
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মতে বর্ষা সংসারী, গৃহী। বর্ষা মনকে এক স্থানে ঘনীভূত করে। বর্ষা আমাদের মনের চারিদিকে বৃষ্টিজলের যবনিকা টেনে দেয়। রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে উপলব্ধি করেছেন হৃদয়ের গভীর থেকে। তার নানান কবিতায়, গানে ও উপন্যাসে বর্ষা বন্দনা করা হয়েছে।
আমাদের চারপাশের প্রকৃতি বর্ষায় নতুন করে সাজে। কবি-সাহিত্যিকরা ‘বর্ষা’ ঘিরে রচনা করেছেন প্রেম, বিরহ, অভিমান এবং রোমাঞ্চের নানান বর্ণনা।
রবীন্দ্রনাথ ‘আষাঢ়’ প্রবন্ধে বলেন, ‘ঋতুর মধ্যে বর্ষাই কেবল একা একমাত্র। তাহার জুড়ি নাই। …তাহার দাক্ষিণ্যের উপর সমস্ত বছরের ফল-ফসল নির্ভর করে কিন্তু সে ধনী তেমন নয় যে নিজের দানের কথাটা রটনা করিয়া দিবে।’
তিনি বলেছেন, ‘বর্ষা-ঋতুটা বিশেষভাবে কবির ঋতু। …বর্ষায় হৃদয়ের বাধা-ব্যবধান চলিয়া যায় বলিয়াই সে সময়টা বিরহী বিরহিণীর পক্ষে বড়ো সহজ সময় নয়। তখন হৃদয় আপনার সমস্ত বেদনার দাবি লইয়া সম্মুখে আসে ‘
কবিগুরু ‘বসন্ত ও বর্ষা’ প্রবন্ধে বলেছেন- ‘বর্ষাকালে আমি আত্মা চাই, বসন্তকাল আমি সুখ চাই। সুতরাং বর্ষাকালের বিরহ গুরুতর। …বর্ষাকালে সমস্ত জগতের মধ্যে সম্পূর্ণ আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহি।’
বর্ষা নিয়ে কবিগুরুর রচনাসম্ভার চোখ রাখলে দেখা যাবে তিনি বর্ষাকে উপলব্ধি করেছেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। অনুভব করেছেন হৃদয় দিয়ে। খুঁজেছেন সীমার মাঝে অসীমের স্পন্দন! তাই আমরা দেখি তাকে গানে-কবিতায় বর্ষা আর মেঘের সাথে মিতালী করতে।
কবি গান গেয়েছেন এভাবে-
মন মোর মেঘের সঙ্গী,
উড়ে চলে দিগ্দিগন্তের পানে
নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসঙ্গীতে
রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম॥
রবীন্দ্রনাথের কলমে বর্ষার যে বিচিত্র্য রুপ ফুটে উঠেছে তা প্রকৃতির প্রতি তার পরম ভালোবাসার প্রকাশ। বর্ষা রবীন্দ্রনাথকে নানাভাবে আপ্লুত করেছে। তাই কবিগুরু অন্তরের সমস্ত আকুতি, বৈচিত্র্য, ছন্দ ও লয় সবই দিয়ে বর্ষাকে সাজিয়েছেন গানে-কবিতা-প্রবন্ধে।
কবি জীবনস্মৃতি গ্রন্থের ‘বর্ষা ও শরৎ’ প্রবন্ধে বলেছেন-
‘বর্ষার দিনে বাহিরের প্রকৃতিই অত্যন্ত নিবিড় হইয়া আমাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহার সমস্ত দলবল সাজসজ্জা এবং বাজনা-বাদ্য লইয়া মহাসমারোহে আমাকে সঙ্গদান করিয়াছে।’
কবিগুরুর লেখায় রয়েছে বর্ষার আগমন-প্রস্থান, সৌন্দর্য-আক্রমণ, বিরহ-রোমাঞ্চ। গান, কবিতা, ছড়া, গল্প এমনকি জীবনস্মৃতিতেও তাঁর বর্ষাবন্দনা এতই সমৃদ্ধ যে বাংলা সাহিত্যে এমন সম্ভার বিরল। গীতবিতানে বর্ষা পর্যায়ের গানের সংখ্যা ১২০টির মতো লক্ষ্য করা যায়।
‘মেঘদূত’ কবিতায় কবি বর্ষারে ছবি এঁকেছেন এভাবে –
“আজি অন্ধকার দিবা বৃষ্টি ঝরঝর,
দুরন্ত পবন অতি,
আক্রমণে তার বিদ্যুৎ দিতেছে উঁকি ছিড়ি মেঘ ভার,
খরতর বক্রহাসি শূন্যে বরষিয়া।”
