
মানুষের জীবনে এমন কিছু অনুভূতি থাকে যা তাকে বারবার ভাবায়, মুগ্ধ করে, কখনোবা নিয়ে যায় এক অনন্ত অতলান্তে। ভালোবাসা এমনই এক রহস্যময় স্রোত, যা যুগ যুগ ধরে মানব হৃদয়কে দোলা দিয়ে আসছে। এ কেবল ক্ষণিকের মোহ বা শারীরিক আকর্ষণ নয়; এ এমন এক গভীরতম অন্বেষণ যেখানে শ্রদ্ধা, আত্মনিবেদন আর উপলব্ধির মেলবন্ধন ঘটে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের সেই আর্তির মতো, “ভালোবেসে মিটল না সাধ, কুলাল না এ জীবনে; হায়- জীবন এত ছোট কেনে?” – এই বাক্যবন্ধ যেন ভালোবাসার চিরন্তন অপূর্ণতার কথাই বলে। কিন্তু ভালোবাসা কি শুধু অপূর্ণতার গল্প? নাকি এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন মহিমা, যা আমাদের অস্তিত্বকে এক গভীরতর অর্থে পূর্ণতা দেয়? এই নিবন্ধে আমরা প্রেম, শ্রদ্ধা এবং মোহের জটিল সম্পর্ককে উন্মোচন করার চেষ্টা করব, যেখানে প্রাচীন রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের ভালোবাসার ধারণা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে আমাদের বিশ্লেষণ।
চিরকালীন ভালোবাসা ও তার স্বরূপ
আমরা ভালোবাসি কাকে? এর উত্তর নানাভাবে দেওয়া যায়, অসংখ্য ব্যাখ্যাও পাওয়া যাবে। যদি বলি ভালোবাসাটা চিরকালীন, তবে তার সংজ্ঞা ভিন্ন হবে। যে আপনার মাঝে এক না পাওয়ার অনুভূতি বা না-বোঝার বিস্ময় জাগরুক করতে পারবে, তাকেই আমরা চিরকাল ভালোবেসে যাই। আপনার ভেতর-বাইরের সবটুকু যদি কারো কাছে টলটলে দিঘির পানির মতো মনে হয়, তবে সে প্রেমে হয়তো কিছুদিন সাঁতার কাটা যাবে। কিন্তু একদিন সে দিঘিতেই অনেকের সলিল সমাধি হতে পারে! সুতরাং, যাকে প্রকৃতই ভালোবাসবেন, তাঁর বিস্ময় জাগানিয়া ঢেউতে দুলবেন, কিন্তু কখনো তলিয়ে যাবেন না।
এই চিরকালীন ভালোবাসা যেমন রবীন্দ্রনাথের কথায় ধরা দেয়: “সীমার মাঝে অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর।” যেখানে প্রিয়জনের মধ্যে এক অসীম রহস্যের সন্ধান মেলে, সেই প্রেমই হয়ে ওঠে অমর। আবার কাজী নজরুল ইসলামের “মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেব খোঁপায় তারার ফুল”—এখানেও শুধু বাহ্যিক মুগ্ধতা নয়, বরং প্রিয়জনের প্রতি এক গভীরতর শ্রদ্ধা ও কল্পনার আশ্রয় দেখা যায়, যা ভালোবাসাকে এক ভিন্ন মাত্রা দেয়।
যে আপনার ধেয়ানের বর্ণছটায় ব্যথার রঙে মনকে রাঙিয়ে দিয়ে যায় সর্বদা, সে হয়তো আপনার ধ্যানলোকের কেউ হতে পারে। এখানে লোভ-মোহ থাকাটা স্বাভাবিক। যারা চির অধরা, যারা ‘পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায় ডাক দিয়ে যায় ঈঙ্গিতে’, তারা আপনার মানসলোকের কেউ হতে পারে। তাদের মাঝে নানান রহস্য আবিষ্কার করা যায়। অতলান্ত রহস্যময়তায় আপনি দিশা হারাতে পারেন। এই রহস্যের গভীরতা বা জানার আকুতি আপনার কোনোকালেই ফুরাবে না।
সৃষ্টির প্রতি প্রেম ও মোহগ্রস্ততা
