
রাত্রির গভীরে যখন মানুষ আকাশের দিকে তাকায়, তখন তার দৃষ্টিতে কেবল নক্ষত্রের ঝিলিক নয়, এক অপার নৈঃশব্দ্য এসে নামে। সে নৈঃশব্দ্যে লুকিয়ে থাকে এক অনাময় শাসনের ছায়া। দৃশ্যমান নয়, অথচ সমগ্র সৃষ্টিকে পরিপূর্ণভাবে ঘিরে রেখেছে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা আল-মুলক (সূরা ৬৭) সেই শাসকের নাম উচ্চারণ করে—আল্লাহ। “মুলক” শব্দের আভিধানিক অর্থই হলো সার্বভৌম ক্ষমতা, অপরিমেয় কর্তৃত্ব। এই সূরা মানুষকে শেখায়: আকাশের নিচে আমরা যতই ব্যস্ত থাকি, আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসের ওপর এক অদৃশ্য হাত রয়েছে—তা কখনো ভয়ের নয়, বরং বরকতের।
“তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলকু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাই’ইন কাদীর।” বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে সমগ্র শাসন—আর তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। (৬৭:১)
এই প্রথম আয়াতেই সূরার নাম ও দর্শন স্থির হয়ে যায়। ক্ষমতা এখানে নির্মমতা নয়, বরং শান্তি ও নিরাপত্তার উৎস। পৃথিবী, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি—সবই এক ক্ষুদ্র পর্ব মাত্র। মানুষের দম্ভ যতই বাড়ুক, তার অস্তিত্ব এক নিমিষে শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যিনি এই বিশালত্বের মালিক, তিনি নির্মম নন; তিনি রহমান। এই বোধই মানুষকে অহংকার থেকে নম্রতার দিকে নিয়ে যায়।
দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ সরাসরি জীবন ও মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন করেন:
“আল্লাযী খালাকাল মাওতা ওয়াল হায়াতা লিয়াবলুয়াকুম আইয়ুকুম আহসানু আমালা।” যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন—যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। (৬৭:২)
জীবন ও মৃত্যু এখানে দুই যমজ ভাইয়ের মতো পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। জীবন এক প্রস্ফুটিত ফুল, মৃত্যু তার পাপড়ি ঝরার মুহূর্ত। কিন্তু উভয়ই পরীক্ষা। এই পৃথিবী কোনো উন্মুক্ত খেলার মাঠ নয়; এ এক পরীক্ষাগার। প্রতিটি হাসি, প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি গোপন সিদ্ধান্ত—সবই নথিভুক্ত হচ্ছে। এই বোধ মানুষকে দায়বদ্ধ করে। আমি কী করছি? কার জন্য করছি? এই প্রশ্নই জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।
তারপর আল্লাহ আকাশের দিকে দৃষ্টি ফেরান: “আল্লাযী খালাকা সাব‘আ সামাওয়াতিন তিবাকা, মা তারা ফী খালকির রহমানি মিন তাফাওয়ুতিন ফারজি‘ল বাসারা হাল তারা মিন ফুতূর।” যিনি সপ্ত আকাশ স্তরে-স্তরে সৃষ্টি করেছেন… পুনরায় দৃষ্টি ফেরাও, কোথাও কোনো ফাটল দেখতে পাও কি? (৬৭:৩)
এ যেন এক প্রশিক্ষণ। আকাশের দিকে তাকাও। আরেকবার তাকাও। বারবার তাকাও। কোথাও কোনো অসঙ্গতি নেই। ব্ল্যাক হোলের গর্ভে, গ্যালাক্সির ঘূর্ণনে, নীহারিকার রঙে—সবই নিখুঁত। মানুষ পৃথিবীতে যত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করুক, আকাশ তাকে শেখায় শৃঙ্খলা। আকাশ এক পাঠশালা, যেখানে প্রতি রাতে লেখা হয় একই বার্তা: তুমি যতই ছোট মনে করো নিজেকে, তুমি এক মহান পরিকল্পনার অংশ।
