আলীকদম কলেজ ও এক পলিটিক্যাল-সোসিওলজিক্যাল বিশ্লেষণ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন /
আলীকদম কলেজ ও এক পলিটিক্যাল-সোসিওলজিক্যাল বিশ্লেষণ

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


ভূমিকা: গিরির স্বপ্নপুরীতে শিক্ষার হাহাকার

বাংলাদেশের দশম বৃহত্তম উপজেলা আলীকদম—প্রকৃতির স্নিগ্ধ সবুজ বনানী আর মাতামুহুরী নদীর কলতানে মুখরিত এক ‘গিরির স্বপ্নপুরী’। ম্রো, মার্মা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর এই মিলনমেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীনতার দীর্ঘ পাঁচ দশকে এখানে উচ্চশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। সাক্ষরতার হার যেখানে জাতীয় গড়ের অর্ধেকেরও কম (৩১.৩%), সেখানে একটি মহাবিদ্যালয় স্থাপন ছিল সময়ের দাবি এবং অস্তিত্বের লড়াই।

১. কলেজ প্রতিষ্ঠা: প্রশাসনিক ঐকান্তিকতা ও চার আবেদনকারী

২০২৩ সালে তৎকালীন পার্বত্য মন্ত্রীর আক্ষেপ এবং “এলাকার লোকজন জমি দিলে কলেজ সম্ভব”–এই ঘোষণার পর আলীকদমে এক নতুন জাগরণ শুরু হয়। আলীকদম কলেজ স্থাপনের জন্য চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে চারজন ব্যক্তি মূল আবেদনকারী হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন:

  • জাবের মোঃ সোয়াইব: তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)।
  • জামাল উদ্দিন: স্থানীয় নেতৃত্ব ও শিক্ষানুরাগী।
  • অংশেথোয়াই মার্মা: স্থানীয় মার্মা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা।
  • মমতাজ উদ্দিন আহমদ: আলীকদমের বৌদ্ধিক সমাজের প্রতিনিধি এবং শিক্ষাঅনুরাগী।

এই চার ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০২৪ সালের ৮ জুলাই আলীকদম কলেজ স্থাপনের আবেদন, সেই বছরের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে স্থাপনের অনুমতি এবং ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই পাঠদানের চূড়ান্ত অনুমতি প্রাপ্ত হয়।

২. বকলমের দান: আনছার আলী ও প্রতীকী পুঁজির নতুন সংজ্ঞা

সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ুর ভাষায়, শিক্ষা হলো ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’। কিন্তু এই পুঁজি অর্জনের পথ প্রশস্ত করেছেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজে নিরক্ষর। পেশায় দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জনাব আনছার আলী তাঁর ভোগদখলীয় ২ একর জমি কলেজকে দান করে এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর সেই অমর ঘোষণা—“শিক্ষা অমূল্য ধন, আমি আনছার আলী বকলম”—আজ আলীকদমের ইতিহাসের অংশ।

আনছার আলী ছাড়াও প্রথম জমি দান করে আলীকদম কলেজের ইতিহাসের সাক্ষী হলেন দুই সহোদর হাসান আলী ও হোসেন আলী (এলাদু)। এরপর মৃত আবুল কাশেমের ওয়ারিশগণ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান ও মো. এরশাদ মিয়া মেম্বার স্বপ্রণোদিতভাবে জমি দান করে আলীকদমের উচ্চশিক্ষার ভিত গড়ে দিয়েছেন। মোট ৮ একর ৮৪ শতাংশ জমির ওপর আজ এই বিদ্যাপীঠের স্বপ্ন দাঁড়িয়ে আছে।

৩. নেপথ্যের কারিগর ও সাক্ষী:

আলীকদমের সন্তান হিসেবে নিবন্ধের লেখক মমতাজ উদ্দিন আহমদ এই কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রতিটি ধাপে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন ১৯ সদস্যের সাংগঠনিক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং জনসংযোগ উপ-কমিটির আহ্বায়ক।

  • দলিল লেখক ও সাক্ষী: আলীকদম কলেজের অনুকূলে সম্পাদিত প্রতিটি দলিলের লেখক ও সাক্ষী হিসেবে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের আইনি ও স্থায়ী কাঠামোর ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন।
  • আল-ফারাবির আদর্শের প্রতিফলন: ফারাবির মতে, নেতৃত্বের প্রধান কাজ হলো প্রজ্ঞার প্রসার ঘটানো। নিবন্ধের লেখক তাঁর লেখনি, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং জনমত গঠনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, প্রকৃত নেতৃত্ব কেবল রাজদণ্ডে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের চারা রোপণের মাঝে নিহিত।

৪. প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও স্বপ্নপূরণ:

আলীকদম কলেজ স্থাপনে তৎকালীন ও বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণের (জাবের মোঃ সোয়াইব, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, আবদুল্লাহ আলম মোমিন এবং মনজুর আলম) অবদান অনস্বীকার্য। ২০২৪ সালের জুনে আলীকদম প্রেসক্লাবের অস্থায়ী কার্যালয়ে প্রথম ৭০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ৫ তলা একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পাচ্ছে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি কলেজের নিজস্ব জায়গায় সেমিপাকা একাডেমিক ভবন নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর দেন এবং পার্বত্য জেলা পরিষদের সহযোগিতায় সীমানা প্রাচীর, দৃষ্টিন্দন গেই ও ছাত্রাবাস নির্মাণের উদ্যোগের মাধ্যমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাসে রূপ নিচ্ছে। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ২ কোটি বরাদ্দে ৫ তলা একাডেমিক ভবনের কাজ চলমান রয়েছে।

৫. তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কেন এই কলেজ আলীকদমের ভাগ্য বদলাবে?

বুর্দিয়ুর ‘ফিল্ড’ (Field) তত্ত্বে বলা হয়েছে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন কোনো জনপদে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেটি ওই অঞ্চলের মানুষের ‘হ্যাবিটাস’ (Habitus) বদলে দেয়। আলীকদম কলেজ প্রতিষ্ঠার ফলে:

  • প্রতীকী সহিংসতার অবসান: শিক্ষাহীনতার কারণে মানুষ যে হীনম্মন্যতায় ভুগত, তা দূর হবে।
  • সামাজিক পুঁজি বৃদ্ধি: পাহাড়ি-বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের সহাবস্থান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও সংহত করবে।
  • সাংস্কৃতিক রূপান্তর: আনছার আলীর মতো সাধারণ মানুষের ত্যাগ প্রমাণ করে যে, স্থানীয় উদ্যোগ ব্যতীত রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা সফল হয় না। এটি ইবন খালদুনের ‘আসাবিয়্যাহ’ বা সামাজিক সংহতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৬. চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের দুই মহৎপ্রাণ কর্মকর্তা; কৃতজ্ঞতার অম্লান স্মারক:
আলীকদম কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং কলেজ পরিদর্শকের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের পেশাদারিত্ব এবং আন্তরিকতাকে কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করছি। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের পথ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন দুই শীর্ষ কর্মকর্তার অবদান আলীকদমবাসী চিরকাল কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে। তাঁরা হলেন:
১. প্রফেসর রেজাউল করিম, সাবেক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।
২. প্রফেসর জাহেদুল হক, কলেজ পরিদর্শক, চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।

তাঁদের বিশেষ অবদান ও আন্তরিকতা:
সরকারি বিধিবদ্ধ নিয়মানুযায়ী আলীকদম কলেজের জমি ও অবকাঠামো পরিদর্শনে এসে এই দুই বরেণ্য শিক্ষাবিদ কেবল দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেননি, বরং পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া মানুষের উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষাকে গভীরভাবে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। তাঁদের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং আন্তরিক সমর্থনের ফলেই আলীকদম কলেজ স্থাপনের প্রশাসনিক অনুমতি প্রাপ্তি ত্বরান্বিত হয়।


যে সময়টিতে আলীকদমবাসী জমি সংক্রান্ত বিপত্তি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল, সে সময় তাঁদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা এক বড় ধরনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। মমতাজ উদ্দিন আহমদ এবং আলীকদম কলেজ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই দুই মহৎপ্রাণ কর্মকর্তার কাছে বিশেষভাবে ঋণ স্বীকার করেন। আলীকদমের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে তাঁদের নাম এক সম্মানজনক স্থানে অম্লান হয়ে থাকবে।

উপসংহার: মহাকালের স্বীকৃতি

প্রতিষ্ঠাতা সদস্যগণ, জমি দাতাগণ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এই মহৎ কর্ম আলীকদমের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বকলম আনছার আলী হয়তো সময়ের আবর্তে চলে যাবেন, কিন্তু তাঁর দান করা ভূমিতে যে জ্ঞানের আলো জ্বলবে, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আলীকদমের অন্ধকার দূর করবে।

প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা, আন্তরিক সমর্থন প্রতিষ্ঠাতা ও দাতাদের উদ্যোগ- এই সবকিছুর এক সার্থক যোগফলের নাম ‘আলীকদম কলেজ’। এই প্রতিষ্ঠানটি আজ কেবল একটি মহাবিদ্যালয় নয়, বরং এটি আলীকদমের সম্মিলিত চেতনার এক অমর বিজয়স্তম্ভ।

এই কলেজ তাই এই পার্বত্য জনপদে শুধুমাত্র একটি ভবন নয়; এটি আলীকদমের মানুষের আত্মমর্যাদা, সংগ্রাম এবং চিরন্তন সার্থকতা—যার মূলে রয়েছেন একদল মহৎপ্রাণ মানুষের বিগত প্রায় আড়াই বছর ধরে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও কিছু ত্যাগী মহৎপ্রাণ মানুষেরা।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, আলীকদম, বান্দরবান।