কুঞ্জবিথীর অশোক শাখায় কিংবা পলাশবনে বা মল্লিকা কুঞ্জের ফুলদলগুলি আপনার দৃষ্টিকে প্রসন্ন করতে পারে। কিন্তু এই ফুলদলগুলি বিকশিত করার যে কারিগর, তার গভীরতা অনুসন্ধানেও আপনি প্রেমে পড়তে পারেন। সে প্রেম হবে সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রেম বা আল্লাহর প্রতি ঈমান। এই গভীর উপলব্ধি নজরুলের এই পঙক্তিতে ফুটে ওঠে: “আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়” — যেখানে স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাসই পরম প্রেমের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে, রবীন্দ্রনাথের “তোমারি লাগিয়া, হে প্রিয়, জাগিছে পরাণ”—এই পঙক্তিগুলিও সৃষ্টির প্রতি এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রেম ও আত্মনিবেদনের ইঙ্গিত দেয়।
ফুলদলের বাতাসে দোল খাওয়া, রঙের তুলি কিংবা ভঙ্গি আপনাকে মুগ্ধ-মোহিত করতে পারে। কিন্তু মায়াময় পৃথিবীর মোহ-আচ্ছন্ন প্রেম আপনাকে মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছাতে পারে না। সে প্রেম হবে ‘মিছে এই হেলা-দোলায় মনকে ভোলায়, ঢেউ দিয়ে যায় স্বপ্নে সে’ এর মতো কাব্যিক কোনো ধ্যানলোক।
অন্যকে বড় ভাবা বা বড়র সান্নিধ্য লাভের জন্য যে আকুতি, তা-ই হলো প্রকৃত প্রেম। আবার বড় থেকে ছোটর প্রতি যে আকুতি, তা মোহ বা কামনা হতে পারে। কথায় আছে, ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’। জাতীয় কবিরও সম্ভবত এমন একটি রচনা আছে।
যার কথা, কাজ ও আচরণকে আপনার কাছে বড় মনে হয়, যার কাজ আপনার মনে বিস্ময় জাগিয়েছে, তার জন্য আপনার আকুতি থাকতেই পারে। সে আকুতিই প্রেম। তাকে হারানোর আশঙ্কা করাটা প্রেমেরই আশঙ্কা। যে হারানোর মাঝে আপনার হৃদয় ব্যাকুল ব্যথায় কাতর হয়ে পড়বে, সেটাই আপনার প্রেমকাতরতা বা প্রেমে মগ্নতা। যে প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে আপনি নিজেকে খেলো করেন, তা প্রকৃত প্রেম নয়; সেটি মোহাচ্ছন্নতা। তাতে হৃদয় হয়তো রাত-বিরাতে যথেষ্ট কাতর হয়, কিন্তু বেলা ফুরাবার আগে তা একসময় ‘বাতাসে দোল খেয়ে যায় ঈঙ্গিতে’ হারিয়ে যেতে বাধ্য।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম: শ্রদ্ধা বনাম মোহ
এবার আসি রাধা-কৃষ্ণের ভালোবাসায়। কার মধ্যকার ভালোবাসাকে আপনি প্রকৃত প্রেম বলবেন? যে প্রেমের দীর্ঘশ্বাস এখনো দখিনা হাওয়ায় দোল খেয়ে যায়! যে কাহিনী এখনো অনেকের মনকে অনুরণিত করে! আপনি যখন পুরো রাধা-কৃষ্ণকে আয়ত্তে1 আনবেন, তখন ‘বড়র পিরিতি’ কিংবা ‘ছোটর প্রেম’ আপনার দৃষ্টি খুলে দেবে। প্রেমের ক্ষেত্রে আপনার দৃষ্টিকে তা সংযত-সংহত করবে।
আমরা এই আলোচনায় রাধার প্রেমকেই অগ্রগণ্য করবো। যার প্রেমের দীর্ঘশ্বাসে এখনো মধুর বাঁশরী বাজে, দ্যুলোকে-ভূলোকে যে প্রেম এখনো অমর। কৃষ্ণের ষোলশ’ গোপিনী ছিল; তার প্রেমকে কিভাবে খাঁটি প্রেম বলা যায়? সে তো ছিল কৃষ্ণের মোহ বা লালসা। অপরপক্ষে, রাধার প্রেম ছিল দীর্ঘশ্বাস আর দুঃখ-ক্লিষ্ট রক্তজবার মতো; যা এখনো কোটি হৃদয়ে ফুটে আছে। রাধার প্রেম বড়ই বিস্ময় জাগানিয়া! যে কৃষ্ণের ভোগে ছিল ষোলশ’ গোপিনী, তাকে কেন রাধা ভালোবেসেছিল? কারণ রাধার কাছে কৃষ্ণ অনেক বড় ছিল। রাধা তাকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারত না। কৃষ্ণের বড়ত্ব রাধার কাছে দুর্বোধ্য ছিল। কৃষ্ণ যেন বড় গাছের মগডালে ফোটা