অপপ্রচার–পুরাণ : বাঙালি মননের এক চিরন্তন ব্যাধি


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ১৬, ২০২৬, ৫:০১ পূর্বাহ্ন /
অপপ্রচার–পুরাণ : বাঙালি মননের এক চিরন্তন ব্যাধি

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


অপপ্রচারকারীদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে—তারা নিজের ব্যাপারে ভীষণ সন্দিহান। আত্মমর্যাদা, শক্তিমত্তা, সাংগঠনিক সক্ষমতা কিংবা অর্থ–প্রভাব—সবকিছুতেই তাদের বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে। এই অনিশ্চয়তা থেকেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: মিথ্যার কারুকাজ

নিজেদের অবস্থান নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে তারা বাস্তবকে অস্বীকার করে, আর আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তোলে এক কল্পলোক। সেই কল্পলোকই হয়ে ওঠে তাদের “সম্পত্তি”—যেখানে তারা নায়ক, বীর, সাধু ও সফল। কিন্তু যেহেতু এই জগৎ বাস্তব নয়, তাই সেটিকে অন্যের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করতে প্রয়োজন পড়ে লাগাতার অপপ্রচার ও গুজবের।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এক জায়গায় বাঙালি মনন সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছিলেন—
“আমরা সত্যের চেয়ে গল্পে বেশি স্বস্তি পাই।”
এই স্বস্তির জায়গাটাই অপপ্রচারকারীদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

বড়াইয়ের মনোবিজ্ঞান

অপপ্রচারকারীরা সাধারণত ধনী নন, কিন্তু বিত্তের বড়াই করেন। চরিত্রে সংকট থাকলেও নৈতিকতার বাগাড়ম্বর দেখান। শরীর জর্জরিত, মন বিষণ্ন—তবু শক্তিমত্তা প্রদর্শনের কসরৎ চালান। সুখ নেই, অথচ সুখী প্রমাণ করার জন্য আয়োজন করেন বাহুল্যময় আনন্দফুর্তির—যেন হাসির শব্দ যত জোরে হবে, শূন্যতা তত চাপা পড়বে।

এখানে রবীন্দ্রনাথের একটি পর্যবেক্ষণ স্মরণযোগ্য—
“যাহা নাই, তাহাই মানুষ সবচেয়ে বেশি দেখাইতে চায়।”

ফলে দেখা যায়, এই অপপ্রচারকারীরা বালখিল্যময় কৌতুক, অপ্রয়োজনীয় উৎসব, কৃত্রিম হাসি আর আত্মপ্রচারের সার্কাসে মেতে ওঠে। উদ্দেশ্য একটাই—নিজের ভাঙা ভিত ঢেকে রাখা।

মিথ্যার অতিভোজন ও মানসিক অবক্ষয়

সমস্যা এখানেই শেষ নয়। ক্রমাগত মিথ্যাচার করতে করতে একসময় তারা নিজেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করে তাদের বানানো গল্প। তখন আর তারা বুঝতে পারে না—কে তাদের নিয়ে হাসছে, কে বিরক্ত, কে ঘৃণা করছে। অনুভূতির স্নায়ু ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যায়। মানুষ হয়ে ওঠে প্রায় নির্জীব জড়পদার্থের মতো

মনস্তত্ত্বে একে বলা যায় self-deception spiral—নিজেকে ধোঁকা দিতে দিতে বাস্তব-বিচ্ছিন্নতা।

বুদ্ধদেব বসু এক জায়গায় লিখেছিলেন—
“যে সমাজে গুজব শিল্পে পরিণত হয়, সেখানে চিন্তা পেশা হতে পারে না।”

বাঙালি মনন ও গুজবের উত্তরাধিকার

সত্য বলতে কী, বাঙালি মননে অপপ্রচার ও গুজবের পসরা সাজানো নতুন কিছু নয়। পাড়া-মহল্লা, চায়ের দোকান, সামাজিক মাধ্যম—সবখানেই এর মহড়া। তথ্য নয়, মুখরোচক গল্পই এখানে বেশি চলে। কে কী করলো, কেন করলো—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়, কে কী বলছে

এই প্রবণতা নিয়ে প্রমথ চৌধুরীর ব্যঙ্গ আজও প্রাসঙ্গিক—
“আমরা খবরের সত্যতা বিচার করি না, খবরটা কতটা জমাটি—সেটাই মুখ্য।”

ফলে অপপ্রচারকারীরা জানে, বাঙালি সমাজে গুজব বিক্রি হয়। তারা সেই বাজার ধরেই ব্যবসা চালায়।

শেষ কথা

অপপ্রচার আসলে শক্তির পরিচয় নয়; এটি দুর্বলতার আর্তচিৎকার। যে নিজেকে বিশ্বাস করে, তাকে মিথ্যা বলার দরকার পড়ে না। আর যে সত্যে দাঁড়াতে পারে, তাকে গুজবের কাঁধে ভর করতে হয় না।

সময় শেষ পর্যন্ত অপপ্রচারকারীদের ছেড়ে দেয় একা—নিজেদের বানানো কল্পলোকের ধ্বংসস্তূপে। আর সত্য? সে চুপচাপ, ধীর পায়ে, ঠিকই তার জায়গা খুঁজে নেয়।

কারণ—
মিথ্যা চেঁচায় বেশি,
আর সত্য থাকে স্থির।


লেখক- মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব।