
এপিসি সম্পাদকীয়
বান্দরবানের সবুজ অরণ্যে আচ্ছাদিত আলীকদম যেন দীর্ঘকাল ধরে একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করছিল। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। মমতাজ উদ্দিন আহমদের সুলিখিত একটি নিবন্ধে উঠে এসেছে এই জনপদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বহু কাঙ্ক্ষিত আলীকদম কলেজের প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য।
১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে মোঘলদের পদচিহ্নের মাধ্যমে যে ইতিহাসের সূচনা, কালের বিবর্তনে সেই আলীকদম প্রশাসনিক কাঠামোর নানা স্তর পেরিয়ে ১৯৮২ সালে একটি উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। শিক্ষার ক্ষেত্রেও এখানকার পথচলা শুরু হয়েছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে। এরপর মাধ্যমিক স্তরে কিছু আলোর দিশারী তৈরি হলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ কলেজের অভাব এখানকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে দীর্ঘকাল ধরে অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল। নেতৃত্বের দুর্বলতায় সেই স্বপ্ন যেন অধরাই ছিল।
তবে, সকল বাধা অতিক্রম করে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে আলীকদমের শিক্ষাঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও যুব সমাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গঠিত ১৯ সদস্যের সাংগঠনিক কমিটির হাত ধরে ‘আলীকদম কলেজ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেছে। সাত একরেরও বেশি জমি দানপত্র মূলে পাওয়া এবং দ্রুততার সাথে অবকাঠামো তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
এই মহতী উদ্যোগে বান্দরবানের তৎকালীন সংসদ সদস্যের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে তাঁর প্রেরিত পত্র এবং পাঁচ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের ঘোষণা নিঃসন্দেহে আলীকদমের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে।
২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক কলেজের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এবং এর আগে থেকেই একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম শুরু হওয়া আলীকদমবাসীর জন্য এক বিশাল অর্জন। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সহযোগিতায় কলেজের একাডেমিক কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন প্রমাণ করে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা যেকোনো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম।
বর্তমানে কলেজ তার নিজস্ব জমিতে একাডেমিক ভবন নির্মাণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের গৃহীত পদক্ষেপ অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আমরা বিশ্বাস করি, ‘আলীকদম কলেজ’ অচিরেই একটি জ্ঞানবৃক্ষে পরিণত হবে এবং এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। সরকারের উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের সহযোগিতা এবং স্থানীয়দের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এই কলেজের অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে।
আলীকদম কলেজের এই প্রতিষ্ঠা কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন নয়, বরং এটি একটি জনপদের স্বপ্নপূরণের প্রতিচ্ছবি। যারা এই শুভ উদ্যোগে স্বপ্নসারথী হয়েছেন, তাদের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। পরিশেষে, কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে চাই, এই নবপ্রতিষ্ঠিত কলেজের জ্ঞানালোক আলীকদমসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সকলের জন্য উন্মুক্ত হোক।
আপনার মতামত লিখুন :