হজ্ব-এর কার্যাবলী


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ১, ২০২৩, ৩:৪৮ পূর্বাহ্ন /
হজ্ব-এর কার্যাবলী

জাফর আহমাদ

১. হজ্বের ফরয কাজ ৩টি যথা:  (১) ইহরাম বাঁধা (২) আরাফাতে অবস্থান (৩) তাওয়াফে যিয়ারাহ করা মনে রাখতে হবে এই তিনটির কোন একটি ছুটে গেলে হজ¦ হবে না।  

২. হজ্বের ওয়াযিব কাজ ৫টি যথা:  (১) সাফা-মারওয়ায় সাঈ করা (২) মুযদালিফায় রাত্রি যাপন বা অবস্থান করা (৩) জামরায় কংকর মারা  (৪) কুরবানি করা ও মাথা মুন্ডানো বা চুল কাটা  (৫) বিদায়ী তাওয়াফ করা। এই গুলোর কোন একটি ছুটে গেলে তাকে দম দিতে হবে। 

৩. মূল হজ্বের পাঁচ দিন, যথা :  

(ক) প্রথম দিন :  হজ্বের প্রথম দিন ৮ই জিলহজ্ব:  মক্কা থেকে ইহরাম বেঁধে মিনায় যাবেন এবং ৮ই জিল হজ্ব সেখানে অবস্থান করবেন। 

(খ) দ্বিতীয় দিন:  হজ্বের দ্বিতীয় দিন ৯ই জিলহজ্ব :  ফযরের নামায মীনায় পড়ে আরাফাতের ময়দানে রওয়ানা হবেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করতে হবে। মূলত: আরাফার দিনকেই মূল হজ্ব বলা হয়। আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর মাগরিব নামায না পড়ে মুযদালিফায় রওনা করতে হবে।

সেখানে তারতিব ঠিক রেখে মাগরিব ও এশার নামায পড়ে সুবিধামতো স্থানে  বিছানা পেতে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। ইচ্ছে করলে এখান থেকে ৭০টি কংকর সংগ্রহ করে নিতে পারেন। ফযরের নামায আদায় করবেন। সুর্যোদয় পর্যন্ত কিবলামুখী হয়ে দো’আ করবেন। 

(গ) তৃতীয় দিন :  হজ্বের তৃতীয় দিন ১০ই জিলহজ্ব:  আজকের দিনটি খুবই কঠিণ ও পরিশ্রমের। আজকের কাজগুলো নিম্নরূপ: 

মুযদালিফা থেকে মীনায় ফিরে আসা।

শুধুমাত্র বড় জামরায় ৭টি কংকর মারা।

কুরবানি করা

চুল কাটা

মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ ও সাঈ করা

মক্কা থেকে পুনরায় মীনায় চলে আসা।

মুযদালিফা থেকে মীনায় পৌঁছানোর পর তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দিতে  হবে। সুর্য হেলার আগে বড় জামরায় সাতটি কংকর মারতে হবে। কুরবানি করবেন। এরপর হজ্বের তৃতীয় ও শেষ ফরয তাওয়াফে যিয়ারাত করবেন এবং মাথা মু-ন করবেন। তারপর মীনায় ফিরে যাবেন।

(ঘ) চতুর্থ দিন :  হজ্বের চতুর্থ দিন ১১ই জিলহজ্ব:  মীনায় অবস্থান করবেন। সূর্য হেলার পর আপনি তিনটি জামরায় ৭টি করে ২১টি পাথর মারবেন। প্রথমে ছোট জামরায়, পরে মধ্যম জামরায় শেষে বড় জামরায়। সূর্য ডোবার আগে পাথর মারা শেষ করে মীনার তাবুতে চলে যাবেন। 

(ঙ) পঞ্চম দিন :  হজ্বের পঞ্চম দিন ১২ই জিলহজ্ব:  আজ মীনায় সর্বশেষ অবস্থান। সুর্য হেলার পর আগের নিয়মে ৭টি করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করবেন। এবং সূর্যাস্তের আগেই মীনা ত্যাগ করে মক্কায় চলে আসবেন। যদি সূর্যাস্তের পূর্বে মীনা ত্যাগ করতে না পারেন তবে ১৩ই জিলহজ্ব মীনায় অবস্থান করে ১২ই জিলহজ্বর মতো আবার ২১টি কংকর মারতে হবে।

 বিদায়ী তাওয়াফ : যেদিন দেশে ফিরে যাবেন বা মদীনায় চলে যাবেন মক্কায় আর ফিরে আসবেন না, সেদিন সুবিধামতো বিদায়ী তাওয়াফ করে নিবেন। বিদায়ী তাওয়াফ সাধারণ পোশাকে হবে। এ তাওয়াফে রমল, ইযতিবা ও সাঈ নাই।    

৫.  হজ্জের কিছু পরিভাষা যা জেনে রাখা ভালো : 

