নজরুলের হজের আর্তি ও স্বপ্নে নবীজি: ‘আমি হজে যেতে পাইনি ব’লে কেঁদেছিলাম রাতে’


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ৬, ২০২৫, ৭:৫৮ অপরাহ্ন /
নজরুলের হজের আর্তি ও স্বপ্নে নবীজি: ‘আমি হজে যেতে পাইনি ব’লে কেঁদেছিলাম রাতে’

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


কাজী নজরুল ইসলামের এটি একটি অনবদ্য ইসলামী গান। গানটির নাম ‘আমি হজে যেতে পাইনি ব’লে কেঁদেছিলাম রাতে। তাই হযরত এসে স্বপ্নে মাগো ধরেছিলেন হাতে॥’ এটি এক ভক্তের (বা কবির) হজ পালনের গভীর আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে। সেই আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতাও এখানে প্রকাশ পেয়েছে। একটি অলৌকিক স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক প্রশান্তিও গানের বিষয়বস্তু। নবীজি (সা.)-এর প্রতি অসীম ভক্তি ও ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী প্রকাশ এটি।

গানের মূলভাব ও প্রেক্ষাপট:

এই গানে এক মদিনাবাসিনী নারীর কথা বলা হয়েছে। বহুদিন ধরে তাঁর হজে যাওয়ার গভীর ইচ্ছা ছিল। একদিন তাঁর বাবা তাঁকে রেখেই হজে চলে গেলেন। সেদিন এই নারী মদিনায় নবীর কবর ধরে কেঁদেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি কী এমন দোষ করেছি যে, নবী আমার ইচ্ছা পূরণ করলেন না?” সেই রাতেই মহানবী (সা.) তাঁকে খা’বে (খোওয়াবে বা স্বপ্নে) দেখা দেন। তিনি জয়তুন (জলপাই) গাছের শাখা ধরে বললেন, “যাবে কি মোর সাথে”। নবীজি আরও বললেন, এই কল্পতরুর তলে দাঁড়িয়ে কাবা দর্শনে তাঁকেও (নবীজিকে) পাওয়া যাবে। সে রাতে তাঁর (নবীজির) অপূর্ব শুভ্র জ্যোতি দেখা গেল। সকল অজ্ঞনতা ও কলুষতার আঁধার কেটে গিয়েছিল। যেন আনন্দ সাগরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে লাখো মোতির মালা দুলে উঠেছিল। তাঁর সকল জ্বালা জুড়িয়ে গিয়েছিল সেই নবীরূপী কাবা আরফাতে।

মূলত, এই গানে নবি-অনুরাগিণী পূর্ব মহিমার কথা উপস্থাপিত হয়েছে। নবীজি তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তদের ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেন না। তিনি এই নারীকে স্বপ্নদর্শনে তাঁর মনের ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন স্বপ্নলোকে। এই অর্থে গানটিতে মূলত নবির মহিমাই উপস্থাপিত হয়েছে। এই ভক্তিমূলক গানে নজরুলের নবী প্রেমের গভীরতা স্পষ্ট হয়। তাঁর “নবী মোর পরশমণি” গানেও একই প্রেম দেখা যায়। সেখানে তিনি নবীজিকে সকল গুণের আধার এবং মুক্তির পথ প্রদর্শক বলেছেন। একইভাবে, “ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ” গানেও নবীজির প্রতি তাঁর অপার ভক্তি ও প্রেম প্রকাশ পেয়েছে। এটি এই গানের ভক্তের আকুতির সাথে একাত্ম।

পঙক্তিভিত্তিক আলোচনা ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য:

গানটির প্রতিটি পঙক্তি গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি কবির আবেগ ও আধ্যাত্মিক যাত্রাকে তুলে ধরে:

  • “আমি হজে যেতে পাইনি ব’লে কেঁদেছিলাম রাতে। তাই হযরত এসে স্বপ্নে মাগো ধরেছিলেন হাতে॥”

এখানে ভক্তের (কবির) হজে যেতে না পারার গভীর বেদনা প্রকাশ পেয়েছে। এই আর্তি এতটাই তীব্র ছিল যে, রাতের নির্জন প্রহরে তাঁর চোখে জল এসেছে। সেই গভীর শোকের মুহূর্তে স্বপ্নে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ঘটে। তিনি ভক্তকে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁর হাত ধরেছেন। এটি ভক্তের প্রতি নবীজির অসীম করুণা এবং তাঁদের মধ্যেকার গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগের প্রতীক।