এই কবিতায় কবি বর্ষাদিনের বাতাসের দুরন্তপনা, মেঘের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকানোর বক্রহাসি, আঁধার রাতে বৃষ্টির উৎপাত, আবার মেঘ-বৃষ্টির মন্ত্রে হৃদয়ের বন্ধন ব্যথা থেকে মুক্তির স্বাদ আচ্ছাদন করেছেন। আবার বর্ষায় বিরহের স্বর্গলোকের অনন্তসৌন্দর্যমাঝে তার বিরহিণী প্রিয়াকে কল্পনায় জাগিয়ে রেখেছেন। এ কবিতায় উপমা ও চিত্রকল্প অনেক গভীর। কবিতার পাশাপাশি গানেও বর্ষাবন্দনা রয়েছে কবির।
‘আষাঢ়’ প্রবন্ধে কবি লেখেন:
‘…ঋতুর রাগরাগিণী কেবল বর্ষার আছে আর বসন্তের। …সংগীতের পাড়ায় ভোট লইলে, বর্ষারই হয় জিত।’
রবীন্দ্রনাথ প্রতিবর্ষায় রচনা করেছেন নতুন গান ও কবিতা। যা বাঙ্গালীর মনে স্পন্দন জাগায় আজও।
কবি বর্ষায় গেয়ে উঠেছেন-
‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদলদিনে
জানি নে, জানি নে কিছুতেই
কেন মন লাগে না…।’
বর্ষা প্রকৃতিতে ‘বাদল দিনের প্রথম কদমফুল’ দেখে কবি বলেছেন- ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী, উড়ে চলে দিগ-দিগন্তের পানে…’ কিংবা ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে…’।
বর্ষা এলে কবিগুরোর এসব গান কবিতা মনের অজান্তেই হৃদয়ে দোলা দেয়। গাইতে না জেনেও গুনগুণিয়ে গেয়ে উঠি-
‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়,
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়…।
সমাজ সংসার মিছে সব,
মিছে এ জীবনের কলরব।
কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে
হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব।
আঁধারে মিশে গেছে আর সব।
কবিতা, গানে, নাটকে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে এমনকি গল্পেও কবিগুরো বর্ষার রূপপ্রকৃতি এঁকেছেন তা এককথায় অনবদ্য। তাই আমরা বারবার তার কাছে ঋণী।
‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বর্ষার রূপ চিত্রায়ন করেছেন এভাবে-
এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিণী,
ওগো প্রিয়সুখভাগিনী!
কুঞ্জকুটিরে, অয়ি ভাবাকুললোচনা,
ভূর্জপাতায় নব গীত করো রচনা
মেঘমল্লার-রাগিণী।
এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিণী!
পরিশেষে কবিগুরোর ‘বর্ষার চিঠি’ প্রবন্ধ থেকে উদ্বৃতি টেনেই আজকের নিবন্ধ শেষ করছি-
‘ছেলেবেলায় যেমন বর্ষা দেখতেম, তেমন ঘনিয়ে বর্ষাও এখন হয় না। বর্ষার তেমন সমারোহ নেই যেন, বর্ষা এখন যেন ইকনমিতে মন দিয়েছে— নমোনমো করে জল ছিটিয়ে চলে যায়— কেবল খানিকটা কাদা, খানিকটা ছাঁট, খানিকটা অসুবিধে মাত্র— একখানা ছেঁড়া ছাতা ও চীনে বাজারের জুতোয় বর্ষা কাটানো যায়— কিন্তু আগেকার মতো সে বজ্র বিদ্যুৎ বৃষ্টি বাতাসের মাতামাতি দেখি নে। আগেকার বর্ষার একটা নৃত্য ও গান ছিল, একটা ছন্দ ও তাল ছিল— এখন যেন প্রকৃতির বর্ষার মধ্যেও বয়স প্রবেশ করেছে, হিসাব কিতাব ও ভাবনা ঢুকেছে, শ্লেষ্মা শঙ্কা ও সাবধানের প্রাদুর্ভাব হয়েছে। লোকে বলছে, সে আমারই বয়সের দোষ।’

আপনার মতামত লিখুন :