
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান কবি রেজাউল করিমের ‘বিছানা’ শিরোনামের সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর কবিতাটি মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের সম্পর্ককে এক অন্তরঙ্গ দার্শনিক মাত্রায় উপস্থাপন করেছে। এখানে মৃত্যু কোনো আতঙ্ক নয়, বরং এক অনিবার্য ও শান্ত সমাপ্তি; এখানে শোক নয়, বরং রয়েছে উপলব্ধি, রয়েছে আত্মস্থ বোধ। কবিতার কেন্দ্রীয় প্রতীক ‘বিছানা’ হয়ে উঠেছে জীবনের শুরু ও সমাপ্তির একটি নিরবধি প্রতিচ্ছবি।
জন্ম-মৃত্যুর দ্বৈত সত্তা: আলো ও আঁধারের অনুপম উপমা:
“জন্ম-মৃত্যু, রোগ-শোক যেন আলো ও আঁধার
জন্ম থেকে জন্মান্তরে তারা যেন গলাগলি করে চলে—”
এই পঙ্ক্তিতে কবি জন্ম ও মৃত্যুর চিরায়ত দ্বন্দ্বকে উপস্থাপন করেছেন আলো ও অন্ধকারের অনুপম রূপকে। জীবনের আনন্দ যেমন আলো, তেমনি মৃত্যুবোধ এক অনিবার্য ছায়া। এই দ্বৈততার মধ্যেই জীবনের পূর্ণতা নিহিত।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মির্জা গালিবের সেই চিরন্তন প্রশ্নের স্মরণ করিয়ে দেয়—
“মৃত্যু নির্ধারিত, তবু রাতে ঘুম আসে না কেন?”
তবে গালিব যেখানে মৃত্যুকে প্রশ্ন করেন, রেজাউল করিম সেখানে মৃত্যু গ্রহণ করেন এক নিঃশব্দ উপলব্ধিতে।
প্রতীকী ‘বিছানা’: শুরু ও শেষের সেতুবন্ধন
“জন্মের প্রথম ঠিকানা যেমন বিছানা
তেমনি মৃত্যুর শেষ ঠিকানাও মাটির বিছানা।”
এই দুই পঙ্ক্তি কবিতার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে ‘বিছানা’ কেবল ঘুমের স্থান নয়, এটি হয়ে উঠেছে জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক দার্শনিক সেতু। শিশুর জন্ম থেকে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ‘বিছানা’ যেন জীবনের মঞ্চ, যার শুরু ও শেষ উভয়ই নিঃশব্দ।
রবীন্দ্রনাথের জীবন-মৃত্যুর দর্শন ও প্রেমিক মৃত্যুবোধ:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুকে কেবল ক্ষয় নয়, এক নবজন্মের রূপক হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর ‘শেষ লেখা’ কবিতায় পাই—
“মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান”
এখানে মৃত্যু একটি রোমান্টিক প্রতিচ্ছবি—এক প্রেমিকের প্রতীক্ষা। এই ভাবনার সঙ্গে রেজাউল করিমের কবিতার ‘মাটির বিছানা’ যেন মিশে যায় নিঃশব্দতায়। উভয়েই মৃত্যুকে পরিণতির, পরিপূর্ণতার এক রূপ হিসেবে উপলব্ধি করেন।
নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা ও রেজাউলের স্তব্ধতা:
কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের প্রতিটি বেদনাবিন্দুতে মৃত্যু নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। ‘মৃত্যুক্ষুধা’ কবিতায় তিনি লেখেন—
“মৃত্যু আমার এত প্রিয় ছিল, ধরা দিল না সে তাই—”
নজরুলের মৃত্যু ভাবনা একাধারে আকুতি ও অভিমান। তিনি মৃত্যু চেয়েছেন মুক্তি হিসেবে, কিন্তু তবু তা অধরা থেকেছে। সে তুলনায় রেজাউল করিমের কবিতায় মৃত্যু আসে বিনয়ের সঙ্গে, কোনো অভিমান নেই, কেবল একটি শান্ত স্বীকারোক্তি।
জীবনানন্দীয় ধ্বনি ও ভাষার সংহতি
রেজাউল করিমের ভাষা নিরুপদ্রব, অলংকারমুক্ত; তবে তাতেই নিহিত গভীরতা। ছোট্ট কবিতার মধ্যে তিনি যে দার্শনিক সুর বুনেছেন, তা বাংলা কবিতায় এক অনন্য সংযোজন। সংক্ষিপ্ত কবিতার মধ্যে একটি গভীর জীবনতত্ত্ব চিত্রিত করার যে ক্ষমতা তিনি দেখিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল নয়, কিন্তু উল্লেখযোগ্য। তিনি ছোট্ট এই কবিতায় আবেগের চেয়ে বোধকে প্রধান্য দিয়েছেন। এই ভাবনার অনুরণন পাওয়া যায় জীবনানন্দ দাশের লেখায়ও—
“মৃত্যু আমার কাছে এক ঘুমন্ত নদীর মতো আসে”
রেজাউলের ‘মাটির বিছানা’ যেন জীবনানন্দের ‘ঘুমন্ত নদী’র মতোই নিঃশব্দ, স্থির, গভীর।
‘বিছানা’—এক প্রতীকী পরিভাষা:
এই কবিতায় ‘বিছানা’ হয়ে ওঠে সময়ের প্রতীক। এখানে মানুষ জন্মায়, বিশ্রাম নেয়, ক্লান্ত হয়, অসুস্থ হয়, এবং অবশেষে নিঃশেষ হয়। এটি শুধুই বাস্তবতা নয়, বরং সময়, শরীর, ক্লান্তি, স্বপ্ন এবং অবসানের একটি রূপক। এক অর্থে বিছানা হয়ে ওঠে জীবনের প্রতীকী মঞ্চ, যেখানে সমস্ত নাট্য রচিত হয়, কিন্তু দর্শকশূন্য এক সময়—মৃত্যু—সব শেষ করে দেয়।
অন্তর্জিজ্ঞাসার দ্বারপ্রান্তে:
রেজাউল করিম আমাদের সামনে প্রশ্ন রেখে যান—জীবন কি কেবল বিছানায় ঘুমিয়ে থাকারই প্রতিকৃতি? নাকি এর মাঝে জেগে ওঠারও এক আকুতি আছে? মৃত্যু আমাদের যাত্রার একমাত্র গন্তব্য হলে, তবে যাপন কি শুধুই অপেক্ষা? কবি যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন আমাদের বিবেকের গভীরে।
উপসংহার: এক দার্শনিক আশ্রয়:
‘বিছানা’ কবিতাটি মৃত্যু নিয়ে নয়, বরং মৃত্যুতে পৌঁছানোর গভীর বোধ নিয়ে লেখা। কবি মৃত্যুতে ভয় পান না; বরং আত্মস্থ এক উপলব্ধিতে পৌঁছান। কবিতাটি যেন জীবনের এক দার্শনিক সংলাপ—যেখানে গালিবের প্রশ্ন, রবীন্দ্রনাথের প্রেম, নজরুলের অনুযোগ, জীবনানন্দের স্তব্ধতা— সব মিলিয়ে রেজাউল করিমের কবিতা হয়ে ওঠে জীবন ও মৃত্যুর এক নিঃশব্দ সংলাপ।
এই কবিতা শুধু একটি কবিতা নয়, এটি মানুষের সময়চেতনা, অস্তিত্ব ও পরিণতির এক অনুপম শিল্পরূপ।
এটি শুধু একটি কবিতা নয়—এটি মানুষের অস্তিত্ব, সময়, পরিণতি ও শান্তির চিরন্তন অন্বেষণের অনুপম শিল্পরূপ।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :