
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।
ইসলামের প্রথম দিনগুলো থেকেই নবী কারীম (সা.)-এর দাওয়াতের ভিত্তি ছিল কোরআনকে বোঝা এবং এর শিক্ষাকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। তাঁর নবুওয়াতী জীবনের প্রতিটি ধাপ ছিল কোরআনের আয়াত নাজিল হওয়া, তা অনুধাবন করা এবং সে অনুযায়ী সমাজকে গড়ে তোলার অবিরাম প্রচেষ্টা। কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজে, বিশেষত বাঙালি মুসলিমদের মাঝে, কোরআন বোঝার এবং এর বুদ্ধিবৃত্তিক মর্মার্থ দিয়ে নিজেদের চিন্তাজগতকে সমৃদ্ধ করার যে গভীর আয়োজন প্রয়োজন, তা যেন বিলীন হয়ে গেছে। আমরা যেন এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার মধ্যে ভাসছি।
অথচ, মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং কোরআনেই এই সমস্যার সমাধান বাতলে দিয়েছেন। সূরা ফুরকানের ৫২ নম্বর আয়াতে তিনি ঘোষণা করেছেন:
فَلَا تُطِعِ ٱلْكَـٰفِرِينَ وَجَـٰهِدْهُم بِهِۦ جِهَادًۭا كَبِيرًۭا
অর্থ: “অতএব তোমরা কাফিরদের অনুসরণ করবে না, এই কোরআন দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বড় জিহাদটি করো।”
এই আয়াতটি কেবল একটি নির্দেশ নয়, এটি একটি রণনীতি। এটি স্পষ্ট করে বলে দেয় যে, মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি কোনো অস্ত্রের ঝনঝনানি বা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে সংঘটিত হয় না, বরং এটি লড়তে হয় চেতনার ভূমিতে, বুদ্ধির ময়দানে। এটি হলো ‘জিহাদে কাবীর’ বা ‘বড় জিহাদ’—যা মানুষের মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তাধারাকে ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গঠন করার জিহাদ। আর এই বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের মোক্ষম ও অব্যর্থ অস্ত্র হলো পবিত্র কোরআন। কোরআনের প্রতিটি আয়াত, প্রতিটি উপদেশ যেন এক একটি শাণিত তীরের মতো, যা মিথ্যার দুর্গ ভেদ করতে সক্ষম।
একাত্তরের বয়ান ও চেতনার আগ্রাসন: একটি বিশ্লেষণ
বাঙালি মুসলিমদের চেতনার মানচিত্র জুড়ে একাত্তরের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বয়ানের যে প্রকট দখলদারী, তার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এই বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি কখনোই কোরআনী জ্ঞান দিয়ে পরিচালিত হয়নি। এই পরিস্থিতিকে এমনভাবে কল্পনা করা যেতে পারে যে, একটি দেশের সামরিক বাহিনী তাদের সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার না করে পুরোনো লাঠি-সোঁটা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে গেছে। ফলস্বরূপ, শত্রুরা সহজেই তাদের ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে। তেমনি, কোরআনের শক্তিশালী যুক্তি ও জ্ঞান দিয়ে যখন এই বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন মোকাবেলা করা হয়নি, তখন সেক্যুলার বয়ানগুলো আমাদের চেতনার গভীরে শেকড় গেড়ে বসেছে।
এরই করুণ পরিণতি দেখা যায় তথাকথিত ইসলামপন্থীদের মধ্যেও। যখন ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বর আসে, তখন তাদের অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, বামপন্থী এবং হিন্দুত্ববাদীদের সাথে একই মোহনায় একত্রিত হয়। তারা ভারতের বিজয়কে নিজেদের বিজয় বলে উৎসব করে এবং তাদের সুরে সুর মিলিয়ে ‘রাজাকার’দের গালি দিতে দ্বিধা করে না। এই আচরণ যেন এমন এক নৌকার যাত্রীর মতো, যে একই সাথে নদীর দুই কূলে পা রেখে চলতে চাইছে। তারা ভুলে যায় যে, একজন মুসলিমের উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহকে খুশি করা, কখনোই একই সাথে আল্লাহ এবং অভিশপ্ত শয়তান—উভয় পক্ষকে খুশি করা সম্ভব নয়। এটি এমন এক নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রম, যা মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিত চেতনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ: কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সুসংগঠিত পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য:
১. কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক জ্ঞান অর্জন ও গভীর অনুধাবন:
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদীসের বিশুদ্ধ ও গভীর জ্ঞান অর্জন করা। এর অর্থ কেবল তেলাওয়াত নয়, বরং তাজবীদসহ তেলাওয়াত, শব্দের অর্থ, আয়াতের তাফসীর, শানে নুযূল (অবতরণের প্রেক্ষাপট), এবং হাদীসের ব্যাখ্যা ও এর প্রায়োগিক দিকসমূহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করা। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, “কিতাবুল্লাহে যা কিছু আছে, তা সুস্পষ্ট” (সূরা ইউসুফ: ১১১)। এই স্পষ্টতা উপলব্ধির জন্য তাফসীর ও তাদাব্বুর (গভীরভাবে চিন্তা করা) অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন” (সহীহ মুসলিম)।
২. সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও সেক্যুলার বয়ানের বিশ্লেষণ:
সেক্যুলার, বামপন্থী বা হিন্দুত্ববাদী বয়ানগুলো কেন এবং কীভাবে মুসলিম চেতনার ওপর প্রভাব ফেলছে, তা কোরআনী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন। এর জন্য ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বহুবার চিন্তা-ভাবনা করার কথা বলেছেন (যেমন: সূরা বাকারা: ১৬৪)। এটি সার্বিক বিষয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়। কোরআনের আলোয় সেই সকল সেক্যুলার বয়ানের ত্রুটি, অসঙ্গতি এবং ইসলামের সাথে তাদের বিরোধপূর্ণ দিকগুলো যৌক্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক উপায়ে তুলে ধরতে হবে, কোনো আবেগ বা উগ্রতা দিয়ে নয়।
৩. দাওয়াহ ও যোগাযোগ: কোরআনী বার্তা প্রচারে আধুনিক কৌশল:
আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ, ওয়েবসাইট, পডকাস্ট, ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদির মাধ্যমে কোরআনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকর্ষণীয় এবং গবেষণালব্ধ কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে, যা সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তুমি তোমার রবের পথের দিকে আহ্বান করো হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে” (সূরা নাহল: ১২৫)। আন্তঃধর্মীয় সংলাপে অংশগ্রহণ করে কোরআনের সর্বজনীন মূল্যবোধ, যেমন—ন্যায়বিচার, মানবিকতা, শান্তি ও সহাবস্থানকে তুলে ধরে ভুল ধারণা দূর করতে হবে।
৪. উম্মাহর ঐক্য ও নৈতিক দৃঢ়তা:
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন মতপার্থক্য ও বিভেদ দূর করে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করে বৃহত্তর মুসলিম স্বার্থে কাজ করতে হবে। কোরআন নির্দেশ দেয়, “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না” (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)। ব্যক্তিগত জীবনে কোরআনী আদর্শ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণ করা আবশ্যক, কারণ একজন আদর্শ মুসলিমের জীবনই ইসলামের শ্রেষ্ঠ দাওয়াত। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি ব্যক্তিকে সকল প্রকার দুনিয়াবী মোহ এবং বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে।
মুক্তির পথ: কোরআনী চেতনার পুনর্জাগরণ-
এই পদক্ষেপগুলো সমন্বিতভাবে গ্রহণ করতে পারলে বাঙালি মুসলিমদের চেতনার মানচিত্রে কোরআনী বয়ানের শক্তিশালী প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে এবং “জিহাদে কাবীর” সফলভাবে পরিচালিত হবে, ইনশাআল্লাহ। এটি কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, বরং কোরআনের নির্দেশিত পথ।
আমরা যদি কোরআনের জ্ঞানকে পুনরুজ্জীবিত করি এবং তাকে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করি, তবেই সকল প্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারব এবং একটি সত্যিকারের ইসলামী সমাজ গঠন করতে সক্ষম হব।
লেখক: মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব।
২৭ মে ২০২৫ খ্রি.
আপনার মতামত লিখুন :