শারাবান তাহুরা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ১১, ২০২৩, ৯:৩৩ পূর্বাহ্ন /
শারাবান তাহুরা

মমতাজ উদ্দিন আহমদ

“শারাবান তাহুরা” আরবী ভাষার শব্দ। পবিত্র আল্ কোরআনের সুরা্ আদ-দাহরের ২১ নাম্বার আয়াতে ‘শারাবান তাহুরা’ শব্দমালা এসেছে। ‘শারাব’ শব্দের অর্থ পানীয়; ‘মদ’ অর্থেও শব্দটির ব্যবহার করা হয়। ‘তহুরা’ শব্দের অর্থ পবিত্র। ‘শারাবান তাহুরা’র অর্থ পবিত্র পানীয়। সুরা আদ-দাহরের ২১ নাম্বার আয়াতের শেষাংশে ‘শারাবানু তাহুরা’ শব্দ সম্বলিত আয়াতাংশের বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ:

‘…আর তাহাদের প্রতিপালক তাহাদেরকে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয়।’

বেহেশতবাসীরা তাঁদের সৎকার্যের পুরস্কার স্বরূপ অনন্ত আনন্দের ঝরণা থেকে যে শুভ্র ও সুস্বাদু পানীয় পাবেন তাকেই আল কোরআনে “শারাবান তাহুর” বলে অভিহিত করা হয়েছে।

সুরা আদ-দাহার এর ১৩-২২ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যায় ‘তাফসিরে ইবনে কাসীর’-এ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা দেখা যায়। এখানে জান্নাতবাসীদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতারাশির বর্ণনায় তাফসিরকারক জান্নাতে মানুষদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের বর্ণনা দিয়েছেন। একাধিক তাফসিরগ্রণ্থেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।

‘শারাবান তাহুরা’ কে বাংলা ভাষায় অমৃত বলা হয়। এই অমৃত জাগতিক জীবনে কোন দর্শনযোগ্য পদার্থ কিনা জানি না। যদি দর্শনযোগ্য পদার্থ হতো তাহলে আল কোরআনে পূণ্যবানদের কেন জাগতিক একটা দর্শনযোগ্য পানীয় বেহেশতবাসীদের দেওয়ার অঙ্গীকার করবেন! তাই বলা যায়, এ জগতে যে পানীয়ের অস্তিত্ব নেই সেই পানীয়ই বেহেশতবাসীদের দেওয়া হবে!

ইমাম গাজ্জালী উঁচুমার্গের একজন দার্শনিক। মুসলিম দার্শনিকদের মাঝে তিনি অগ্রগণ্য। তাঁর লেখা “মিশকাতুল আওয়ার” বইয়ে লিখেন- ‘সম্ভবতঃ আল্লাহ এমন কিছুই সৃষ্টি করেননি যার অনুরূপ সৃষ্টি এ মাটির পৃথিবীতেও নেই।’

দার্শনিক ইমাম গাজ্জালীর কথা মেনে নিলে প্রশ্ন জাগে- তাহলে শারাবান তাহুরা’র প্রকৃত রূপ এই পৃথিবীতে কি হতে পারে? একজন সুফি লেখক বলেছেন, কোরআনে বর্ণিত ‘শরাবান তাহুরা’ হচ্ছে এই মর্তের পৃথিবীর ‘প্রেম’! এই জগতে জাগতিক ও ধর্ম জীবনে একমাত্র প্রেমই সত্য ও অমর!
মানবপ্রেম ও খোদা প্রেম একইসূত্রে গাঁথা। আমরা অনেকেই ধর্ম জীবনে শরীয়তের অন্তর্নিহিত নির্যাস আহরণে ব্যর্থ ও অসমর্থ হই। অনেকের ধর্মীয় ক্রিয়া সম্পন্ন করার আঞ্জাম ও তাড়াহুড়ো দেখে মনে হয় “কাবুলি ওয়ালার নারিকেল খাওয়ার” মতই । যাদের কাছে নারিকেলের শাঁস ও রসের জ্ঞান নেই। এরা নারিকেলের ছোবড়াই চুষে থাকেন।

