
একটি সমাজের মানবিকতা পরিমাপ করা যায় তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর জীবনের দিকে তাকিয়ে। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষ সেই আয়নার সামনে আমাদের দাঁড় করায়। তারা শুধু একটি জনগোষ্ঠী নন—তারা আমাদের সামাজিক বিবেকের পরীক্ষাক্ষেত্র। অথচ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বহু প্রান্তিক অঞ্চলে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন আজও দুঃখ, নির্ভরতা ও নীরব বঞ্চনার গল্প।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের পাহাড়ি জনপদ—বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা ও লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নে—এই বাস্তবতা আরও তীব্র। পাহাড়, দূরত্ব ও দারিদ্র্য এখানে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের কষ্টকে আরও গভীর করে তুলেছে। স্বাস্থ্যসেবা দূরে, কর্মসংস্থান সীমিত, সামাজিক স্বীকৃতি প্রায় অনুপস্থিত। অনেকেই পরিবার ও সমাজের চোখে ‘বোঝা’ হয়ে ওঠেন।
প্রবীণ মানুষের জীবনে প্রধান সংকট একাকিত্ব, আয়হীনতা ও চিকিৎসাজনিত অনিশ্চয়তা। কর্মক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামাজিক ভূমিকা সংকুচিত হয়ে আসে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে তারা বাদ পড়ে যান। অপরদিকে প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবন শুধু শারীরিক সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে না; সামাজিক কুসংস্কার, অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা ও কর্মসংস্থানের অভাব তাদের জীবনকে আরও সংকীর্ণ করে তোলে।
বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংকট ভবিষ্যৎজুড়ে বিস্তৃত হয়। চিকিৎসা, থেরাপি ও বিশেষ শিক্ষা ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র পরিবারগুলো প্রায়ই অসহায় হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় সহায়তা থাকলেও তথ্যের অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতায় অনেকেই সেই সেবা পান না।
এই প্রেক্ষাপটেই ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর শুরু হয় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন উদ্যোগ। শুরুতে যার নাম ছিল— ‘প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও মাদকসেবনকারীদের জন্য একীভূত কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা’। ২০২৫ সাল থেকে প্রকল্পটি তৃতীয় ধাপে নতুন নামে বাস্তবায়িত হচ্ছে— ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বিশেষ করে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যাপক সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রচার (SDDB 2025–2027)’। প্রকল্পটি চলবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
কারিতাস বাংলাদেশের বাস্তবায়নে এবং জার্মান সরকারের (Federal Republic of Germany ও BMZ) অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য—প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
এই প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—কমিউনিটি থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ। আলীকদম সদর ইউনিয়ন ও গজালিয়া ইউনিয়নে গড়ে তোলা হয়েছে উপজেলা ভিত্তিক ক্লাব ঘর, স্ব-সহায়ক দল ও কমিউনিটি ফোরাম। এসব জায়গায় প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষ নিজেরাই নিজেদের সমস্যা তুলে ধরছেন, মতামত দিচ্ছেন।
ইউনিয়ন পরিষদ, সমাজসেবা দপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা সরকারি ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা ও অন্যান্য সামাজিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি সচেতনতামূলক সেমিনার, নারী ফোরাম মিটিং, স্কুল পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক সেশন, র্যালি ও মাদকবিরোধী কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে।
এই প্রকল্পের মানবিক দিকটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে উপকারভোগীদের জীবনের গল্পে।
আলীকদম উপজেলার চিওনী পাড়ার ফরিদা বেগম (৩৫) জন্মগতভাবে বাম হাত ও পা অবশ। প্রকল্পের সহায়তায় তিনি এখন ছাগল প্রতিপালন করছেন। একই পাড়ার নুর নাহার, তিনিও শারীরিক প্রতিবন্ধী, ছাগল বিক্রি করে গরু কিনেছেন।
বাস টার্মিনাল এলাকার মো. ইলিয়াস বলেন,“আগে কোথাও গেলে কথা বলার সুযোগ পেতাম না। এখন ক্লাবের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদে যাই, চিকিৎসা সেবা ও ভাতা বিষয়ে জানতে পারি। আমি এখন দোকানদারি করি। নিজেকে আর বোঝা মনে হয় না।”
কলারঝিরি জবিরাম কার্বারী পাড়ার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সরমনি ত্রিপুরা (৫৫) বলেন, “চোখে দেখি না বলে মানুষ আমাকে এড়িয়ে চলতো। এখন প্রশিক্ষণ পেয়েছি, সভায় কথা বলি। আমাদের মতো মানুষের কথাও যেন সরকার শোনে।”
বটতলী পাড়ার শারীরিক প্রতিবন্ধী সোলতান আহামদ (৬০) ৯ হাজার টাকা সহায়তা পেয়ে মুদি দোকান গড়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, “এই প্রকল্প আমাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে।”
লামার গজালিয়া ইউনিয়নের আকিরাম পাড়ার রস্নাতি ত্রিপুরা ও তিমথি ত্রিপুরা বলেন, একসময় প্রতিবন্ধীদের মানুষ ভালো চোখে দেখতো না। এখন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পেয়ে তারা অনেকটাই স্বাবলম্বী। সত্তরোর্ধ সতীশ ত্রিপুরার ভাষায়, সরকার ও এনজিও এগিয়ে এলে প্রবীণদের দুঃখ অনেকটাই কমে যায়।
প্রকল্পটির আওতায় প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্যও বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। চিওনী পাড়ার সিরাজুল ইসলাম (৮) সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত—সে চিকিৎসা সহায়তা পেয়েছে। রবিউল (২) থেরাপি ও আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। প্রসন্ন ত্রিপুরা (১৩) পেয়েছে হুইলচেয়ার ও পুষ্টিকর খাদ্য। এছাড়া মানসিক প্রতিবন্ধী আন্দ্রিজয় ত্রিপুরা ও শাপলা আক্তার চিকিৎসা সহায়তা পেয়েছেন।
এই উদ্যোগ দেখিয়ে দেয়—সহায়তা নয়, অধিকারভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিই টেকসই পথ। সরকারের উচিত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও সহজলভ্য করা, উপজেলা পর্যায়ে থেরাপি ও পুনর্বাসন সেবা বাড়ানো এবং নীতিনির্ধারণে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
এনজিওগুলোর ভূমিকা হওয়া উচিত দক্ষতা উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি, অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিটি নেতৃত্ব গড়ে তোলা।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. তানভীর হোসেন জানান, কারিতাসের এসডিডিবি প্রকল্প এলাকায় কার্যকরভাবে কাজ করছে এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী দিবসসহ বিভিন্ন উদ্যোগে সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করছে।
প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষরা বোঝা নন—তারা অভিজ্ঞতা, দৃঢ়তা ও সম্ভাবনার আধার। আলীকদম ও গজালিয়ার পাহাড়ে যদি অন্তর্ভুক্তির পথ তৈরি হয়, তবে তা দেশের সর্বত্র সম্ভব। এই পথচলা কেবল একটি প্রকল্পের গল্প নয়—এটি একটি ন্যায্য, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার আহ্বান।

আপনার মতামত লিখুন :