  • “যেদিন বাবা গেলেন কাবার হজে বলেছিলাম কাঁদি’, ধ’রে নবীর কবর, বলো, কি দোষ করেছে এ বাঁদী।”

যখন পরিবারের অন্য সদস্যরা হজ পালনের জন্য কাবা শরীফের দিকে রওনা হয়েছেন, তখন ভক্তের (কবির) মনোকষ্ট আরও বেড়ে গেছে। তিনি নবীর রওজা মোবারকের (কবর) দিকে তাকিয়ে কেঁদে কেঁদে আকুতি জানিয়েছেন। যেন বলছেন, “আমার কী এমন অপরাধ যে আমি এই মহতী সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলাম?” এখানে ‘বাঁদী’ শব্দটি চরম বিনয় ও দীনতা প্রকাশ করে। এটি আল্লাহর কাছে নিজের অক্ষমতা ও আকুতি প্রকাশের এক মর্মস্পর্শী চিত্র।

  • “মোর মদিনা-মোহন হঠাৎ শুনলেন কি সেই মুনাজাত – তাই খা’বে এসে বলেছিলেন, ‘যাবে কি মোর সাথে’॥”

এখানে ‘মদিনা-মোহন’ বলতে মহানবী (সা.)-কে বোঝানো হয়েছে। তিনি তাঁর ভক্তদের মন মদিনার প্রতি মুগ্ধ করেন। ভক্ত প্রশ্ন করছেন, তাঁর সেই আকুল প্রার্থনা কি নবীজি শুনতে পেয়েছিলেন? আর সে কারণেই কি তিনি স্বপ্নে এসে তাঁকে সঙ্গ দিতে চেয়েছেন? এটি ভক্তের প্রার্থনার শক্তি এবং নবীজির অপরিসীম ভালোবাসার এক অপূর্ব বর্ণনা। ‘খা’বে’ শব্দটি স্বপ্ন বোঝায়। এটি এই অলৌকিক অভিজ্ঞতার মূল ভিত্তি।

  • “যেন জয়তুন গাছের ডাল ধ’রে মা বললেন আঁখি-জলে, দেখবে কাবা আমায় পাবে, এই কল্পতরু তলে।”

স্বপ্নে নবীজি যেন এক স্নেহময়ী মায়ের মতো (বা মা ফাতিমা কিংবা আয়েশা (রা.)-এর মতো)। তিনি জয়তুন গাছের ডাল ধরে, অশ্রুসিক্ত চোখে বলছেন, “তুমি যখন কাবা দেখবে, তখন আমাকেও পাবে এই কল্পতরু তলে।” জয়তুন গাছ মুসলিম ঐতিহ্য ও বরকতের প্রতীক। এটি পবিত্র ভূমির সাথে সম্পর্কিত। ‘কল্পতরু’ এখানে এমন এক বৃক্ষ যা সব ইচ্ছা পূরণ করে। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ ও বরকতের ইঙ্গিত। এই অংশটি হজের আকাঙ্ক্ষাকে এক গভীর আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত করে। এখানে কাবা দর্শন এবং নবীজির উপস্থিতি একই আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় একাকার হয়ে যায়।

  • “মা হঠাৎ এলো শুভ্র জ্যোতি, আঁধার হল আলা, যেন নীল সাগরের ঢেউ-এ দোলে লাখো মোতির মালা।”

নবীজির এই সান্ত্বনাসূচক কথা বলার পর যেন এক শুভ্র জ্যোতি বা অলৌকিক আলো ঝলমল করে উঠেছে। এই আলোতে সমস্ত অন্ধকার (‘আঁধার’) দূর হয়ে গেছে। সব কিছু আলোকিত (‘আলা’) হয়ে উঠেছে। এই জ্যোতিকে নীল সাগরের ঢেউয়ের উপর ঝলমল করা লাখো মোতির মালার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এটি ছিল অপার সৌন্দর্য, পবিত্রতা এবং অন্তরের প্রশান্তির প্রতীক। এটি ভক্তের আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং স্বর্গীয় আলোর ঝলকানিকে চিত্রিত করে।

  • “মোর সকল জ্বালা জুড়িয়ে গেল সেই কাবা আরফাতে॥”