এ সুফি লেখকের মতে, মানব প্রেম ও খোদা প্রেমের পরশ যাঁরা জীবনে একটাবারের জন্য পেয়েছেন তারা সত্যিকারের ‘শরাবান তাহুরার’ অর্থ ও স্বাদ অনুভব করতে পারেন।

ইমাম গজ্জালীর দার্শনিক সত্যের অনুসমর্থনে বলা যায়, এই দুনিয়ায় যদি ‘শারাবান তাহুরা’র মতো কোন অনুরূপ সৃষ্টি থাকে তা হচ্ছে প্রেম। আমরা প্রেমকে শুধুমাত্র নারী-পুরুষের কামনা-বাসনায় পর্যবসিত করি। এখানেই প্রেমের সংজ্ঞা বিগড়ে যেতে পারে। প্রেমের আলাদা কোন Definition নেই। প্রেমের Definition প্রেমই।

ধার্মিক মানুষমাত্রই খোদাপ্রেমে লীন থাকেন। তবে প্রেমের আধিক্য মানুষকে বিপথেও নিতে পারে। খোদা ও মানবপ্রেমের পথ কঠিন। তবে অগম্য নয়।

নিস্বার্থ মানবসেবা, অপরের প্রতি সহানুভূতি ও নিখাদ ভ্রাতৃত্ববোধ থেকেই প্রকৃত প্রেমের অনুরণন ঘটে। মূলধারার সব ধর্মই প্রেমের এ Definition শিখায়। মহানবী (সা:) এর পুরো জীবনটাও এ প্রেমের শিক্ষা দেয়।

অপরদিকে, পারস্যের কবিদের লেখা ‘রুবাইয়াত্-ই-ওমর খৈয়াম’, রুবাইয়াত্-ই-হাফিজ’, দীওয়ান-ই-হাফিজ’ কাব্যগুলোতে ‘শরাব’ শব্দটি বারবার এসেছে। পারস্যের কবির খৈয়াম, হাফিজ ও খসরুর রুবাইয়্যাতগুলির বাংলা অনুবাদ আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের বদৌদলতে পড়ার সুযোগ হয়েছে। আরো অনেক গুণীজনই তাদের লেখাগুলি বাংলায় অনুবাদ করেছেন।

বাংলা অনুবাদে খৈয়াম ও হাফিজের “প্রেম মদিরা” ও “পান্ পিয়ালার”আধ্যান্তিক ও জাগতিক দু’টো অর্থই রয়েছে। কিন্তু বাংলা অনুবাদগুলোতে জাগতিক অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে নারী ও তরল পানীয়কে এক পেয়ালায় বসিয়ে ভাবানুবাদ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন কাজী নজরুর ইসলাম অনুদিত রুবাইয়াত্-এ-ওমর খৈয়ামের ৬৩নং শ্লোক এই-

“যতক্ষণ এ হাতের কাছে আছে অঢেল লাল শরাব
গেহুঁর রুটি, গরম কোরমা, কালিয়া আর শিক-কাবাব,
আর লাল-রুখ প্রিয়া আমার কুটির-শয়ন-সঙ্গিনী, –
কোথায় লাগে শাহানশাহের দৌলত ওই বে-হিসাব!”

নজরুল অনুদিত রুবায়াতগুলোতে পারস্য কবিদের জাগতিক প্রেমের অর্থই বেশী ফুটে উঠেছে। যা হোক, ‘শারাবান তাহুরা’র এ রূপ-রস-গন্ধ সকল পূর্ণার্থীদের কপালে পরজনমে জুটবে সেই আশা ও সান্তনা নিয়ে বেঁচে থাকবোই