রাতের আকাশ শুধু সৌন্দর্য নয়, সতর্কতাও।
“ওয়া লাকাদ জাইয়্যানাস সামা’আদ দুনয়া বিমাসাবীহা ওয়া জা‘আলনাহা রুজূমাল লিশ শাইয়াতীন…” আমরা নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করেছি এবং তা শয়তানদের জন্য নিক্ষেপযোগ্য উল্কা বানিয়েছি। (৬৭:৫)
উল্কাপিণ্ড যখন আকাশে জ্বলে ওঠে, তা কেবল সৌন্দর্য নয়—তা এক স্মারক। যারা সত্য থেকে বিমুখ, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের আগুন। এই সূরা ভয় দেখায় না, বরং সতর্ক করে। ভয় এখানে ভীতি নয়, বরং সচেতনতা।
আর মানুষের অহংকার? আল্লাহ নান্দনিকভাবে ধরিয়ে দেন: “অলাম তারা কাইফা ফা‘আলা রাব্বুকা বিআসহাবিল ফীল…” নয়, বরং পাখির দিকে তাকাও।
“আলাম ইয়ারাও ইলাত তাইরি ফাওকাহুম সাফফাতিঁও ওয়া ইয়াকবিদনা মা ইয়ুমসিকুহুন্না ইল্লার রহমান…” তারা কি দেখে না, তাদের ওপরের পাখিরা কীভাবে ডানা মেলে ও গুটিয়ে নেয়? তাদের ধরে রাখেন কেবল রহমান। (৬৭:১৯)
মানুষ আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে, প্রযুক্তি বানায়, কিন্তু কোটি কোটি পাখি হাজার হাজার বছর ধরে উড়ে বেড়াচ্ছে তাঁরই ইশারায়। বৃষ্টি বর্ষাও, শস্য জন্মাও, সূর্যোদয় ঘটাও—মানুষের ক্ষমতা কতটুকু? এই প্রশ্নই অহংকারকে গুঁড়িয়ে দেয়।
সূরার শেষ দিকে আল্লাহ মানুষকে তার তিন আমানতের কথা স্মরণ করান: “আল্লাযী জা‘আলা লাকুমুল আরদা যালূলান ফামশু ফী মানাকিবিহা…” এবং তিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন…
“ওয়া লাকাদ খালাকনাল ইনসানা ওয়া না‘লামু মা তুয়াসুইসু বিহী নাফসুহু…” আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং জানি তার অন্তরে কী কুমন্ত্রণা দেয়। (৬৭:১৫–১৬)
শ্রবণ, দৃষ্টি, হৃদয়—এই তিনটি আমানত। এগুলোর সঠিক ব্যবহারই মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যায়। আর অপব্যবহার? জাহান্নামের আগুন। সূরার শেষ আয়াতগুলো যেন একটি আয়না—যেখানে মানুষ নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে শিহরিত হয়।
সূরা আল-মুলক একটি যাত্রা। অহংকার থেকে নম্রতায়, অবহেলা থেকে সচেতনতায়, অন্ধত্ব থেকে দর্শনে। এই সূরা পাঠ করলে মনে হয়, আকাশ যেন নেমে আসে হৃদয়ে। আর হৃদয় উঠে যায় আকাশে। একটি প্রশ্ন থেকে যায়: তুমি কার ওপর ভরসা করো? কার কাছে ফিরবে?
যে রাতে এই সূরা পাঠ করে ঘুমায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাকে কবরের আযাব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। কারণ এই সূরা কেবল একটি সূরা নয়—এ এক জীবন্ত দর্পণ, যেখানে মানুষ নিজেকে এবং তার স্রষ্টাকে একসাথে দেখতে পায়।
তাই রাত গভীর হলে আকাশের দিকে তাকাও। নক্ষত্রের ঝিলিকে শোনো এক অদৃশ্য শাসকের বার্তা: তুমি একা নও। তুমি পর্যবেক্ষিত। তুমি ভালোবাসা। আর তুমি দায়বদ্ধ।
তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক। বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে সমগ্র শাসন।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
আপনার মতামত লিখুন :