অর্কিডের একটা ফুল। শত চেষ্টায়ও রাধা সেটি ধরতে পারত না! যে ফুল ধরা দেবে দেবে বলেও পালিয়ে বেড়ায় ইঙ্গিতে, সে-ই হচ্ছে কৃষ্ণ। যেমন বৈষ্ণব পদাবলীতে বৃষ্টিস্নাত রাধার যে রূপ বর্ণিত হয়েছে— “এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা, কেমনে রাধা যাবে যমুনা” কিংবা “এমনও দিনে তারে বলা যায়, এমনও ঘন ঘোর বরিষায়” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) —এসব পদ রাধার প্রেমের গভীরতা ও দুর্নিবার আকর্ষণেরই ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল বাহ্যিক রূপের প্রতি মুগ্ধতা নয়, বরং প্রিয়জনের জন্য গভীরতম আকাঙ্ক্ষা ও ত্যাগ স্বীকারের নাম।
রাধা-কৃষ্ণের এই কাহিনী পুরাকালের। সময় পাল্টেছে, সভ্যতার পুনর্বিন্যাস হয়েছে। যুগ বদলায়, সাথে সময়ও। সুতরাং কাহিনীর রং ও চরিত্রও পাল্টাবে, সেটাই স্বাভাবিক।
কৃষ্ণ এত বড় বলেই রাধার কাছে প্রেমের ভাবনাটা এমন মহান ছিল। যে প্রেমে আছে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। আছে এক স্বপ্নভরা আশা। আর রাধার গুরুত্ব কৃষ্ণের কাছে কতটুকু? যার ছিল ষোলোশ’ গোপিনী,2 কৃষ্ণের কাছে রাধা ছিল ষোলশ’র মাঝে একজন গোপিনী মাত্র! কিন্তু হায়, রাধা কি সেটি বুঝেছিল? সুতরাং কৃষ্ণের কাছে রাধার অস্তিত্ব ছিল বড়ই তুচ্ছ। যার মাঝে ছিল না সম্মান, না ছিল শ্রদ্ধা! অস্তিত্বের তুচ্ছতার ঘেরাটোপে রাধা সেখানে অতিসাধারণ একজন মানবী মাত্র। সেজন্য রাধার প্রতি জ্বালাময়3 কোনো ভালোবাসা কৃষ্ণের থাকার কথা ছিল না।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসে প্রেমের স্বরূপ
এবার আমার পড়া একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস থেকে কিছু তথ্য ধার নেব। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বিংশ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘কবি’ উপন্যাস। এখানে প্রেমের বিচিত্র একটি উপাখ্যান খুঁজে পাওয়া যায়। এ উপন্যাসেও ‘শ্রদ্ধা’ আর ‘বড়ত্ব’-এর মাঝে প্রেমকে খুঁজে পাই। কীভাবে? এবার আসি সে আলোচনায়।
ঠাকুরঝি ও নিতাইচরণ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। বলে রাখা ভালো, এখানে আরও নায়িকা আছেন। ঠাকুরঝি ও নিতাইচরণের পরিচয় অনেকদিনের। ঠাকুরঝি বিবাহিতা। তাদের মাঝে প্রথম দেখায় ভালোবাসা হয়নি। নিতাইচরণ ছিল অন্য দশজন মানুষের মতোই ঠাকুরঝির কাছে। একইভাবে, নিতাইচরণের কাছেও ঠাকুরঝি ছিল অন্য দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই। সুতরাং, সেখানে ছিল না প্রেমের কোনো ছোঁয়া।
ঠাকুরঝি ছিল সদা হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত এক তরুণী। সে ছিল কবিগানের ভক্ত। তার গায়ের রং কালো ছিল। তা নিয়ে অনেকে ঠাট্টা করলে নিতাই একটি গান লেখে এভাবে—
“কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দো কেনে/ কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছো কি নয়নে।”
এ গান অন্য দশজনের মতো ঠাকুরঝির মন ছুঁয়ে যায়। একসময় সাধারণ নিতাইচরণ ঠাকুরঝির কাছে অসাধারণ হয়ে উঠলো। কীভাবে নিতাইয়ের প্রেমে হাবুডুবু খেলো ঠাকুরঝি?
যখন ঠাকুরঝি বুঝতে পারল, তার চিরচেনা এই নিতাই তো সাধারণ কোনো মানুষ নন! সে তো একজন কবি! অনেক বড়, একজন উঁচু দরের মানুষ। এতদিনের চেনা-জানা নিতাইয়ের মধ্যে ঠাকুরঝি হঠাৎ অপ্রত্যাশিত একজনকে আবিষ্কার করল। সে কারণে বড়র প্রতি ঠাকুরঝির মাঝে প্রেমের প্রাবল্য বেড়ে গেল। এখন থেকে তার চোখে নিতাই সাধারণ কোনো মানুষ নন, সে একজন ঈপ্সিত নায়ক! যে কবিগানে মঞ্চে মুহুর্মুহু করতালিতে অভিনন্দিত হয়েছেন! তাই নিতাইয়ের প্রেম পাওয়া ঠাকুরঝির আরাধনার বিষয় হয়ে উঠলো। যেমন করে দেবতার প্রতি ভক্ত আত্মনিবেদনে উদ্বেল হয়ে ওঠে। বড়র পিরিতি যেমন বালির বাঁধ হতে পারে, তেমনি আবার উপন্যাসের ঠাকুরঝির মতো প্রেমান্ধ ও আত্মধ্বংসীও হতে পারে।
ঠাকুরঝির প্রতি নিতাইয়ের মোহাচ্ছন্নতা ছিল, প্রেম ছিল না। তাই ঠাকুরঝির প্রতি তার প্রেম সহজে উবে গেছে। কারণ ঠাকুরঝি ছিল তার কাছে অন্য দশজন নারীর মতোই, যেখানে অসাধারণত্বের কিছু নেই। সেখানে নিতাইয়ের চোখে আলাদা কোনো আলো ছিল না; যে আলো ছিল ঠাকুরঝির চোখে। তাই ঠাকুরঝির চোখে দেখা যায় প্রেমের সর্বগ্রাসী বৈভব। নিতাইয়ের কাছে তা অতিশয় সামান্য। তাই অবলীলায় ঠাকুরঝিকে নিতাই ছেড়ে যেতে4 বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি।
একদিন ঠিকই নিতাইচরণ অবলীলায় চলে যায়। সে ঝুমুর দলের সাথে গান গাওয়ার আহ্বান পেয়ে বেরিয়ে পড়ে। পেছনে প্রেমাকাঙক্ষার হাহাকারে প্রজ্জ্বলিত হতে থাকে ঠাকুরঝির দেহ-মন। মনের খেয়ালে ঝুমুর দলে গান গাইতে থাকে নিতাই। একসময় ঝুমুর দলের প্রধান নর্তকী ও গায়িকা বসন্তের প্রেমে হাবুডুবু খায় নিতাই। কিন্তু নিতাইয়ের প্রতি বসন্তের প্রেম ঠাকুরঝির মতো শ্রদ্ধা-সম্মানে প্রাবল্য ছিল কি? তা অবশ্য আলোচনা সাপেক্ষ।
নিতাইয়ের জীবনে সুখ স্থায়ী হয়নি। দুঃখের কালিমা আচ্ছন্ন করে তার জীবনকে। অবশেষে5 কী হয় নিতাইয়ের? সে কি ঠাকুরঝির দেখা পায়? তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ‘কবি’ উপন্যাসে তার বিবরণ দিয়েছেন যথেষ্ট মুন্সিয়ানায়।
এই উপন্যাসের শেষে আমরা দেখতে পাই নিতাই ফিরে এসেছিল। ঠাকুরঝির খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারে ঠাকুরঝি আর নেই, ঠাকুরঝি পাগল হয়ে মরে গেছে, তখন নিতাইয়ের মনে তুফান ছুটলো। চোখের পানিতে সে বলে উঠলো—’জীবন এতো ছোট কেনে?’ তখন নিতাই গেয়ে উঠলো—
“এই খেদ আমার মনে-
ভালোবেসে মিটল না সাধ, কুলাল না এ জীবনে।
হায়- জীবন এত ছোট কেনে?”
আপাত দৃষ্টিতে এই কবিতাটি নিতাইয়ের গভীর ভালোবাসার অনুরাগ মনে হতে পারে। কিন্তু এটি ঠাকুরঝির প্রতি নিতাইয়ের প্রকৃত প্রেমোচ্ছ্বাস? গভীর অনুরাগ? এটি হতে পারে পরাজিত নিতাইয়ের আত্মসান্ত্বনার7 খেলো উচ্চারণ মাত্র।
এই উপন্যাসে ঠাকুরঝির প্রেমোচ্ছ্বাস গভীর থেকে গভীরতর। সে নিতাইকে ভুলে যায়নি। নিজেকে ধ্বংস করেই প্রমাণ করলো সে নিতাইকে গভীর শ্রদ্ধায় পরম আকাঙ্ক্ষায় ভালোবেসেছিল। এই হচ্ছে প্রকৃত প্রেম। একই কারণে আমরা দেখতে পাই বঙ্কিমের ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’ ভ্রমরের জন্য গোবিন্দলালের ভালোবাসা প্রবল হয়নি।
যে মানুষকে আমরা শ্রদ্ধা-ভালোবাসার আসনে সমাসীন করতে পারি, সে প্রেম সহজে শেষ হওয়ার নয়। যাকে নিয়ে আমরা গর্ব অনুভব করি, তার প্রেম থেকে সহজে মুক্তি মেলা ভার।
আধুনিক প্রেমের স্বরূপ
ফেসবুক কিংবা যোগাযোগের সহজ মাধ্যমের যুগে সহজে প্রেম গড়ে উঠতে পারে। তবে এই প্রেম প্রধানত শ্রদ্ধার ওপর গড়ে উঠে না। তা নিতান্তই গড়ে উঠে হৃদয়ের চাওয়ায়। সেখানে বিবেক মাথা উঁচু করে না। সেখানে শুধু হৃদয়ের তপ্ত, উচ্ছ্বসিত আবেগের প্রাবল্য দেখা যায়। যেখানে রাত নেই দিন নেই। রাত-বিরাতে লাইভে আসা, ফোনালাপ, প্রেমালাপ! আরও কতো কী!
যেমন- লাইলি-মজনু, ইউসুফ-জুলেখা, রুমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদ, দেবদাস-পার্বতীর প্রেমকে আমরা এই প্রেমের কাতারে ধরতে পারি। ম্যাসেঞ্জার আর যোগাযোগের সহজ মাধ্যমের যুগে অধিকাংশ মানব-মানবীর প্রেমই এই জাতের! এই প্রেম হৃদয়োচ্ছ্বাস যেমন বাড়ায়, তেমনি বাড়ায় বিপদগামিতাও। সবদিক দিয়ে এই প্রেম বিপজ্জনকও বটে। কাম-মোহ-স্বার্থ ফুরালে এই প্রেমের ঘোর সহজেই কেটে যায়। দিনশেষে তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসের নিতাইয়ের মতো খেদ জীবনে বইয়ে বেড়াতে হয়—
“ভালোবেসে মিটল না সাধ, কুলাল না এ জীবনে।
হায়- জীবন এত ছোট কেনে?”
কান পাতলে শুনবেন, ওদের মাঝে প্রেম ছিল, এখন ছাড়াছাড়ি। কারণ অনুসন্ধানে দেখবেন, সেখানে প্রেম ছিল না; শুধুই মোহ আর স্বার্থ ছিল। তাই দিনশেষে কর্পূরের মতো উবে গেছে প্রেম। প্রেম আর আবেগ এক জিনিস নয়। মানুষের কাছে আবেগের ভিত্তি আছে বটে, তবে তা একসময় উবে যায়। অনেকে অন্ধ আবেগে মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমকে হেলা করে। দিনশেষে তার প্রেমের আবেগ ঝরা ফুলের মতো পায়ের কাছে পড়ে থাকে। একসময় শুকিয়ে যায়। আর শ্রদ্ধা-ভালোবাসার প্রেম! সে তো বিশ্বভূবনে সদা জাগরুক!
