বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের কাছে মারাইংতং জেদীর ধর্মীয় গুরুত্ব


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ৫, ২০২৫, ৪:২৬ অপরাহ্ন /
বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের কাছে মারাইংতং জেদীর ধর্মীয় গুরুত্ব

মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম:

পার্বত্য চট্টগ্রামের আলীকদম উপজেলার মিরিঞ্জা পর্বতশ্রেণীর ১৬০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মারাইংতং পাহাড় কেবল এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানই নয়, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এর ধর্মীয় তাৎপর্যও অপরিসীম। এই পাহাড়চূড়া মহামতি গৌতম বুদ্ধের একটি আবক্ষ মূর্তি ধারণ করে, যা ১৯৯২ সাল থেকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের শ্রদ্ধা ও পূজার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মানুসারে, নির্জন ও শান্ত পরিবেশ ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মারাইংতং পাহাড়ের উঁচু এবং নীরব প্রকৃতি সেই আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। সম্ভবত এই কারণেই বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং অনুসারীরা বহু আগে থেকেই এই স্থানটিকে বেছে নিয়েছিলেন। পাহাড়ের নৈসর্গিক শোভা যেন স্বয়ং বুদ্ধের শান্তির বার্তাকে বহন করে আনে, যা ভক্তদের মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে।

মারাইংতং-এর ধর্মীয় গুরুত্ব বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায় ১৯৯২ সালে ভিক্ষু সংঘের উদ্যোগে মহামতি গৌতম বুদ্ধের আবক্ষ মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে। এই মূর্তি স্থাপন কেবল একটি ভাস্কর্য নির্মাণ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পবিত্র প্রতীকের প্রতিষ্ঠা। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুসারে, বুদ্ধের মূর্তি স্বয়ং বুদ্ধের উপস্থিতি না হলেও তাঁর গুণাবলী, শিক্ষা এবং শান্তির আদর্শকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই মূর্তি দর্শন ও পূজা করার মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং বুদ্ধের দেখানো পথে চলার অনুপ্রেরণা লাভ করেন।

পরবর্তীতে, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে আরও একটি বৌদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়, যা ‘মহইদই বৌদ্ধ ধাম্মা জেদী’ নামে পরিচিত। এই সংযোজন মারাইংতং-এর ধর্মীয় তাৎপর্যকে আরও দৃঢ় করে। ‘জেদী’ শব্দটি বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে অত্যন্ত পবিত্র এবং শ্রদ্ধার স্থান নির্দেশ করে, যেখানে বুদ্ধ বা তাঁর প্রধান শিষ্যদের দেহাবশেষ অথবা তাঁদের ব্যবহৃত পবিত্র বস্তু সংরক্ষিত থাকে। যদিও মারাইংতং-এর ক্ষেত্রে এটি বুদ্ধের মূর্তি, তবুও স্থানটি একইভাবে পবিত্র জ্ঞান এবং শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত।

জাদীর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম উ উইচারা ভিক্ষু বলেন, ১৯৯৫ সাল থেকে মারাইংতং-এ নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া বৌদ্ধ মেলা এই পাহাড়ের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই মেলায় দূরদূরান্ত থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও দায়ক-দায়িকারা সমবেত হন, ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নেন এবং বুদ্ধের বাণীর মাহাত্ম্য উপলব্ধি করেন। এই মেলা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান না, এটি স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতিকেও দৃঢ় করে।

বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বাসে, মূর্তি পূজা কোনো ঈশ্বর পূজা নয়, বরং এটি বুদ্ধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। মারাইংতং পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত বুদ্ধ মূর্তি সেই উদ্দেশ্যই পূরণ করে। ভক্তরা এখানে এসে ধ্যান করেন, ত্রিপিটক পাঠ করেন এবং জগতের সকল প্রাণীর মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেন। পাহাড়ের নীরবতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন তাঁদের সেই আধ্যাত্মিক সাধনায় আরও বেশি সহায়তা করে।

মারাইংতং পাহাড় শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য এক পবিত্র তীর্থস্থান। এখানে আগমনকারী প্রত্যেক ভক্ত বুদ্ধের শান্তির বার্তা অনুভব করেন এবং জগতের সকল জীবের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসার শিক্ষা লাভ করেন। পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত বুদ্ধ মূর্তি যুগ যুগ ধরে সেই শান্তির বার্তা বহন করে চলবে এবং বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের হৃদয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপন করবে—যা কেবল পূজা-অর্চনার মাধ্যমেই সম্ভব। এই পবিত্র স্থানটি বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করে, যা প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক মেলবন্ধন রচনা করে।