
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।
অদম্য ইচ্ছাশক্তি মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পারে, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরলস ছুটে চলেছেন পাহাড়ি জনপদ আলীকদমের তরুণ প্রজন্মের উদীয়মান কবি এম.ডি জিয়াবুল। নিসর্গের কোলে বেড়ে ওঠা এই কবি সবুজ প্রকৃতির রূপকে কাব্যের তুলিতে ফুটিয়ে তোলেন অনায়াসে। তার কবিতায় যেন মুহূর্তেই প্রাণ পায় আলীকদমের সুবিস্তীর্ণ পর্বতমালা।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত জিয়াবুল প্রতিনিয়ত লিখে চলেছেন কবিতা। তার কলমে যেমন ধ্বনিত হয় বজ্রনিনাদের প্রলয়, তেমনি সোচ্চার হয় উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও তার কবিতায় স্পষ্ট।
জিয়াবুলের জন্ম বান্দরবানের দুর্গম পাহাড় ঘেরা আলীকদম উপজেলার ২নং চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের পাট্টাখাইয়া গ্রামে। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা জিয়াবুল এ পর্যন্ত অর্ধ সহস্রাধিক কবিতা লিখেছেন, যার মধ্যে বেশ কিছু কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও আলো দেখেছে। পিতা সামসুল হক ও মাতা ছকিনা খানমের তিন সন্তানের মধ্যে জিয়াবুল ছিলেন প্রথম।
১৯৯৭ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তিনি বাবাকে হারান, আর ২০০২ সালে অকালে মারা যান তার মা। কঠিন বাস্তবতার মুখে টেনেটুনে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন তিনি। শুরু হয় তার কর্মজীবন। তবে ছোটবেলা থেকে লালন করা কবি হওয়ার স্বপ্ন কখনোই ফিকে হয়নি। পেশায় চাকরি করলেও নেশায় তিনি কবি, তাই কাজের অবসরে কলম আর ডায়েরি হাতে তুলে নেন, বাঁচিয়ে রেখেছেন তার সুপ্ত প্রতিভা। অদম্য আগ্রহের জোরে তার কলম আজও সচল। জিয়াবুল নিজেই বলেন, “আমি কবিতায় কলম অব্যাহত রাখতে চাই।”
স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য চাকরির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন জিয়াবুল। কয়েক বছরের ঐকান্তিক সাধনায় তিনি কাব্যরথে অনেকটা পথ এগিয়ে যান এবং পরিচিত হন দেশের বহু খ্যাতিমান কবির সাথে। অসংখ্য পত্র-পত্রিকা ও সাহিত্য সংগঠনে তার লেখালেখি নিয়মিত। তার ছড়া-কবিতায় সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা ব্যবহারের জন্য তিনি বহু পাঠকের প্রশংসা অর্জন করেছেন। ২০২০ সালে তিনি জাতীয় আর্কাইভস গ্রন্থগার অধিদপ্তরে লেখক হিসেবে নিবন্ধিত হন।
জিয়াবুলের কাব্যচর্চার প্রধান বিষয়বস্তু দুর্নীতি, দ্রোহ, সমাজতান্ত্রিক ভাবনা, প্রতিবাদ এবং প্রেম-প্রকৃতিসহ জীবনের নানা দিক। তার জীবনমুখী কবিতা বহু পাঠক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ কাব্যপ্রেমীরা তার কাছে ধর্ম, জীবন ও আল্লাহ-রাসুলের প্রশস্তিমূলক কবিতাও প্রত্যাশা করেন। সাহিত্যকর্মে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য কাব্য পরিষদ হতে পাঁচ দেশীয় সম্মাননা-২০২১ এবং সার্ক আট দেশীয় আন্তর্জাতিক সাহিত্য স্মারক-২০২৩ লাভ করেছেন। এছাড়াও পার্বত্য কাব্য সম্মাননা-২০২৩, জাগ্রত সাহিত্য পদক-২০২৩ ও আলোকিত প্রাঙ্গণ সাহিত্য স্মারক-২০২৩ সহ বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন থেকে একাধিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন তিনি।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজ গঠনেও তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তিনি তার প্রতিষ্ঠিত ‘বর্ণ সাজ পাঠক ফোরাম ও পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ‘এপার বাংলা ওপার বাংলার কবিদল’-এর বান্দরবান জেলা আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রতিবাদী কলম’, ‘রূপ লাবণ্য আলীকদম’ ও ‘ছোটদের ছন্দে ছন্দে মজার ছড়া’। এছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি যৌথ কাব্যগ্রন্থেও অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘কাব্যের কলতান’, ‘সাহিত্যের কুসুম জ্যোতি’, ‘নব জাগরন’ ও ‘ফাল্গুন বিপ্লব’। বর্তমানে তার ৫৮ পর্বের একটি উপন্যাস প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কবি জিয়াবুল বলেন, “এই পথচলা এত সহজ ছিল না। সংসারের খরচ যোগাড় করে লেখালেখিতে মনোযোগ দেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে আমার আগ্রহ ও চেষ্টা ছিল অপরিসীম।” তিনি আরও বলেন, “আমি স্বপ্ন দেখি সমাজ পরিবর্তনের, ভেঙে দিতে চাই অনিয়মের সিলগালা। মাদকাসক্ত যুবসমাজকে ফিরিয়ে আনতে চাই স্বাভাবিক জীবনে। ভাঙতে চাই সমাজের পুরোনো কুসংস্কার।” অদম্য এই কবির কলম চলুক আপন গতিতে, পূরণ হোক তার সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন—এটাই প্রত্যাশা।
আপনার মতামত লিখুন :