পরিপূরক প্রেম
আবার এক ধরণের প্রেম আছে যেটি একে অপরের পরিপূরক। সে প্রেম গভীর, চিরস্থায়ী। এই প্রেমকে পরিপূরক প্রেম বলা যেতে পারে। আবারও তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসের চরিত্র থেকে উদাহরণ নেওয়া যাক।
নিতাইচরণ ঠাকুরঝির প্রেম উপেক্ষা করে ঝুমুর দলে যোগ দেয়। ঝুমুরের প্রধান গায়িকা ও নর্তকী বসন্তকে সে ভালোবাসে। নিতাই গান লেখে আর তা গেয়ে বসন্ত নাচে। নিতাইয়ের এতে ভালোলাগার উন্মাদনা বেড়ে গেলো। বসন্ত যখন মারা যায়,8 সেই দিনগত রাতে নিতাই সারারাত শ্মশানে বসে বসন্তের ফিরে আসার অপেক্ষা করেছিল। নিতাইয়ের ধারণা ছিল, দেহ, ঘর, সংসার-স্বজন পৃথিবী হারিয়ে দেহের মমতায় আত্মা অনেক সময় কেঁদে বেড়ায়। গভীর নিশীথ রাতে যদি বসন্তের আত্মা তার সুন্দর দেহখানির খোঁজে আবার ফিরে আসে! সে আশায় নিতাই সারারাত চিতায় বসে ছিল। যদি ফিরে আসে তার বসন্ত! মনে মনে নিতাই বলছিল, “বসন এস!…বসন এস! বসন এস!”
কিন্তু বসন তো বাস্তবে আর আসেনি! সারারাত নিতাই শ্মশানে কাটিয়ে দিল। গভীর রাতে শ্মশানে শিয়াল, কুকুর, শকুন আসলো। তারা ঝগড়া করলো, খেলা করলো। পাশে গঙ্গায় কুলুকুল ধ্বনিতে পানি বয়ে গেল। কিন্তু বসন এলো না! শ্মশান থেকে নিতাই ফিরে আসলো। তখন নিতাই গানের দু’টি কলি আবৃত্তি করলো—
“সে বিনে প্রাণে বাঁচিনে- ভূবনে ভূবনে রহি কেমনে?
আমি যাব সেই পথে, যে পথ লাগে ভাল নয়নে।”
এখানে নিতাইয়ের প্রেমে আমরা গভীর আবেগ দেখতে পাই। কারণ নিতাইয়ের লেখা গানে সুর আর নৃত্যের ছন্দে9 বসন্ত তাকে উন্মাতাল করতো। তাই বসন্তের মাঝে নিতাই তার জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছিল। এই পরিপূরক প্রেমকে রবীন্দ্রনাথের এই পঙক্তিতেও খুঁজে পাওয়া যায়: “আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে/ তোমারি পথ চেয়েছি।” এবং নজরুলের “মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান” — যেখানে দুটি ভিন্ন সত্তা একে অপরের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে, তাদের মিলন ছাড়া কোনোটিরই পূর্ণতা আসে না। এজন্যই এই প্রেম মুছে যাওয়ার নয়। নিতাইয়ের কাছে এই প্রেম শুধু আবেগ বা শ্রদ্ধার স্বার্থে নয়, পুরো জীবনের স্বার্থে। এজন্যেই এই প্রেম চিরায়ু।
উপসংহার
আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, ভালোবাসা একটি বহুমুখী ও গভীর অনুভূতি। এটি কেবল জাগতিক আকর্ষণ বা ক্ষণিকের মোহের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং শ্রদ্ধা, বিস্ময় এবং ত্যাগের মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলী দ্বারা পরিপুষ্ট। নিতাই-ঠাকুরঝি, রাধা-কৃষ্ণের উপাখ্যান এবং আধুনিক প্রেমের বিভিন্ন দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আমরা দেখেছি যে, যেখানে শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক উপলব্ধির অভাব ঘটে, সেখানে প্রেম ক্ষণস্থায়ী হয়। প্রকৃত ভালোবাসা সেই অদৃশ্য বন্ধন, যা হৃদয়কে উচ্চতর উপলব্ধির দিকে ধাবিত করে এবং যুগ যুগ ধরে অমর হয়ে থাকে। এটি শুধু পাওয়া নয়, বরং এক চিরন্তন অন্বেষণ, যেখানে ‘সাধ মেটে না’ তবুও জীবন ভরে থাকে এক গভীরতম অনুরাগে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ১১ জুন ২০২৫ খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :