বৃষ্টি ও যৌবন: হৃদয়ের সিক্ত আকুলতা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ২৫, ২০২৫, ৪:১৫ অপরাহ্ন /
বৃষ্টি ও যৌবন: হৃদয়ের সিক্ত আকুলতা

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

বৃষ্টি যখন নামে, তখন যেন প্রকৃতির নীরব কান্না ভেজা বাতাস বয়ে আনে, আর সেই সিক্ত স্পর্শে জেগে ওঠে হৃদয়ের সুপ্ত আকুলতা—ঠিক যেন কৈশোর পেরোনো তারুণ্যের প্রথম প্রেম। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা, মেঘলোকের বিস্ময়কর স্বচ্ছতা নিয়ে যখন ভূপৃষ্ঠে মেশে, তখন শুধু মাটি নয়, মানবমনের অলিন্দেও এক নতুন শিহরণ জাগে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, বৃষ্টি হচ্ছে আল্লাহর প্রসাদ এবং কৃপা। বৃষ্টিকে স্বাগত করো, অভিসম্পাৎ দিও না।

মনে পড়ে, ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা, যখন বৃষ্টিতে ভিজে মাতামুহুরী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম টুপটাপ বৃষ্টির নাচন। কুলুকুলু রবে পূর্ব হতে পশ্চিমপ্রান্তে বয়ে যাওয়া মাতামুহুরীর বুকে প্রতিটি বিন্দুর পতন যেন এক একটি অলৌকিক স্পর্শ, যা নিস্তরঙ্গতাকে মুহূর্তে কল্লোলিত করে তুলত। সেই বিস্ময়, ভাষায় প্রকাশের অতীত। তেমনি, যৌবনের প্রথম ছোঁয়াও হৃদয়ে আনে এক অব্যক্ত চাঞ্চল্য।

ধানক্ষেতের উপর যখন বৃষ্টি নামে, সবুজ ধানের শীষগুলি নুয়ে নুয়ে যেন প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে, আবার পরক্ষণেই মাথা তুলে বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে চায়—এ দৃশ্য তারুণ্যের দ্বিধা আর সাহসের প্রতীক। ভেজা ডানায় ফড়িংয়ের লাফালাফি, শালিকের জল ঝাপটানো উড়াল—যেন নবীন প্রাণের চাঞ্চল্য।

জন্মঅবধি আমার বসবাস শৈবলীনি মাতামুহুরীর পাড়ে। শৈশবে আমার কাছে মাতামুহুরী নদী ছিল যেমন আপন, যৌবনে বৃষ্টি যেন তেমন। তবে নদীর মাতৃক আশ্রয়ের বিপরীতে, বৃষ্টির স্পর্শে জেগে ওঠে হৃদয়ের গভীরে লুকানো বাসনা। বৃষ্টির মধ্যে আপন শরীরকে ছেড়ে দেওয়ার যে আনন্দ, তা যেন নবযৌবনের এক উদ্দাম উন্মাদনা। প্রকৃতির ঐশ্বর্যের মাঝে, বৃষ্টির নির্মাণে অনুভব করা যায় তারুণ্যের বিকাশ।

বৃষ্টি দেখে কবি অনুভব করেন কবিতা, শিল্পী খুঁজে পায় তার রঙের জগৎ। তেমনি, যৌবনের প্রথম স্পর্শে হৃদয় হয়ে ওঠে কাব্যময়। মনে হয়, বৃষ্টি যেন জীবনধর্মী—তার বিনাশ নেই, শুধু রূপান্তর ঘটে। বৃষ্টির প্রতিটি ছোঁয়া যেন তারুণ্যের হাসির প্রতিধ্বনি।

বৃষ্টি যেমন আকাশ থেকে নেমে এসে সমস্ত বাঁধাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তেমনই যৌবনের আবেগও সব পুরাতন নিয়ম ভেঙে নতুনত্বের পথে ধাবিত হতে চায়। কম্পমান হৃদয়ে তখন প্রশ্ন জাগে—’আমি কে? আমার গন্তব্য কোথায়?’ এই আকুল জিজ্ঞাসা যেন প্রাণের গভীরে এক নতুন স্পন্দন জাগিয়ে তোলে।

বৃষ্টির মতোই যৌবন হঠাৎ আসে, আবার কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে চলে যায়। কিন্তু যখন থাকে, তখন সবকিছুকে আলোড়িত করে তোলে। যৌবনের এই ক্ষণস্থায়ী অথচ তীব্র প্রভাব, যেন বৃষ্টির অসম্ভার নায়ক হয়ে সবকিছুকে নতুন করে দেখার দৃষ্টি দেয়।

চণ্ডীদাস যেমন বৃষ্টিস্নাত রাধিকার সৌন্দর্যে কামনার উন্মেষ দেখেছিলেন, তেমনি তারুণ্যের দৃষ্টিতেও রমণীর তরঙ্গিত প্রসাদ এক নতুন অনুভূতির সৃষ্টি করে। পরিচিত রমণীকুল যখন শুধু আত্মীয় পরিচয়ে আবদ্ধ থাকে, তখন কোনো অপরিচিতা যুবতীর প্রথম দৃষ্টি যেন আকাঙ্ক্ষিত ঐশ্বর্যের সন্ধান দেয়। প্লেটোর সেই দ্বিখণ্ডিত সত্তার আকুলতার মতো, তারুণ্যও যেন এক অসম্পূর্ণতার বোধ নিয়ে অন্য সত্তার পানে ধাবিত হয়—পূর্ণতার সন্ধানে।

বৃষ্টির ছোঁয়ায় যেমন নিষ্প্রাণ প্রকৃতি জেগে ওঠে, তেমনই যৌবনের স্পর্শে ফুলও পায় নতুন রূপ। বাড়ির লাল গোলাপগুলি কিংবা ক্লাবের পাশে ফুটা রক্তিম কৃষ্ণ চূড়া যেন সেদিন পশ্চিম আকাশের লালের সাথে মিশে এক নতুন বার্তা নিয়ে এসেছিল—হৃদয়ের গভীরে রক্তিম আকাঙ্ক্ষার ঢেউ তুলেছিল।

গ্রিক দেবতা অ্যাপোলো যেমন কবিতা ও ঔষধের দেবতা, তেমনই যৌবনের কামনাও যেন এক প্রকার নিরাময়ের আকাঙ্ক্ষা জাগায়। আর সেই আকাঙ্ক্ষার প্রথম প্রকাশ হয়তো কবিতার জন্ম দেয়—তারুণ্যের প্রথম গান।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব।