিয়ে গেছে, না আমরা পথ চিনতে ভুলে গেছি?

এক শতাব্দী পরেও ‘পথের দিশা’ আমাদের সামনে ঠিক একইভাবে প্রাসঙ্গিক। সমাজ বদলেছে, শাসনব্যবস্থা পাল্টেছে, কিন্তু গুণ্ডামি, অপপ্রচার, নৈতিক স্খলন ও ভয়ের সংস্কৃতি রয়ে গেছে ভিন্ন নামে, ভিন্ন মুখে। তাই এই কবিতা আজও আমাদের কাছে শুধু সাহিত্য নয়—এটি প্রতিবাদ, এটি দায়িত্ব, এটি সাহসের পাঠ।

‘পথের দিশা’ আমাদের শেখায়—অন্ধকার যত ঘনই হোক, প্রশ্ন করাই প্রথম আলোর চিহ্ন।

১. গুণ্ডামির আখড়ায় প্রাণের স্পন্দন:

চারিদিকে এই গুণ্ডা এবং বদমায়েসির আখ্‌ড়া দিয়ে / রে অগ্রদূত, চ’লতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে?”

আলীকদম প্রেসক্লাবের বর্তমান প্রেক্ষাপট যেন কবির সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন। যেখানে কলম হওয়ার কথা ছিল শোষিতের কণ্ঠস্বর, সেখানে আজ কতিপয় স্বার্থান্বেষীর ‘বদমায়েসির আখড়া’ তৈরির চেষ্টা চলছে। আলীকদমের নির্ভীক সাংবাদিকরা কি এই রুদ্ধশ্বাস পরিবেশে নিজের বিবেক বাঁচিয়ে চলতে পারবে? যখন চারদিকে পেশিশক্তির আস্ফালন চলে, তখন শ্বেতশুভ্র সাংবাদিকতা ম্লান হয়ে পড়ে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাষাণ ফুঁড়েই বনস্পতি জন্ম নেয়। এই সংকটই হোক নতুন মহীরুহ হয়ে ওঠার শক্তি। আমার কাছে শতবছর আগে নজরুলের এই প্রশ্নটি মনে হচ্ছে শুধুমাত্র কাব্যিক উচ্চারণ নয়—এটি অনাগত দিনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা। একইসাথে দেখা যাচ্ছে এটি আলীকদমের বাস্তবতাও। চারিদিকে গুণ্ডামি, বদমায়েসি, ক্ষমতার দাপট আর মিথ্যার হট্টমেলা। এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আলীকদম প্রেসক্লাব কি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে সত্যের পথে হাঁটতে পারবে? সাংবাদিকতা যখন প্রশ্ন করার অপরাধে ‘অপরাধী’ হয়, তখন কলমই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র। মিশেল ফুকো বলেছিলেন—ক্ষমতা সর্বদা সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আর সেই কারণেই ক্ষমতার চোখে স্বাধীন সংবাদকর্মী সবচেয়ে বড় শত্রু।

২. আলোর শিশু ও গো-ভাগাড়ের চিল-শকুনি:

“আজকে প্রাণের গো-ভাগাড়ে উড়ছে শুধু চিল-শকুনি / এর মাঝে তুই আলোকে-শিশু কোন্‌ অভিযান ক’রবি, শুনি?”

প্রেসক্লাবের পবিত্র আঙিনাকে যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের গো-ভাগাড় বানাতে চায়, তারা মূলত সমাজের চিল-শকুনি। তারা সাংবাদিকতার মহান আদর্শকে খুবলে খাচ্ছে। পবিত্র আল-কুরআনের ঘোষণা— “সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই জন্য” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮১)। সুতরাং এই শকুনিদের হট্টমেলায় সত্যের চিরস্থায়ী পরাজয় অসম্ভব। আলীকদমের সত্যনিষ্ঠ সংবাদকর্মীদের আজ সেই ‘আলোর শিশু’ হয়েই অভিযানে নামতে হবে। গত এক পক্ষকাল ধরে গিরিনন্দীনি আলীকদমের বুকের সবুজ গালিচা ভেদ করে যা হচ্ছে এবং যা রটানো হয়েছে তা সংবাদ নয়—গুজব ও অপপ্রচার। মিথ্যার গো-ভাগাড়ের আবর্জনা খেয়ে যেন সুদূর নীলাকাশে উড়ছে চিল-শকুনি। এই চিল-শকুনিরা নিজেরা শক্তিমান না। তারা ওঁৎপেতে কিছু শক্তি অপেক্ষায়, কখন সাংবাদিকতার মৃতদেহে ঠোকর বসানো যায়। সত্য বলার অপরাধে চরিত্রহনন, ভয় দেখানো, বিভ্রান্তি ছড়ানো—এটাই সমকালীন সংস্কৃতি।

নজরুল আগেই দেখেছিলেন এই দৃশ্য। তাই লিখেছিলেন—
“মিথ্যার মরুভূমিতে আজ সত্যের বড়ই অভাব।”

৩. প্রতিষ্ঠান যখন মন্ত্রণাগার:

“মসজিদ আর মন্দির ঐ শয়তানদের মন্ত্রণাগার / রে অগ্রদূত, ভাঙতে এবার আসছে কি জাঠ কালাপাহাড়?”

যখন পবিত্র প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যের বদলে মিথ্যার বেসাতি করে, তখন সেখানে সংস্কারের জন্য নতুন ‘কালাপাহাড়’ প্রয়োজন হয়। আলীকদম প্রেসক্লাব কোনো ব্যক্তিগত ড্রয়িংরুম নয়; এটি গণমানুষের আমানত। হদিস শরীফে আছে— “তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় হতে দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে” , শক্তি না থাকলে যেন মন দিয়ে ঘৃণা করে, (মুসলিম)। বর্তমান সংকট নিরসনে আজ সেই আপসহীন তারুণ্য দরকার, যারা ভণ্ডামির এই তাসের ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। নজরুল ধর্মকে নয়, ধর্মের নামে ব্যবসাকে আঘাত করেছিলেন। আজও ধর্ম, নৈতিকতা, সমাজ—সবই ক্ষমতার মুখোশ হয়ে উঠছে। যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই ‘অপরাধী’ বানানো হয়, তখন বুঝতে হয়—নৈতিকতার জায়গা দখল করেছে সুবিধাবাদ ও নিন্দবাদের ঢক্কানিনাদ।

দর্শন বলে, ন্যায়বিচার মানে কেবল আইন নয়—নৈতিক সাহস। সক্রেটিস বিষপান করেছিলেন, কিন্তু মিথ্যার সঙ্গে আপস করেননি।

৪. স্বার্থের ভাগ-বাঁটোয়ারা ও গরল-জ্বালা:

“জাতির পারণ-সিন্ধু মথি’ স্বার্থ-লোভী পিশাচ যারা / সুধার পাত্র লক্ষ্মীলাভের ক’রতেছে ভাগ-বাঁটোয়ারা”

আজ প্রেসক্লাবের সম্পদ আর পদবি নিয়ে যারা ভাগ-বাঁটোয়ারার খেলায় মত্ত, তারা মূলত ‘সুধার পাত্র’ বা সম্মানজনক পেশাকে কলঙ্কিত করছে। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের পতন তখনই শুরু হয় যখন সেখানে মেধার বদলে মোসাহেবি আর নীতির বদলে লোভ স্থান পায়। নজরুলের ভাষায়— “বিদ্বেষের এই হোরি-খেলায়” মেতে যারা সত্যকে আড়াল করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আজ কলমকে তলোয়ার করতে হবে।

৫. “পারবি যেতে ভেদ ক’রে এই বক্র-পথের চক্রব্যুহ?”