সর্বশেষ পংক্তিটিতে ভক্তের সব দুঃখ, কষ্ট ও বেদনা দূর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্বপ্নের এই অলৌকিক অভিজ্ঞতা এবং সেই স্বপ্নেই কাবা ও আরাফাতের (হজের মূল স্থান) দর্শন পাওয়ার মধ্য দিয়ে যেন তাঁর হৃদয়ের সকল জ্বালা (‘জ্বালা’) জুড়িয়ে গেছে। এটি হজের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত পরম শান্তি ও তৃপ্তির চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। এটি ভক্তের আত্মাকে সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত করেছে।

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য:

এই গানটি শুধুমাত্র হজ পালনের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে নয়। এটি ভক্ত ও মহানবী (সা.)-এর মধ্যেকার গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে ফুটিয়ে তোলে। এটি একজন মুমিনের জীবনে স্বপ্ন ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির গুরুত্বকে তুলে ধরে। ইসলামী ঐতিহ্যে সৎ স্বপ্নকে নবুয়তের অংশ বা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ হিসেবে দেখা হয়। যেমন, হাদিসে এসেছে: “মুসলমানের স্বপ্ন নবুওয়াতের পঁয়তাল্লিশ ভাগের এক ভাগ।” (সহীহ বুখারী)। এই গানের ভক্তের স্বপ্নও যেন সেই আধ্যাত্মিক সংযোগের এক নিদর্শন।

গানে ব্যবহৃত ‘হযরত’, ‘কাবা’, ‘নবীর কবর’, ‘মদিনা-মোহন’, ‘আরাফাত’ ইত্যাদি শব্দগুলো ইসলামী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যা ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। এই গানটি আল্লাহর রহমত ও নবীর শাফায়াতের প্রতি অটল বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে। যেখানে অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:

“আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন বলো, আমি তো কাছেই আছি। যখন কোনো আহবানকারী আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দেই।” (সূরা বাকারা ২:১৮৬)।

এই আয়াতটি ভক্তের মুনাজাতের (আহ্বান) প্রতি আল্লাহর সাড়ার ইঙ্গিত দেয়। এটি নবীজির মাধ্যমে স্বপ্নে প্রকাশিত হয়েছে।

নজরুল তাঁর অন্যান্য রচনায়ও এই আধ্যাত্মিক ও জাগরণী সুরকে তুলে ধরেছেন। “মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই” গানে তিনি প্রিয় নবীজির সান্নিধ্যের আকুতি প্রকাশ করেছেন। যা এই গানে মদিনায় নবীর কবর ধরে কাঁদার আবেগেরই প্রতিধ্বনি। একইভাবে, “খেয়াপারের তরণী” কবিতায় তিনি আত্মিক যাত্রার কথা বলেছেন। সেখানে মানুষের জীবনকে একটি নদী পার হওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এটি এই গানে বর্ণিত আধ্যাত্মিক সফরের সাথে তুলনীয়।

রচনাকাল, প্রকাশনা ও পর্যায় তথ্য:

  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায় না।
  • প্রথম বেতার প্রচার: এটি প্রথম প্রচারিত হয় ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার ২৫ পৌষ ১৩৪৭)।
  • কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে ‘ঈদজ্জোহা’ গীতিআলেখ্যে গানটি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
  • এ সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বছর ৭ মাস।
  • পাণ্ডুলিপি: গানের মূল পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
  • বেতার প্রচারের বিস্তারিত:
    • প্রচারকারী সংস্থা: কলকাতা বেতারকেন্দ্র।
    • গীতিআলেখ্যের নাম: ‘ঈদজ্জোহা’।
    • তারিখ: ৯ জানুয়ারি ১৯৪১ (বৃহস্পতিবার ২৫ পৌষ ১৩৪৭)।
    • সময়: রাত ৮.০৫ – ৮.৩৯ মিনিট।
    • তথ্যসূত্র: বেতার জগৎ। ১২বর্ষ ১ম সংখ্যা। ১ জানুয়ারি, ১৯৪১। পৃষ্ঠা: ৪২।
  • গ্রন্থভুক্তকরণ: গানটি নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত আছে।
    • গান নম্বর: ১৩৯১ সংখ্যক গান।
    • পৃষ্ঠা নম্বর: ৭৭৯।
  • পর্যায়: গানটির বিষয়াঙ্গ হলো ধর্মসঙ্গীত, ইসলামি গান, এবং নাত-এ-রসুল (নবীজির প্রশংসা বিষয়ক গান)।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ০৭ জুন ২০২৫ খ্রি.