ইহরাম :  প্রয়োজনীয় শারীরিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পর গোসল করে মীকাতের আগে তথা বিমানে উঠার আগে দু’টুকরা সেলাইবিহীন কাপড় পরিধান করে মীকাত থেকে উমরার নিয়ত করা। এটি হজে¦র প্রথম ফরয। আর তখন থেকেই তালবিয়া পাঠ করা। মনে রাখবেন, ইহরামের কাপড় বাড়ি অথবা বিমান বন্দর থেকে পড়তে পারেন কিন্তু নিয়ত করবেন মিকাত থেকে। এবং তালাবিয়াও পাঠ করবেন মিকাত থেকে। 

মীকাত : মীকাত অর্থ নিদিষ্ট সময় বা সময়সূচী। পরিভাষায় এমন এক নির্দিষ্ট স্থানকে মীকাত বলে, যেখান থেকে বা যে স্থান অতিক্রম  করার আগে হজ্ব বা উমরার জন্য ইহরাম বাঁধতে হয়। এ রকম স্থান পাঁচটি। এর বিশদ বর্ণনা ‘ইহরাম ও মীকাতের তাৎপর্য’ প্রবন্ধে দেয়া হয়েছে।

তিালবিয়া :  লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক লাব্বায়িকা লা শারিকা লাকা লাব্বায়িক ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়ামাতা লাকা ওয়াল মুলক্ লা শারিকা লাক। অর্থাৎ উপস্থিত, উপস্থিত হে আল্লাহ! তোমার কোন শরীক নাই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রসংশা ও নিয়ামাত তোমারই এবং রাজত্বও। তোমার কোন শরীক নেই। 

তাওয়াফ :  তাওয়াফ মানে যিয়ারত বা চক্কর দেয়া। অর্থাৎ বাইতুল্লাহর চারদিকে চক্কর দেয়া। ফরয, ওয়াযিব ও নফল তাওয়াফ রয়েছে। আল কুরআনে বলা হয়েছে “এবং ইবরাহিম ও ইসমাইলকে দায়িত্ব দিলাম যে তোমরা আমার ঘর পবিত্র করো তাওয়াফকারী ও ইতিকাফকারীদের জন্য।” (বাকারা. ১২৫)  

রমল :  রমল শুরু হয় সপ্তম হিজরীতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ষষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়ার থেকে ফিরে যান উমরা আদায় না করেই। হুদায়বিয়ার চুক্তি অনুযায়ী পরবর্তী বছর তিনি ফিরে আসেন উমরা পালনের উদ্দেশে।

সময়টি ছিল জিলকদ মাস। সাহাবাদের কেউ কেউ জ¦রাক্রান্ত হয়েছিলেন। এ নিয়ে মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে পারস্পরিক বলতে লাগল ‘এমন এক সম্প্রদায় তোমাদের কাছে আসছে ইয়াছরিবের জ¦র যাদেরকে দুর্বল করে দিয়েছে।”

বুখারী-মুসলিম) শুনে রাসুলুল্লাহ সাহাবাদের রামল করতে বললেন। রামল মানে বুকটান করে দৌঁড়ানো। আমাদের দেশের সেনাবাহিনীর কুচ-কাওয়াজের মতো, ছোট ছোট কদমে গা হেলিয়ে বুক টান করে দৌড়ানো। তাওয়াফে এই রমল করতে হয়।

উদ্দেশ্য মু’মিন কখনো দুর্বল হয় না, মুমিন কখনো হতোদ্যম  হয় না। রোগ-শোক সবকিছুকে চাপিয়ে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এর সাথে ইযতিবা নামে আরেকটি পরিভাষা আছে। মানে চাঁদরখানা ডান বগলের নিচে দিয়ে বীরের বেশে তাওয়াফ করা। 

যমযম : যমযম মহান আল্লাহর করুণার বারিধারা। একজন মমতাময়ী মায়ের আল্লাহর ওপর তায়াক্কুলের ফল। যমযম কা’বার সন্নিকটে আল্লাহর কুদরতের নিশানী একটি কুপ। আবহমানকালধরে আল্লাহ তাঁর মেহমানদের মেহমানদারী করাচ্ছেন এই অমিয় পানি দিয়ে। যমযমের ইতিহাস এই বইয়ের ‘যমযম:  মমতাময়ী মায়ের ভালবাসা ও ভরসার ফল’ প্রবন্ধে জানা যাবে। 

সাফা-মারওয়া পাহাড় ও সাঈ :  কা’বার দক্ষিণ-পূর্ব কর্ণারে একেবারেই কাছাকাছি ছোট্র একটি পাহাড়ের নাম সাফা। এবং কা’বার অনতিদূরে উত্তর-পূর্ব কর্ণারে মারওয়া পাহাড়। এটিও খুবই ছোট্র একটি পাহাড়। এ দূটি পাহাড়ের মাঝে মা হাজেরা তাঁর দুগ্ধপায়ী সন্তান ইসমাইল আ. -এর জান বাঁচানোর সাহায্যের জন্য ছুটোছুটি করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর মেহমানদের জন্য এই দু’টি পাহাড়ের মাঝে দৌড়ানোকে বৈধ  করে দিলেন। এই ছুটোছুটির নামই হলো সাঈ। 

হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর :  পবিত্র কা’বার দক্ষিণ কোনে জমিন থেকে ১.১০ মিটার উচ্চতায় স্থাপিত হাজরে আসওয়াদ। এটি জান্নাত থেকে নেমে আসা একটি পাথর, (নাসায়ী)। শুরুতে যার রং ছিল দুধের বা বরফের মতো সাদা।

পরে আদম সন্তানদের পাপ তাকে কালো করে দেয়। (তিরমিযি) হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলে গুনাহ মাফ হয়। (নাসায়ী) হাজরে আসওয়াদ-এর কোণ থেকে আল্লাহ আকবার বলে তাওয়াফ শুরু করতে হয়। 

স্পর্শ করা সম্ভব না হলে ইশারা করলেও চলবে। হাজরে আসওয়াদ চুম্বন মু’মিন হৃদয়ে সুন্নাহর তাজিম ও সম্মান বিষয়ে চেতনা সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) করেছেন তাই আমরা করি।

হযরত ওমর (রা.) পাথরকে চুম্বন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি জানি নিশ্চয়ই তুমি একটি পাথর। ক্ষতি-উপকার করার ক্ষমতা কোনটাই তোমার নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.)কে চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। (বুখারী: ১৫২০) 

রিুকনে ইয়ামানি :  কা’বা শরীফের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ। তাওয়াফের সময় এ কোণকে সুযোগ পেলে স্পর্শ করতে হয়। চুম্বন বা ইশারা করা নিষেধ। 

মুলতাযিম :  হাজরে আসওয়াদ থেকে কা’বার দরজা পর্যন্ত জায়গাটুকুকে মুলতাযিম বলে। (মুসলিম) মুলতাযাম শব্দের অর্থ ‘এঁটে থাকার জায়গা’। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)  মক্কায় এসে মুলতাযামে যেতেন ও দু’হাতের তালু, দুহাত, চেহেরা ও বক্ষ ওয়ালের সাথে এঁটে দিয়ে দোয়া করতেন। 

মাকামে ইবরাহিম :  মাকাম দ-ায়মান ব্যক্তির পা রাখার স্থান। মাকামে  ইবরাহিম বলতে সেই পাথরকে বুঝায় যেটা কাবা শরীফ নির্মাণের সময় ইসমাইল নিয়ে এসেছিলেন তার পিতা ইবরাহিম এর ওপর দাঁড়িয়ে কা’বা ঘর নির্মাণ করতে পারেন। নির্মাণ কাজে ওপরে উঠার প্রয়োজন হলে পাথরটি অলৌকিকভাবে ওপরে উঠে যেতো। 

আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ তার মধ্যে রয়েছে সুষ্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এবং মাকামে ইবরাহিম বা ইবরাহিমের ইবাদাতের স্থান।” (আল ইমরান: ৯৭) পাথরটিতে হযরত ইবরাহিম আ.  এর পদচিহ্ন ১০ সেন্টিমিটার গভীর ও অন্যটি ৯ সেন্টিমিটার।

লম্বায় প্রতিটি পা ২২ সেন্টিমিটার প্রস্থে ১১ সেন্টিমিটার। বর্তমানে এটি পিতল ও ১০ মিলি মিটার পুরো গ্লাস দিয়ে কা’বার দরজা বরাবর পূর্বপাশে ১৪ মিটার দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে কা’বামুখী হয়ে দু’রাকাত সালাত আদায় করতে হয়। 

মাতাফ :  কাবা শরীফের চারপাশের উন্মুক্ত জায়গাকে মাতাফ বলে। মাতাফ মানে তাওয়াফ করার স্থান। বর্তমানে তাওয়াফের অতিরিক্ত ভিড় এড়ানো এবং একসাথে আরো বেশি করে মানুষ যাতে তাওয়াফ করতে পারে এ জন্য  খোলা চত্বরের বাইরে মজবুত স্টীলের ওপর তিন তলা করে দেয়া হয়েছে।

আল হাতীম :  হাতীম অর্থ বিচ্ছিন্ন। কা’বার উত্তর পাশে অর্ধ-গোলাকার জায়গাটিকে হাতীম বলে। এটি ইবরাহিম আ.  এর ভিত্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ এটি কাবা ঘরের অংশ। কিন্তু কুরাইশগণ কা’বা পুনঃনির্মানের সময় অর্থাভাবে তা কা’বার ভিত্তির মধ্যে করতে পারেনি। এখানে প্রবেশ করে নফল নামায পড়া মানে কা’বা ঘরে প্রবেশ নামায পড়া। এটি দোয়া কবুলের জায়গা। 

মীযাব :  অর্থ নালা। কা’বা ঘরের ছাদ থেকে পানি অবতরনের নালাকে মীযাব বলে। এর নীচে দাঁড়িয়ে দোয়া কবুল হয়।  

মসজিদে হারাম :  কাবা শরীফ ও তার চারপাশের মাতাফ, মাতাফের ওপারে বিল্ডিং, বিল্ডিংয়ের ওপারে মারবেল পাথর বিছানো উন্মুক্ত চত্বর এ সবগুলো মিলে মসজিদুল হারাম। কারো কারো মতে, পুরো হারাম অঞ্চল মসজিদুল হারাম হিসেবে বিবেচিত।