বক্রপথ—আজকের সমাজের স্বাভাবিক পথ। সত্য নয়, সুবিধা; ন্যায় নয়, নেটওয়ার্ক। আলীকদম প্রেসক্লাব সেই চক্রব্যুহ ভেদ করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে বলেই সংকট এসেছে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বোর্দিয়োর ভাষায়, এখানে চলছে symbolic violence—যেখানে প্রকাশ্য লাঠি নয়, অপবাদ, ভয় ও পরিবারের অন্যের অপরাধের দায় নিরীহের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এবং সামাজিক চাপ দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা হয়।

কুরআন বলে,
“হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো—নিজেদের বিরুদ্ধে হলেও।” (সূরা নিসা: ১৩৫)
এই আয়াতই প্রেসক্লাবের নৈতিক ঘোষণা।

৬. “ছুঁড়ছে পাথর, ছিটায় কাদা”:

প্রেসক্লাবের বিরুদ্ধে আজ পাথর ছোড়া হয়—কখনো শব্দে, কখনো ষড়যন্ত্রে। কাদা ছিটানো হয় চরিত্রে, উদ্দেশ্যে, ইতিহাসে। অথচ হাদিস বলে,
“জালিমের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।”
এই জিহাদেই আলীকদম প্রেসক্লাব দাঁড়িয়ে আছে—নিরস্ত্র, কিন্তু দৃঢ়।

৭. “নিন্দাবাদের বৃন্দাবনে ভেবেছিলাম গাইব না গান”

কিন্তু এতকিছুর পর আর নীরব থাকা যায় না। অন্যায়ের সামনে চুপ থাকা নিজেই এক ধরনের অপরাধ। তাই আলীকদম প্রেসক্লাব গান গায়—প্রতিবাদের গান, সত্যের গান। নজরুল যেমন লিখেছিলেন—
“আমি চির বিদ্রোহী বীর।”
এই বিদ্রোহ ধ্বংসের নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দৃঢ় ঘোষণা।

৮. “বিষ যখন আজ উঠল শেষে তখন কারুর পাইনে দিশা”

সমাজ আজ বিষে ভরা। লোভ, ক্ষমতা, ভীতি—সব মিলে দিশাহীনতা। কিন্তু ইতিহাস বলে, এই সময়েই জন্ম নেয় দিশারী। আলীকদম প্রেসক্লাব সেই দিশা দেখানোর দায় নিয়েছে বলেই আঘাত এসেছে।

কুরআনের ভাষায়,
“আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।”
এই বাক্যই আমাদের শেষ আশ্রয়।

৯. সমাপ্তি: তিমির হননের আহ্বান

“রে অগ্রদূত… আনিস খবর, কোথায় আমার যুগান্তরের খড়্‌পপাণি!”

নিন্দাবাদীদের ঢক্কা-নিনাদে সত্যের কণ্ঠরোধ করা সাময়িক হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী নয়। দার্শনিক প্লেটোর সেই শাশ্বত বাণী আজ আমাদের পথ দেখায়— “অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানেই অন্যায়ের অংশীদার হওয়া।” আলীকদমের সচেতন বিবেককে ও মূলধারার সাংবাদিক সমাজকে আজ রুখে দাঁড়াতে হবে। নজরুলের সেই অজেয় মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে— “বল বীর, চির উন্নত মম শির!” শৃঙ্খল ভাঙার সময় সমাগত। আলীকদম প্রেসক্লাব মুক্ত হোক স্বার্থের শিকল থেকে।

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও লেখা হচ্ছে ভবিষ্যতেও লেখা হবে ইনশাআল্লাহ্। আলীকদমের পথে, সাংবাদিকের কলমে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো প্রতিটি কণ্ঠে। খড়্গপাণি মানে অস্ত্র নয়—নৈতিক দৃঢ়তা। ভয় নয়—সাহস। আপস নয়—প্রতিবাদ।

নজরুল আজ বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন—
থামিস না। পথ কঠিন বলেই পথের দিশা জরুরি।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.