
বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান ছিল বহুমুখী। তাঁর ইসলামী গানগুলো শুধু উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেগুলো জাগিয়ে তুলেছে মানবিকতার এক নতুন সুর। “ঈদজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দুস্রা ঈদ” তেমনই এক ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। এটি ঈদ-উল-আযহার হাস্যোজ্জ্বল আগমনকে চিত্রিত করে। একইসাথে, ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ)-এর আত্মত্যাগের মহিমা স্মরণ করিয়ে দেয়। গানটি আত্মশুদ্ধির বার্তা দেয়। এটি ভেতরের পশুত্বকে কোরবানির আহ্বান জানায়। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একতাবদ্ধ হয়ে সমাজের কল্যাণে কাজ করার গভীর বার্তা নিয়ে আসে।
গানের মূলভাব ও প্রেক্ষাপট:
ইসলামী অনুশাসন ও রীতি অনুযায়ী, ঈদজ্জোহা বা ঈদ-উল-আযহা দ্বিতীয় ঈদ। এটি হিজরি জ্বিলহজ মাসের ১০ তারিখে উদযাপিত হয়। জ্বিলহজের ৯ তারিখের রাত থাকে চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত। তাই এই গানের স্থায়ী অংশে কবি এই চাঁদকে সহাস্য ‘ঈদজ্জোহার চাঁদ’ বলেছেন। এটি উৎসবের আগমন বার্তা ঘোষণা করে। এই ঈদে আল্লাহর নির্দেশ মেনে কোরবানি দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গানের এই অংশে কবি ইসলামী ধর্মদর্শনের গভীরতা তুলে ধরেছেন। গজল সুরের আঙ্গিকে রচিত এই গানে ছয়টি স্তবকে স্বতন্ত্র ভাব ফুটে উঠেছে। তবে প্রতিটি স্তবকের মধ্যে রয়েছে ভাবনার এক সুদৃঢ় যোগসূত্র।
পঙক্তিভিত্তিক আলোচনা ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য:
গানটির প্রতিটি পঙক্তি গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি কবির আবেগ ও আধ্যাত্মিক যাত্রাকে তুলে ধরে:
এই পঙক্তিগুলো ঈদ-উল-আযহার আগমনী বার্তা তুলে ধরে। এটি আল্লাহর নির্দেশে কোরবানির গুরুত্ব বোঝায়। ঈদ-উল-আযহা দ্বিতীয় ঈদ রূপে ফিরে এসেছে। ঈদের চাঁদ হাসছে। এটি উৎসবের আগমন ঘোষণা করে। কবি সকলকে কোরবানি দিতে বলছেন। এটি আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: “সুতরাং আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত পড়ুন এবং কোরবানি করুন।” (সূরা আল-কাউসার ১০৮:২)। এই আয়াত সরাসরি কোরবানি করার নির্দেশ দেয়।
এই স্তবকটি হজরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর ত্যাগের কথা বলে। আল্লাহর নির্দেশে তিনি পুত্র ইসমাইল (আঃ)-কে কোরবানি দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কুরআনের সূরা আস-সাফফাত (৩৭:১০২-১০৭) এ এই আত্মত্যাগের মর্মস্পর্শী বর্ণনা রয়েছে। কবি তেমনই ধর্মপ্রাণ হতে বলেছেন। আল্লাহর পথে নিজেকে উৎসর্গ করে শহীদ হওয়ার মর্যাদার কথা বলেছেন।
এখানে কোরবানির গভীর অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মানুষের ভেতরের পশুত্বকে (হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, জুলুম) কোরবানি দিতে হবে। এটি এক পূণ্যময় উৎসব। কোরবানি হলো পুলসেরাত পার হওয়ার আগাম রসিদ। পুলসেরাত হলো বেহেশতে যাওয়ার সেতু। শেষ বিচারের দিনে মুমিন মুসলমানরাই কেবল এটি পার হতে পারবেন। নজরুলের “মহরম” কবিতার গভীর পঙক্তিটিও এখানে প্রাসঙ্গিক: “কোরবানি, কোরবানি! কিশলয় আজ কঙ্কালসার, ছিন্ন-শিরের শিরস্ত্রাণি! কোরবানির অর্থ বুঝি আত্মত্যাগ!” – এটিও কোরবানির গভীর তাৎপর্যকে আত্মত্যাগের সঙ্গে একীভূত করে।
এই পঙক্তিগুলোতে নজরুল ইসলাম মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি এবং বিভেদ ভুলে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি চান, ঈদগাহগুলো যেন শুধু নামাজের স্থান না হয়ে মহামিলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ঠিক যেমন হজের সময় আরাফাতের ময়দান সারা বিশ্বের মুসলমানদের একত্রিত করে। কবি বিশ্বাস করেন, যদি সকল মুসলমান ভেদাভেদ ভুলে একত্রিত হয়, তাহলে তা হজের চেয়েও বেশি সওয়াব বয়ে আনবে। এই ঐক্যের মাধ্যমেই ইসলামের বিজয়-ডঙ্কা নতুন করে বেজে উঠবে। মুসলিম বিশ্বে নতুন আশা (উমীদ্) সঞ্চারিত হবে।
কুরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৩)। এই আয়াত মুসলিমদের ঐক্যের অপরিহার্যতা বোঝায়, যা কবির আহ্বানের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।
নজরুল ইসলাম তাঁর অন্যান্য রচনায়ও বারবার সাম্য ও ঐক্যের কথা বলেছেন। এই পঙক্তিগুলো তাঁর সেই সার্বজনীন মানবিকতারই প্রতিচ্ছবি। তাঁর বিখ্যাত “মানুষ” কবিতার পঙক্তি: “গাহি সাম্যের গান— মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” এই পঙক্তি ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সকল মানুষের একতার বার্তা দেয়। এটি ‘ঘরের বিবাদ’ ভুলে এক হওয়ার কবির আহ্বানেরই সম্প্রসারিত রূপ।
