মসজিদুল আকসার পরিচয়


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১০, ২০২৩, ৯:৩১ পূর্বাহ্ন /
মসজিদুল আকসার পরিচয়

মসজিদুল আকসা নির্দিষ্ট কোনো স্থাপনার নাম নয়। বরং ফিলিস্তিনের কুদস শহরের নির্দিষ্ট এলাকার পুরোটাই মসজিদুল আকসা

মধ্যপ্রাচ্যে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী একটি আরব ভূমি ফিলিস্তিন। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা—এ তিন মহাদেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে ফিলিস্তিন। ফিলিস্তিনের ভূমি অসংখ্য নবী-রাসুলের স্মৃতিবিজড়িত, এর আশপাশে অনেক নবী-রাসুলের কবর রয়েছে।

ইসলামে মসজিদুল আকসা এবং সমগ্র ফিলিস্তিনের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অনেক। পবিত্র কোরআন-হাদিসে ফিলিস্তিনের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

এ ভূমিকে আল্লাহতায়ালা বরকতময় ভূমি বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহিমাময় সেই সত্তা, যিনি তার বান্দাকে রাতের বেলা মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা ভ্রমণ করিয়েছেন, যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি। তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)।

মক্কা ও মদিনার পর মুসলমানদের কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম শহর ফিলিস্তিনের কুদুস তথা জেরুজালেম। এর পবিত্রতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও আবেগের মূলে রয়েছে মসজিদুল আকসা। ইসলামের দৃষ্টিতে মসজিদুল আকসা তৃতীয় শ্রেষ্ঠ বরকতপূর্ণ মসজিদ। এ মসজিদের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের নবীজির মেরাজের স্মৃতি।

মেরাজের রাতে এ মসজিদে পূর্ববর্তী নবী-রাসুলরা মহানবী (সা.)-এর ইমামতিতে নামাজ আদায় করেন। পবিত্র কাবা শরিফের পর পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ এটি।

হজরত আবু জর গিফারি (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! দুনিয়াতে প্রথম কোন মসজিদটি নির্মিত হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদুল হারাম। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোনটি? প্রতিউত্তরে তিনি বললেন, তারপর হলো মসজিদুল আকসা। অতঃপর আমি জানতে চাইলাম যে, উভয়ের মধ্যে ব্যবধান কত বছরের? তিনি বললেন ৪০ বছরের ব্যবধান। (বুখারি, হাদিস: ৩১১৫)।

এ মসজিদটি ইসলামের প্রথম কেবলা। রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরতের পর ১৬-১৭ মাস মসজিদুল আকসার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেছেন। এরপর আল্লাহপাকের আদেশে কাবা পরিবর্তন হয়ে বায়তুল্লার দিকে কেবলা নির্ধারণ হয়েছে। সে হিসেবে বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের প্রথম কেবলা। মসজিদুল আকসা নির্দিষ্ট কোনো স্থাপনার নাম নয়। বরং ফিলিস্তিনের কুদস শহরের নির্দিষ্ট এলাকার পুরোটাই মসজিদুল আকসা।

প্রায় ১৪৪ একর ভূমির ওপর আল-আকসা কম্পাউন্ড অবস্থিত, যা প্রাচীন জেরুজালেম শহরের ১৬.৬ ভাগের এক ভাগ। আল-আকসা কম্পাউন্ড অর্ধ-আয়তাকার। এর পশ্চিম দিক ৯৪১ মিটার, পূর্ব দিক ৪৬২ মিটার, উত্তর দিক ৩১০ মিটার এবং দক্ষিণ দিক ২৮১ মিটার প্রশস্ত। কম্পাউন্ডের ভেতরে মসজিদুল আকসা ছাড়াও একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। যেমন, সোনালি বর্ণের কুব্বাতুস সাখরা।

উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান ৭২ হিজরিতে এটি নির্মাণ করেন। এর পাশেই কিবলি মসজিদ নির্মাণ করেন খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক। আল-আকসা কম্পাউন্ডে ছোট-বড় ২০০ স্থাপনা রয়েছে। যার মধ্যে আছে মসজিদ, গম্বুজ, আঙিনা, মিহরাব, মিম্বার, আজানের স্থান, কূপ ইত্যাদি।

এসব স্থাপনার মধ্যে কুব্বাতুস সাখরার অবস্থান আল-আকসা কম্পাউন্ডের ঠিক মধ্যখানে। কিবলি মসজিদের অবস্থান সর্বদক্ষিণে। এ মসজিদের সাতটি আঙিনা ও বারান্দা রয়েছে। কম্পাউন্ডের প্রবেশপথ ছয়টি। কম্পাউন্ডের ভেতর ২৫টি সুপেয় পানির কূপ। রয়েছে বেশ কয়েকটি পানির ফোয়ারা।

পাথর-আচ্ছাদিত কায়েতবাই ফোয়ারাটিই সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। আরও আছে ৪০টি উঁচু আসন। যেখানে বসে প্রাজ্ঞ আলেমরা ধর্মীয় জ্ঞানের পাঠদান করে থাকেন। এসব স্থাপনা বিভিন্ন শাসনামলে নির্মিত। আল-আকসা মসজিদ বলতে কিবলি মসজিদ, মারওয়ানি মসজিদ (কুব্বাতুস সাখরা) ও বুরাক মসজিদ (তিনটির) সমন্বয়কে বোঝায়, যা জেরুজালেমের ‘হারাম শরিফ’-এর চার দেয়ালের মধ্যেই অবস্থিত।

তবে মূল আল-আকসা বা কিবলি মসজিদ হলো ধূসর সিসার প্লেট দ্বারা আচ্ছাদিত গম্বুজওয়ালা স্থাপনাটি। আর আল-আকসা নামে অধিক প্রসিদ্ধ সোনালি গম্বুজবিশিষ্ট স্থাপনার নাম মসজিদে কুব্বাতুস সাখরা, যা উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান ৭২ হিজরিতে নির্মাণ করেন। তবে এটিকে আল-আকসা বললেও সমস্যা নেই; কারণ মসজিদটি ‘হারাম আল শরিফ’-এর চৌহদ্দিতেই অবস্থিত। মোটকথা, মসজিদুল আকসা মানে ৩৫ একর সম্পূর্ণ জমির সীমানা, নির্দিষ্ট কোনো স্থাপনা নয়।  

তোয়াহা হুসাইন