ব্যথা : নজরুল কাব্য ও গানে


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৮, ২০২৩, ৫:২৪ পূর্বাহ্ন /
ব্যথা : নজরুল কাব্য ও গানে

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

মানুষ যখন ভাবেন রক্তমাংসে সে সীমাবদ্ধ—এই বোধ যখন তার হয়, তখন সে আবিষ্কার করেন, বিশ্বের এই অস্তিত্বের পিছনে একটা মর্মান্তিক ব্যথার নদী চিরবহমান। —সে ধারা নিয়তির মতোই অমোঘ-দুর্বার নিষ্ঠুর।

সে ব্যাথার নদী সতত ছলছল। এ স্রোতাধারার সাথে সব কবি তাল রেখে তাদের বীণার সুর বাঁধেন।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল সে ব্যথা বারিধির অনন্ত কলধ্বনিকে বুক ভরে আমৃত্য বহন করেছেন। তার জীবন নদের উপকুলে, নদীর বহবান ধারায় ব্যথার নিত্য ঢেউ উঠেছিল।

সব কবিরই এই ব্যথাই মূলধন।

রবীন্দ্রনাথ এই ব্যথার আঘাতে কাঁদিয়া ধাবমান বলাকার পলাতক পাখার স্পন্দনে আকুল হয়ে বলেন—
“হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোনোখানে।”

এই ব্যথার সাধনায় রবীন্দ্রনাথ ঋষির মতোই সত্যদ্রষ্ট হয়েছেন। পৃথিবীকে এক ক্ষণভঙ্গুর মাটির ভাণ্ড হতে ঊর্ধ্বে—বহু উর্ধ্বে অমৃতের সন্ধানে চোখ ফিরাতে বলেছেন।

এ-দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্বকে বিশ্বাতীত আশ্রয়ের পথ দেখিয়েন তিনি।

কিন্তু ব্যথার আঘাতে নজরুল এ চোখের জলে সিক্ত সুন্দর ধরণীকে ছেড়ে যাননি। তিনি বিরাট মৃত্যুর ভাঙনকূলে বসে সৃষ্টি করেছেন কল্পনার নীড়।

মানব জীবনের খণ্ড পরমায়ুর আশ্রয়গুলি মুহুর্মুহু হবে। দূরে মৃত্যুর কালো জলের ডাক শোনা যাচ্ছে জেনেও কবি বেদনার বেদীপিঠে চড়ে ভালোবাসার নিশান হাতে নিয়ে ছুটেছেন অহর্নিশ। বারবার এ ধূলিমাটির বেদনার বন্ধনকে তিনি আরও সবলে জড়িয়ে ধরেছেন।

অপরদিকে আমরা দেখতে পাই, রবীন্দ্রনাথের ব্যথায় উদাসীন বৈরাগীর নির্লিপ্ত নির্বিকার শান্তির আভাস আছে। কিন্তু নজরুলের ব্যথায় মৃত্যুশীতল মানুষের হারাবার বেদনা, পেয়েও রাখতে না পারার জ্বালা আছে।

নজরুল জীবনভর ব্যথা পেয়েছেন—এটা তার কাছে সত্য। তাই ধরণীর গাত্রে আর কোনো সান্ত্বনার মিথ্যা আবরণ তিনি পরাননি।

নজরুল প্রকৃতিতে রবীন্দ্রনাথ হতে স্বতন্ত্র। নজরুল শেষের সন্ধান চাননি। ব্যথা তার এত প্রবল যে শেষকে পর্যন্ত কামনার অবকাশ তার নেই।

নজরুল ব্যথামাখা প্রেমিকের চোখে পৃথিবীকে দেখিয়াছেন।

যাকে চাই, তার জন্য ব্যথা ও কামনাকে কেমন করে বাইরের পৃথিবী আমাদের বুক হতে লুণ্ঠন করে নেয় তা দেখবার বস্তু হয়ত। তাই বিরহিণী ব্যথা নালিশ করে নিজের অক্ষমতা জানায়—

সে থাকে নীল নভে আমি নয়ন-জল সায়রে,
সাতাশ তারার সতীন সাথে সে যে ঘুরে মরে,
কেমনে ধরি সে চাঁদে রাহু নহি।

নজরুলের প্রতি রক্তবিন্দুটি ভালবাসায় রক্তরঙিন। ভালবাসা নিয়ে তিনি দর্শনশাস্ত্র রচনা করেননি, ব্যথায় গানই গেয়েছেন।

নজরুলের কাছে এ ধুলোমাটির তুচ্ছ মানুষের প্রেমই ছিল সম্পদ। তাঁর সমস্ত কবিতা রক্ত-মাংসের মানুষের ব্যথায় ও কামনায় ভরপুর। সে ব্যথার রথে চড়ে তিনি অরূপ ব্যথার গান গেয়েছেন। নিত্যকার মানুষ যে ব্যথা পায়—কাঁদিয়া আকুল হয়—তারই ব্যথায় সিন্ধু মথিত করে তার কাব্যের জন্ম।

নজরুলের ‘বিদ্রোহ’ এসে থেমে গেছে প্রেয়সীর কাছে। নিম্নোক্ত চরণে মনে পড়ে বিদ্রোহীর আত্ম-সমর্পণ—

হে মোর রাণী, তোমার কাছে
হার মানি আজ শেষে।

ব্যথা প্রেম তার রাণীর কাছে গিয়ে নত হয়ে পরাজয় ভিক্ষা মাগে। পদতলে নত যৌবন অঙ্গুলি ইঙ্গিতে দেখাচ্ছে- ‘এই সমরজয়ী অমর তরবারি’ এই ক্লান্ত মুঠিতে শিথিল হয়ে এসেছে! বিদ্রোহীর কবির ব্যথারথের চূড়ায় প্রেয়সীর নীলাম্বরী পতাকা দুলেছে নানান কবিতা-গানে।

আমি হার মানি, ওগো রানী, আমি হার মানি। বিদ্রোহী, যৌবনের এই পরাজয়, এই হার মানাই তোমার গলার হার হোক।

এ ব্যথার কবির একটি গান দিয়ে আজকের লেখাটি শেষ করছি-

শুকাল মিলন-মালা আমি তবে যাই।
কী যেন এ নদী-কূলে খুঁজিনু বৃথাই।।

রহিল আমার ব্যথা
দলিত কুসুমে গাঁথা,
ঝুরে বলে ঝরা পাতা —
নাই কেহ নাই।।

যে-বিরহে গ্রহতারা সৃজিল আলোক,
সে-বিরহে এ-জীবন জ্বলি পুণ্য হোক।
চক্রবাক চক্রবাকী
করে যেমন ডাকাডাকি,
তেমনই এ-কূলে থাকি
ও-কূলে তাকাই।।