হজের সময় আরাফাতের ময়দানে বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে আগত মুসলমানরা একত্রিত হয়। এটি বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের প্রতীক। পঙক্তিতে গ্রামগুলোকে ‘আরাফাত ময়দান’ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান এই বিশ্বজনীন ঐক্যের ধারণাকে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে আসে।
কবি আশা করেছেন, প্রতিটি মুসলমানের মনে ইসমাইল (আঃ)-এর মতো দৃঢ়তা জাগুক। আল্লাহর পথে নিজেকে কোরবানি করার এই দৃঢ়তা প্রয়োজন। এমনটা হলে, মুসলিমদের মাঝে দিশারি মুসা (আঃ) ও সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো ত্যাগী আদর্শবান মহাত্মাদের দেখা মিলবে। নজরুলের “ফজরের আজান শুনিতে যে দিল জাগে” গানটিও আত্মিক জাগরণের কথা বলে, যা এই অংশে বর্ণিত ঈদের প্রকৃত চেতনার সাথে সম্পর্কিত।
ধর্মীয় ও সামাজিক তাৎপর্য:
নজরুলের এই গানটি ঈদ-উল-আযহার ধর্মীয় তাৎপর্যকে গভীরতর করে তোলে। এটি শুধু একটি উৎসব নয়। এটি আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ ও আত্মবিলোপের উদযাপন। কোরবানি নিছক পশুবলি নয়। তা আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু উৎসর্গ করার প্রস্তুতিকে বোঝায়। তকবির ধ্বনি মুসলিমদের আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণায় এক কাতারে দাঁড় করায়। এটি ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক। এই গানটি ঐতিহাসিক ত্যাগের মহিমা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ) আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় এই ত্যাগ প্রদর্শন করেছিলেন।
তবে এই গানটির মূল শক্তি এর শক্তিশালী সামাজিক বার্তায় নিহিত। এটি প্রচলিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে। সমাজের প্রতি মানুষের গভীর দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কবি দৃঢ়ভাবে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও দানের অপরিহার্যতার উপর জোর দিয়েছেন। হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন: “সে মুমিন নয় যে পেট ভরে খায়, আর তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।” (আল-আদাব আল-মুফরাদ, হাদিস ১১২)। তিনি লোকদেখানো ইবাদতের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত ধর্ম কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নয়। এটি মানবসেবায় নিহিত। কুরআনে সূরা মাউন (১০৭:১-৭) এ এতিম ও মিসকিনদের প্রতি অবহেলার কঠোর নিন্দা করা হয়েছে: “তুমি কি তাকে দেখেছ, যে দীনকে অস্বীকার করে? সেই তো ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়। আর মিসকীনকে খাদ্যদানে উৎসাহিত করে না।”
এই গানটি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং ভেদাভেদহীন এক সমাজের স্বপ্ন দেখায়। নজরুলের মতে, প্রকৃত ঈদ তখনই আসে যখন সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। যখন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ঘুচে যায়। এবং সকলে একে অপরের প্রতি যত্নশীল হয়। হাদিসে এসেছে: “ঈদ তাদের জন্য নয় যারা নতুন পোশাক পরে, বরং ঈদ তাদের জন্য যাদের আনুগত্য (আল্লাহর প্রতি) বৃদ্ধি পায়।” (হাসান বসরীর একটি উক্তি)।
রচনাকাল, প্রকাশনা ও পর্যায় তথ্য:
কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান “ঈদজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দুস্রা ঈদ” এর রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায় না, তবে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মোহাম্মদী পত্রিকায় বৈশাখ ১৩৪০ বঙ্গাব্দে (এপ্রিল-মে ১৩৩৩)। এই সময় কবির বয়স ছিল ৩৩ বছর ১১ মাস। পরবর্তীতে, গানটি ১৩ আষাঢ় ১৩৪০ (২৭ জুন ১৯৩৩) তারিখে প্রকাশিত ‘গুলবাগিচা’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি ‘নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন’ (পঞ্চম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮/মে ২০১১) এর ৭৭ সংখ্যক গান হিসেবেও স্থান পেয়েছে। ১৯৩৩ সালের মে মাসে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪০) এইচএমভি থেকে এর রেকর্ড (নম্বর: এন ৭১০১) প্রকাশিত হয়, যেখানে শিল্পী ছিলেন কে মল্লিক। এস.এম. আহসান মুর্শেদের ‘নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি’ (৩৫শ খণ্ড, একুশে বই মেলা ২০১৩, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা) গ্রন্থে এর স্বরলিপি রয়েছে। নজরুল ইসলাম নিজেই এই গানটির সুর করেছিলেন। গানটি ধর্মসঙ্গীত, বিশেষত ইসলামী গান পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত, যা ঈদজ্জোহা ও মহিমা বিষয়ক। এটি গজলাঙ্গ সুরে, ভৈরবী রাগে এবং কাহারবা তালে নিবদ্ধ।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ০৭ জুন ২০২৫ খ্রি.।
(পবিত্র ঈদ-উল-আযহার দিন রচিত)
আপনার মতামত লিখুন :